স্যার একটু থেমে বললেন, উনিশশো সাতাশ সালে।
দীর্ঘদিনের মেলামেশায় এটা আমার জানা হয়ে গিয়েছিলো স্যারকে তার মর্জিমাফিক চলতে দেয়া ভালো। মেজাজ শরিফ একটা ব্যাপার আছে না, এটা স্যারের বেলায় অত্যন্ত সত্য। জানান দিয়ে ঘটা করে প্রশণ করতে বসলে স্যারের মুখ থেকে কিছু বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক আগেই আমাদের চলে আসার কথা। কিন্তু স্যারের কথার মাঝখানে চলে আসতে সঙ্কোচ বোধ করছিলাম। সুযোগ যখন তিনি নিজেই করে দিয়েছেন, আমি তার কাছে আবার মিঃ হ্যারন্ড লাস্কি সম্পর্কে প্রশ্ন জিগ্গেস করতে আরম্ভ করলাম। আমি বললাম, স্যার, আপনি সর্বমোট কতদিন মিঃ লাস্কির সঙ্গে ছিলেন।
স্যার বললেন, আমি তা সরাসরি পিএইচডি-তে ভরতি অইছিলাম। সর্বমোট সাড়ে পাঁচ বছর মিঃ লাঙ্কির সাহচর্য পাইছি।
তিনি মিঃ লাস্কি সম্পর্কে নানা রকম গল্প করলেন। এগুলো তিনি আগেও একাধিকবার বলেছেন। এবার আমি অধিকতর সুনির্দিষ্ট হতে চাইছিলাম। আমি বললাম, স্যার, মিঃ লাস্কির ছাত্র হিসেবে তার কোন বৈশিষ্ট্যটি আপনি প্ৰণিধানযোগ্য মনে করেন?
স্যার এক মিনিটের মতো নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, আমি মনে করি মিঃ লাস্কি অন্য মানুষদের এমন সব বিষয়ে চিন্তা করতে প্ররোচিত করবার পারতেন, নর্মালি যেটা তারা করতে অভ্যস্ত নন। এটাই মিঃ লাস্কির সবচাইতে বড় গুণ। স্কলার হিসাবে মিঃ লাস্কি অতি উচ্চশ্রেণীর না অইলেও অপরের চিন্তাভাবনায় ধাক্কা দেঅন খুব কম কথা নয়।
আমি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করলাম, গ্রামার অব পলিটিক্সের একটি এডিশানে মিসেস লাস্কি একটি প্রফেস লিখেছেন।
স্যার বললেন, মিসেস লাস্কি মিঃ লাস্কির চাইতে বয়সে একটু বড় আছিলেন। উঁচা লম্বাও আছিলেন। মিঃ লাঙ্কি ছিলেন আমার চাইতে একটু উঁচা। কেতাদুরস্ত পোশাক পরতেন। সবসময় সত্য কথা বোধহয় বলতেন না।
আমরা আলোচনার এই পর্যায়ে এসে দেখলাম, স্যারের হাতে সময় নেই, একথাটি সত্যি নয়। অন্যদিনের চাইতেও তিনি বেশি কথাবার্তা বলছেন। সুযোগ যখন পাওয়া গেল, আমরা পুরো সদ্ব্যবহার করতে চাইলাম। আমি বললাম, আদার দ্যান মিঃ লাস্কি হু আর দি স্কলারস ইউ হ্যাভ বিন ইমপ্রেসড?
স্যার হারভার্ডের ম্যাসনের নাম বললেন। গলব্রেথ প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেন। আমি জিগ্গেস করলাম, হারভার্ডে মিঃ ম্যাসনের কী পজিসন প্ৰেস্টিজ আছিল?
স্যার বললেন, মিঃ ম্যাসন ওয়াজ মাস রেসপেক্টেড পারসন ইন হারভার্ড অ্যান্ড ওয়াজ এ গ্রেট স্কলার। আসলে নামেমাত্র একজন প্রেসিডেন্ট আছিল। মিঃ ম্যাসনই গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশনগুলো নিতেন। তার লগে এই দেশেই আমার পরিচয় হইছিল। ড. সান্দেকের লগে তার একটা মিস আন্ডারস্টেডিং অইছিল, আমি তারে এরকমের মেডিয়েট করছিলাম, কইছিলাম, হোয়াই ডোন্ট ইউ ইনভাইট হিম ইন এ ডিনার অ্যান্ড ডিসকাস দ্যা ইস্যু। রেভিনিউ প্রশ্নে আমার একটা মন্তব্য ম্যাসন সাহেবের খুব মনে ধরছে। আমি কইছিলাম ল্যান্ডের রেভিনিউ যা ছিল আগে সরকারের আয়ের প্রধান উৎস এখন সে রেভিনিউ দিয়া সরকার পাঁচ পার্সেন্ট অর্থও আয় করবার পারে না। মিঃ ম্যাসন ওয়াজ মাচ ইম্প্রেসড।
ড. আহমেদ কামাল জিগ্গেস করলেন, হেনরী কিসিঙ্গার তখন হারভার্ডে ছিলেন না?
