সে আমাকে জানালো, আজ ভারতীয় হাইকমিশনার এবং তাঁর বেগম দুপুরে খেতে আসবেন।
স্যার কোথায় জিগ্গেস করলে সে আমাকে রান্নাঘর দেখিয়ে দিলো।
আমি রান্নাঘরের সামনে এসে দেখি হ্যার হেলু চাচিকে নির্দেশ দিচ্ছেন। হেলু চাচি কাজের লোকদের পাল্টা নির্দেশ দিচ্ছেন। খুব ব্যস্ত-ব্যস্ত ভাব। চুলাতে কড়াই উঠছে এবং চুলা থেকে কড়াই নামছে। ছ্যাঁত ছোঁত শব্দ হচ্ছে। রান্নাঘরের গরমে স্যার ঘেমে গেছেন। তার মুখে বড় বড় ঘামের ফোটা। আমাকে দেখে স্যার হাসলেন এবং জিগ্গেস করলেন, মৌলবি আহমদ ছফা, রান্নাবান্না করতে জানেন?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম, কিছুই জানি না।
স্যার মন্তব্য করলেন, তা অইলে আপনে কোনো কামে আইবেন না। যান বয়েন।
হেলু চাচি বললেন, মেজোভাই, আপনিও একটু বিশ্রাম করেন গিয়ে, বাকিটা আমরা সারতে পারবো।
স্যারের সঙ্গে আমি ড্রয়িংরুমে চলে এলাম। স্যার বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এলেন। ছোকরা চাকরিটা তামাক দিয়ে গেল। স্যার হুঁকোতে টান দিয়ে জিগ্গেস করলেন, মৌলবি আহমদ ছফা, আপনে রান্নাবান্নার কোনো খবরটবর রাখেন?
আমি বললাম, না স্যার, কোনো খবর রাখিনে। স্যার বললেন, যে জাতি যত সিভিলাইজড তার রান্নাবান্নাও তত বেশি সফিস্টিকেটেড। আমাগো ইস্টার্ন রান্নার সঙ্গে পশ্চিমাদের রান্নার কোনো তুলনাই অয় না। অরা সভ্য অইছে কয়দিন। এই সেদিনও তারা মাছ মাংস কাঁচা খাইত।
স্যার গ্যাস্ট্রোনমির ওপর একটা সুদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তার অনেক কিছুই আমার মনে নেই। মুসলমানেরা যেসব খাওয়াদাওয়া ভারতে চালু করেছে ভাসাভাসা তার দুয়েকটা মনে আছে। চীনা খাবার, ভারতীয় খাবার, আরবদের এবং ইউরোপীয়দের খাবারের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেদিন আলোচনা করেছিলেন এবং প্রাকৃতিক কারণও ব্যাখ্যা করেছিলেন। রান্নাবান্না এবং খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে আমার কোনো আগ্রহ না থাকায় স্যারের আলচনা আমার মনে স্থান করে নিতে পারেনি।
টেলিফোনে কার সঙ্গে কথা বললেন। রিসিভার রেখে বললেন, বদরুদ্দীন উমর। হেরেও আইবার কইছিলাম। হে কয় তার অন্য কাম আছে। তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনে কোনোদিন বদরুদ্দীন উমরের বউয়ের বাংলা উচ্চারণ শুনছেন নিহি?
আমি বললাম, না, আমি শুনিনি।
এক্কেরে বিশুদ্ধ বাংলা কয়, উচ্চারণ নিখুঁত। আপনেগো উচিত। তার বাংলা পাঠ ক্যাসেট কইরা রাখা। পরে খুব কামে আইব।
আমি বললাম, আপনি ত স্যার ঢাকার বাংলা বলেন, আমাদেরকে কেনো পশ্চিম বাংলার উচ্চারণরীতিটা অনুসরণ করতে বলছেন?
