স্যারের ওধরনের জবাব শোনার পর তার মতামত জানার সাহসী হয়নি। আমি কিন্তু স্যারকে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিককার রচনার তারিফ করতে শুনেছি। একাধিকবার তিনি আমার কাছে বলেছেন, হুমায়ূনের লেখার হাতটি ভারি মিষ্টি। পরবর্তীতে হুমায়ূন-প্রসঙ্গ উথাপন করলেও উচ্চবাচ্য কিছু করতেন না।
জার্মান কবি গ্যোতের অমর কাব্য ফাউস্টের অনুবাদে আমি মন দিয়েছিলাম সেই সময়ে। তার একটা অংশ মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই অংশটুকু স্যারকে দেখিয়েছিলাম। স্যার একেবাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। আমার অনুবাদটির কথা কত মানুষকে যে বলেছিলেন, তার হিসেব নেই। যে ধরনের কাজে অমানুষিক মানসিক শ্রমের প্রয়োজন হয়, সে ধরনের কাজ করার প্রেরণা আমাদের সমাজ থেকে সংগ্রহ করা একরকম অসম্ভব। এখানে একজন বড় কাজ করলে উৎসাহ দেয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসে না। আমাদের সমাজে গুণগ্ৰাহিতার পরিমাণ নিতান্তই সঙ্কুচিত। সুরুচিসম্পন্ন সংস্কৃতিবান অধিক মানুষ আমাদের সমাজে সত্যি সত্যি বিরল। অবশ্য সাম্প্রতিককালে অবস্থাটা কিছু-কিছু পাল্টাতে আরম্ভ করেছে। রাজ্জাক স্যার যদি আমাকে অনুবাদকর্মটা শেষ করার জন্য বারবার তাগাদা না দিতেন, হয়তো আমি এরকম একটি শ্রমসাধ্য কর্মে দীর্ঘকাল চেষ্টা প্ৰযত্ন এবং শ্রম ব্যয় করতে পারতাম না। একা রাজ্জাক স্যার অনুপ্রাণিত করেছিলেন, একথা বলাও সঠিক হবে না। আরও অনেকেই উৎসাহিত করেছিলেন। রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে অন্য কারও তুলনা চলতে পারে না। কাজটি যখন শেষ করে আসছিলাম, সে সময়ে আমার হাতে বিশেষ টাকাপয়সা ছিলো না। তিনি সময়ে অসমইয়ে টাকাপয়সা দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি আমার রচনাটির যেভাবে প্রশংসা করছিলেন, চাইতেন অন্যেরাও সেভাবে অনুবাদটিকে গ্রহণ করুন। সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ তার বাড়িতে হামেশা যাওয়া-আসা করতেন। আমি উপস্থিত থাকলে আমাকে ফাউষ্টের অনুবাদ পাঠ করে শোনাতে নির্দেশ দিতেন। এই ভদ্ৰ লোকদের কেউ-কেউ মেপে মেপে প্রশংসাও করতেন। বলতেন বেশ হচ্ছে, শুনতে একটুও খারাপ শোনাচ্ছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। দুয়েকবার এভাবে রচনা পাঠ করার পর আমার বুঝতে বাকি রইলো না। এই ভদ্রলোকেরা আমার রচনার প্রশংসা করেন, একারণে নয় যে আমার রচনাটি তাদের কাছে সত্যি সত্যি ভালো লেগেছে, স্যারকে খুশি করার জন্যই তারা প্রশংসার কথাগুলো বলতেন। তার পর থেকে স্যার কাউকে রচনা থেকে পড়ে শোনাতে বললে আমি বিরক্ত হতাম, মনেমনে চটে যেতাম। নানারকম অছিলা করে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করতাম।
একদিন সন্ধেবেলা স্যার আমাকে বললেন, আপনে আমার ওইখানে কাইল বেয়ানবেলা একবার আইবেন। নাস্তা আমার এইখানেই খাইবেন।
