স্যার বললেন, বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে এরকম একটা নালিশ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও করেছিলেন। শাস্ত্রী মশায় বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর সংস্কৃত বহুল বাংলা লিখে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা প্রমাণ করবার চেষ্টা করছিলেন। স্যার বললেন, বঙ্কিমের বাবাও ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বহরমপুরে ছিলেন এবং এই জেলার সম্পর্কে যা লেখছেন আমি পড়ছি। ইংরেজ আসার পরে এই দেশের রেভিনিউ সিস্টেমের মধ্যে যে চেঞ্জ আইছে সেইটা শুধু বঙ্কিম না, কেউ বুঝবার পারে নাই। সায়েন্টিস্ট নিউটন আছিলেন মিন্ট মাস্টার। সে সময়টা আওরঙ্গজেবের আমল, ইন্ডিয়ার মানিটারি সিস্টেম যে-কোনো ইউরোপীয় দেশের চাইতে অনেক বেশি সুপিরিয়র আছিল।
স্যার যখন কথা বলতে আরম্ভ করেন, একসঙ্গে অনেক কথাই বলে ফেলেন। শুধু একটা সূত্র প্রয়োজন। আমরা যদি ধরিয়ে না দিই নিজেই সূত্র ঠিক করে নেন।
কথাবার্তা একসময়ে বদরুদ্দীন উমর সাহেবদের পূর্বপুরুষ নওয়াব আবদুল জব্বারে এসে ঠেকলো। আবদুল জব্বার এবং তার এক ভাই, দুইজনেই আছিলেন সদরঅলা। একবার লর্ড ক্যানিং তাগো বাড়িতে বেড়াইতে গেছিলেন। তিনি নওয়াব আবদুল জব্বারের কথা প্রসঙ্গে কইছিলেন তোমাদের মধ্যে এক্কেরে কৃতজ্ঞতা নাই। নওয়াব আবদুল জব্বার জবাব দিছিলেন, আমরা অকৃতজ্ঞ বইলাই ত তোমরা আমাগো উপর রাজত্ব করছ।
উমর সাহেবদের পরিবারের প্রসঙ্গ যখন উঠল আমি আবুল হাশিম সাহেবের বাবা মৌলবি আবুল কাশেম সাহেবের কথা তুললাম। বললাম, নানা জায়গায় পড়েছিম আবুল কাশেম সাহেব ফজলুল হক সাহেবকে সব সময়ে দুষ্ট গ্রহের মতো আড়াল করে রাখতেন। উমর সাহেব একসময়ে জানিয়েছিলেন, তার পিতামহের সঙ্গে লর্ড রীডিং-এর গলায়-গলায় ভাব ছিল।
স্যার বললেন, মৌলবি আবুল কাশেম সুবিধার মানুষ আছিল না। তিনি সবসময় সত্য কথা বলতেন, এই কথা তার অতি শত্রুও বলতে পারবে না। কিন্তু ইংরেজিটা বলতেন চমৎকার। তিনি সবসময়ে খুব মিহি ধুতি এবং পাঞ্জাবি পরতেন। আর মাথায় একটা কিস্তি টুপি। ডায়েসে খাড়াইয়া যখন কথা বলতেন, একেকটা ওয়ার্ড মুক্তার দানার মতো ঝইর্যা পড়ত।
স্যার যেহেতু আমাদের শুরুতে বলে দিয়েছেন তিনি অধিক সময় দিতে পারবে না, আমরা কেউ কোনো প্রশ্ন করলাম না। অপেক্ষা করছিলাম, তিনি একটা জায়গায় থামবেন, তখন আমরা চলে আসবো। লর্ড রীডিং-এর সূত্র ধরেই তিনি বক্তব্য বলতে থাকলেন। লর্ড রিডিং-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তার একটা বায়োগ্রাফি প্রকাশ করেন। তিনি যতোদিন ইন্ডিয়াতে ছিলেন প্রতি সপ্তাহে তাঁর পুত্রের কাছে একটা কইর্যা চিঠি লিখতেন। ভারতের যেসকল ডিগনিটরির