স্যার বললেন, অবশ্যই ছিলেন। হি ওয়াজ দেন অ্যান অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর।
আমি বললাম, মিঃ কিসিঞ্জারের সঙ্গে আপনার কোনো পরিচয় ছিলো না?
স্যার বললেন, খুব ভালা পরিচয় আছিল। কাজে কর্মে খুব সুবিধার আছিলেন না কিসিঙ্গার। তবে আমার লগে সম্পর্কটা আছিল খুব ভালা। আমারে তিনি কইছিলেন তার সেমিনারে আমাগো এই অঞ্চল থেইক্যা কিছু ছাত্র পাঠাইবার কথা। পশ্চিমারা এই অঞ্চলের (ইস্ট পাকিস্তান) কাউরে এনকারেজ করে না। হের লাইগ্যা কিসিঙ্গার সাব আমারে কইছিলেন আমি যাতে নামগুলা আগে পাঠাইয়া দেই। আমি মৃদু প্রতিবাদ করে বললাম, হেনরি কিসিঞ্জারের ইউ এস ফরেন পলিসি অ্যান্ড দ্যা নিউক্লিয়ার স্টক পাইলস বইটি আমি পড়েছি। পরে হোয়াইট হাউস ইয়ার্স পড়েছি। অ্যাকটিভ পলিটিশিয়ানদের মধ্যে ঐরকম কমপ্রিহেনশন এবং রেঞ্জসম্পন্ন কোনো মানুষের কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না। স্যার বললেন, কিসিঙ্গার সাহেবের লেখাপড়া ত আছিল অসাধারণ। চিন্তা করার শক্তিও আছিল, কিন্তু মানুষটা কাজেকর্মে সুবিধার আছিল না। হারভার্ডে কেউ পাত্তা দিত না।
আমি প্রসঙ্গটা একটু ঘুরিয়ে নিলাম। বললাম, স্যার, শেখ সাহেব কিসিঞ্জারকে বাংলাদেশে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। আমাদের এখানে একটা গল্প চালু আছে যে কিসিঞ্জার সাব মোট পঁয়তাল্লিশ মিনিট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কাটিয়েছিলেন। তার মধ্যে পঁচিশ মিনিট আপনার সঙ্গে ব্যয় করেছিলেন। এ নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের অনেকে রুষ্ট হয়েছিলেন বলে শুনেছি। ঘটনাটা কতটুকু সত্য?
রাজ্জাক স্যার মিঃ কিসিঞ্জারকে উচ্চারণ করতেন কিসিঙ্গার। তিনি জবাবটা এভাবে দিলেন, আমি ত কিসিঙ্গারের লগে দেখা করবার গেছিলাম। অনেক লোক। কিসিঙ্গারের আগের বউটারে আমি চিনতাম। লম্বা নতুন বিউটারে চিনবার পারছিলাম না। কামাল হোসেন আরও কে কে আছিল মনে পড়ে না। সকলের লগে তার বউরে পরিচয় করাইয়া দিয়া বলছিলেন, মাই স্টুডেন্টস। স্যার বললেন, আমার ত কাপড়াচোপড় অত আছিল না। এই পাজামা পাঞ্জাবি চাদর আর মুখে দাড়ি। কিসিঙ্গারের বউ জিগাইলেন, অলসো ওয়াজ হি ইউর স্টুডেন্ট? কিসিঙ্গার কইলেন, নো নো, হি ওয়াজ মাই কলিগ। এইডাই অইল আসল ঘটনা।
১৪. ভারতের হাই কমিশনার সমর সেন
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার সমর সেনের সঙ্গে রাজ্জাক স্যারের একরকম হৃদ্যতা ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময়ে। সমরবাবু হয়তো স্যারের ছাত্র কিংবা ছাত্রস্থানের ছিলেন। বোধ করি সমর সেন বাংলাদেশে নিয়োগপ্রাপ্ত দুনম্বর ভারতীয় হাই কমিশনার। সুবিমল দত্তের পরে সমরবাবু ঢাকায় পোস্টিং পেয়েছিলেন। সমরবাবুর বাড়িতে স্যারের পরিবারের যেমন যাওয়া-আসা ছিলো, তেমনি ভারতীয় হাই কমিশনারও নানা উপলক্ষে স্যারের বাড়িতে আসতেন। সেদিন ন’টা সাড়ে ন’টার সময় স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি সরগরম অবস্থা। কাজের লোকেরা ঘরবাড়ি, আলমারি, চেয়ার, টেবিল, বইয়ের শেলফ ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে। বাড়ির মেয়েরাও ওই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যোগ দিয়েছে। স্যারের ভ্রাতুষ্পপুত্রীকে জিগ্গেস করলাম, খুব তো তোড়জোড় চলছে, উপলক্ষটা কী?