হাজির হয়েছেন। সৈয়দ আলি আহসান, মোস্তাফা নূরউল ইসলাম, ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সরদার ফজলুল করিম—আরও কে কে ছিলেন নাম মনে পড়ছে না। স্যার আমাকে অর্থনীতিবিদ ড. মুশাররফ হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে জানালেন, মৌলবি আহমদ ছফা ফাউস্ট অনুবাদ করছে এবং অনুবাদ খুব ভালো হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ড. মুশাররফ বড় বড় চোখ পাকিয়ে এমনভাবে ই—ন্টা-রে—ষ্টি—ং শব্দটা উচ্চারণ করলেন শুনে, আমার পিত্তি জ্বলে গেলো। এই ধরনের বিলেত আমেরিকা-ফেরত ভদ্রলোকেরা নাসিক্যধ্বনিতে এমনভাবে বাংলা উচ্চারণ করেন, শুনে আপনার মনে হবে তিনি বাংলা বলতে একেবারে অভ্যস্ত নন, যেহেতু ইংরেজি বললে আপনি বুঝবেন না, তাই দয়া করে আপনার সঙ্গে মাতৃজবানে কথা বলছেন। আমি মনেমনে ঠিক করে নিলাম, এই মুহুর্তে একটা ফয়সালা করে নেয়া উচিত, টেবিলে স্তুপীকৃত খাদ্যবস্তু গলাধঃকরণ হওয়ার পরে স্যার অবশ্যই আমাকে অনুবাদ পাঠ করে শোনাবার নির্দেশ দেবেন। যে ভঙ্গিতে ডক্টর সাহেব ইন্টারেস্ট্রিং শব্দটা উচ্চারণ করলেন, সেরকম প্রশংসাবাক্য যদি আমাকে হাজেরান মজলিশের কাছ থেকেও শুনতে হয়, সেসব গুরুপাচ্য জিনিস আমার পক্ষে হজম করা সহজসাধ্য হবে না। তাই ভাবলাম ভোজনপর্ব সমাধা হওয়ার পূর্বে এমন-কিছু করে ফেলা উচিত যাতে করে রচনাপাঠ আপনা থেকেই স্থগিত হয়ে যায়। আমি ড. মুশাররফকে জিগ্গেস করলাম, আপনি আমার দিকে একটু তাকান। তিনি আমার দিকে তাকালে আমি প্রশ্ন করলাম, আপনি জীবনে কবি গ্যোতে কিংবা তার কাব্য ফাউস্টের নাম শুনেছেন?
ড. মুশাররফ ঘাড় চুলকে আমতা-আমতা করে বললেন, হাঁ শুনে থাকবো।
আমি বললাম, আর কিছু জানেন?
তিনি বললেন, মানে মানে কিছু-কিছু তো—
আমি তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, আপনি ইন্টারেষ্টিং শব্দটা যেভাবে প্যাট্রোনাইজিং টোনে উচ্চারণ করলেন আমি নিশ্চিত যে এব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না।
আমাকে সেদিন আর রচনা পাঠ করতে হয়নি, সেকথা বলাই বাহুল্য। এখনও ড. মুশাররফের সঙ্গে দেখা হলে ভালোমন্দ জিগ্গেস করেন। আমার ধারণা সেদিনের সে ব্যাপারটি তার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এখানে প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন কাউকে সালাম দিলে, সালামটা তার প্রাপ্য বলে ধরে নেন এবং যিনি সালাম দেন তাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিতান্তই ছোটোলোক বলে ধরে নেয়া হয়।
অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ফাউস্ট গ্রন্থটির অনুবাদ যখন শেষ করলাম, আমি সত্যি সত্যি মুশকিলে পড়ে গেলাম। যতোকাল কাজটা শেষ হয়নি। মনে-মনে ধারণা পোষণ করে আসছিলাম মহান একটি বিদেশী কাব্য আমি বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে নিয়ে আসছি। অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ আমার অনুবাদের তারিফ করেছেন। স্বভাবতই আমার মনে একটা গৰ্ববোধ জন্ম নিয়েছিল। রচনাটা যখন শেষ করলাম, দেখা গেল কোনো প্রকাশকই রচনাটিকে ছেপে বের করতে রাজি নন। যে-সকল প্রকাশক আমার যে-কোনো গদ্যরচনা এক সংস্করণের রয়্যালটির টাকা অগ্রিম শোধ করে প্রকাশ করতে কুষ্ঠিত হন না, তারাও বললেন, এই বই বাজারে বিক্রি হবে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং তারা ছাপতে পারবেন না। এই অনুবাদকর্মটা সম্পন্ন করতে আমার বারো বছর লেগেছে। পাণ্ডুলিপির বোঝা হাতে করে প্রকাশকের ঘর থেকে ফিরে আসার সময়, আমার মনে হত বারো বছরের বিফল শ্ৰম আমার কাঁধে পৰ্বতের মতো ভারী হয়ে চেপে বসেছে।