লগে তার দেখা অইত, তাগো সম্পর্কে লর্ড রীডিং তার প্রাইমারি ধারণাটা প্রকাশ করতেন। মিঃ গান্ধীর লগে যখন রীডিং-এর লগে দেখা অইছে, লর্ড রীডিং তার সম্পর্কে লিখছেন, এই লোকের সঙ্গে আমাগো ব্যবসা জমবে ভালা। এইভাবে যত ইন্ডিয়ান লিডারের লগে দেখা আইছে সকলকে একটা ক্যাটিগরিতে ফেলছেন। কিন্তু মিঃ জিন্নাহর সঙ্গে তাঁর দেখা হওনের পরের চিঠিতে এক্কেরে সুর পাল্টাইয়া গেল। এই লোক এক্কেরে বেয়ারা। উই উইল হ্যাভ ট্রাবল ইন হ্যান্ডলিং মিঃ জিন্নাহ।
আমি বললাম, আপনি সবসময় মিঃ জিন্নাহকে বেশি বেশি নাম্বার দিচ্ছেন। জিন্নাহ সাহেব ওবস্টিনেট ছিলেন সত্য, কিন্তু আপনি তাঁর প্রতি দুর্বল।
স্যার হাসলেন, আমি ত আর বানাইয়া বলবার লাগছি না।
স্যার এই পর্যায়ে শারীরিক দুর্বলতার কথা বললেন। তারপর বললেন, এই শরীর নিয়া গোপালগঞ্জ যাইতে অইব। সকলে আমারে ধইর্যা বইল কাজী মোতাহার হোসেন দাবা টুর্নামেন্টে আমার থাকন লাগব। আমি মত দিছিলাম। এখন কইতাছে হেই টুর্নামেন্ট অইব গোপালগঞ্জে। লোকে মনে করে কাজী সাহেবের লগে আমার পরিচয় দাবার মাধ্যমে। আসলে পরিচয় অইছিল নজরুল ইসলামের গানের অনুষ্ঠানে। তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। থাকি গেণ্ডারিয়ায়। কলিকাতার থেইক্যা ঢাকা মেইল আইতে একটু দেরি অইছিল। সকলে নজরুলরে মুসলিম সাহিত্য সমাজের অফিসে নিয়া তুললেন। নজরুল কইলেন উমর ফারুকের উপর কবিতা পড়ার কথা আছিল। লিখতে পারি নাই, অন্য কবিতা পড়ব। সাহিত্য সমাজের অফিস আছিল এখনকার মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ গেটের দোতলায়। কথাবার্তা যা নজরুল একাই কইলেন। গান গাইতাছেন, নইলে কবিতা পড়তাছেন। একটু ক্লান্ত অইলে অন্য একজনরে হারমোনিয়ামের সামনে বসাইয়া দিয়া কইছেন, দেখি তুমি একটু গান কর। তারপর নিজে হারমোনিয়াম টাইন্যা লইয়া গানে মশগুল আইয়া যাইতাছেন। হেই সময় কাজী সাহেবের দাড়ি আছিল না। কাজী সাহেব কইছিলেন, আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, মডার্ন এড়ুকেশনস আর কিছু না লাউয়ের মাচার মতো জিনিস। মাচা না থাকলে লাউগাছ ত বাড়তে পারে না। নজরুল ইসলাম শুইন্যাই বললেন, তোমার কথা ঠিক কাজী, তবে লাউ গাছের চাইতে মাচার ওজন বেশি।
আমি বললাম, স্যার, তখন আপনার বয়স কত? স্যার বললেন, কত আর আইব। আমি হবায় ক্লাস নাইনের ছাত্র। অর্ধেক রাত নজরুলের গান, আবৃত্তি কথাবার্তা শুইন্যা কাটাইয়া দিলাম। সেই রাইতে আর বাসায় যাওনা অয় নাই। চকবাজারে এক আত্মীয়ের লগে কাটাইলাম।
আমি বললাম, আপনার সঙ্গে নজরুল ইসলামের কোনো কথাবার্তা হয়েছে?
না না, স্যার দুবার মাথা নাড়লেন। আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। জিগ্গেস করলাম, এটা ঘটেছিলো কোন সালে।