স্যার কথাটা পাশ কাটিয়ে গেলেন। তারপর তিনি একজন সাহেবের নাম উচ্চারণ করলেন, আমি এখন মনে করতে পারছি না। সেই সাহেব নাকি একশো বছর আগে লিখে গিয়েছেন, বেঙ্গলে ঢাকা জেলার মানুষেরা বিশুদ্ধ বাংলায় কথাবার্তা কয়। এই ফাঁকে স্যার আরেকবার তামাক দিতে বললেন। হুঁকো টানতে টানতে বললেন, বাংলা ভাষার মধ্যে যে পরিমাণ এলিট (elite) মাস (mass) গ্যাপ এইরকম দুনিয়ার অন্য কোনো ভাষার মধ্যে খুঁইজ্যা পাইবেন কি না সন্দেহ। আধুনিক বাংলা ভাষাটা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সংস্কৃত অভিধান দেইখা দেইখ্যা বানাইছে। আসল বাংলা ভাষা এইরকম আছিল না। আরবি ফারসি ভাষার শব্দ বাংলা ভাষার লগে মিশ্যা ভাষার একটা স্ট্রাকচার খাড়া অইছিল। পলাশির যুদ্ধের সময়ের কবি ভারতচন্দ্রের রচনায় তার অনেক নমুনা পাওয়া যাইব। ব্রিটিশ শাসন চালু অইবার পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতেরা আরবি ফারসি শব্দ ঝাঁটাইয়া বিদায় কইর্যা হেই জায়গায় সংস্কৃত শব্দ ভইরা থুইছে। বাংলা ভাষার চেহারা কেমন আছিল, পুরানা দলিলপত্র খুঁইজ্যা দেখলে কিছু প্রমাণ পাইবেন।
আমি বললাম, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা যে গদ্যরীতিটা চালু করেছিলেন, সেটা তো স্থায়ী হতে পারেনি। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এসে বাংলা গদ্যের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এবং রূপান্তর ঘটে গেছে।
পরিবর্তন ত অইছে। কিন্তু কীভাবে অইছে এইটা দেখন দরকার।
আমি জানতে চাইলাম, কীভাবে পরিবর্তনটা হয়েছে। স্যার বললেন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা ভাষার স্ট্রাকচারটা খাড়া করেছিলেন, তার লগে ভাগীরথী পাড়ের ভাষার মিশ্রণে আধুনিক বাংলা ভাষাটা জন্মাইছে। আধুনিক বাংলা বঙ্গসন্তানের ঠিক মুখের ভাষা না, লেখাপড়া শিইখ্যা লায়েক অইলে তখনই ওই ভাষাটা তার মুখে আসে।
স্যার অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা বলছিলেন। নিচে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। তিনি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালেন। আমাগো মেহমানরা বুঝি অইলেন।
আমি বললাম, স্যার আমি এখন যাই।
স্যার বললেন, যাইবেন কই বয়েন, আপনেও একলগে চাইরটা খাইয়া যাইবেন।
আমি গায়ের ময়লা কাপড়াচোপড় দেখিয়ে বললাম, এই জামাকাপড়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সামনে যাওয়া ঠিক হবে না।
স্যার বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা, আপনের মুখে এই প্রথম শুনলাম, আপনেও জামাকাপড়ের কথা চিন্তা করেন।
আমি চলে এলাম, স্যার আর পীড়াপীড়ি করলেন না।
কিছুদিন পরে স্যারের বাড়িতে গেলাম। স্যার একা ছিলেন। তাকে খুব খুশি-খুশি মনে হচ্ছিলো। কয়েকদিন থেকে একটা ব্যাপার নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে জবর বিতর্ক চলছিলো। বিষয়টি ছিল সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমের বাংলা প্রতিশব্দ কেউ-কেউ ইহজাগতিকতা বলে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এই প্রতিশব্দের মধ্যে সেকুলারিজমের আসল স্বরূপ প্রকাশ পায়নি বলেই আমার ধারণা। তাই স্যারকে জিগ্গেস করলাম। সেকুলারিজম কী? স্যার বললেন, ইউরোপীয় রেনেসাঁর আগে খ্ৰীস্টানজগৎ মনে করত মরণের পরে যে অনন্ত জীবন অপেক্ষা কইর্যা আছে হেইড অইল আসল জীবন। দুনিয়ার জীবন তার অ্যাপেনডেজ মাত্র। খ্ৰীষ্টানগো শিল্প সাহিত্য সবখানেই পরকালের মহিমাকীর্তন করা অইত। যীশুখ্ৰীষ্ট ত এই নশ্বর দুনিয়াকে ভেল অভ টিয়ার্স কইয়া গেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা একদিনে একমাসে বা এক বছরে পাল্টায় নাই, অনেকদিন লাগছে। রেনেসাঁর সময়ে যখন ধীরে ধীরে জীবনের একটা ডেফিনেশন তৈয়ার অইতেছিল, তখন পুরা দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টাইয়া গেল। রেনেসাঁর আগে পরকালটাই আছিল সব। রেনেসাঁর পরে এই দুনিয়াটাই সব, পরকাল কিছুই না।
