এই আলোচনার পর আচমকা আমি জিগ্গেস করে বসলাম, স্যার আপনি তো লন্ডনে হ্যারন্ড লাস্কির ছাত্র ছিলেন।
স্যার বললেন, হা।
তিনি ত ইহুদি ছিলেন। ডিসক্রিমেনেট করতেন?
স্যার মাথা ঝুকিয়ে বললেন, এক্কেরে না এক্কেরে না, কোনোদিনও টের পাই নাই। তিনি আমারে একদিন কইলেন মিঃ রাজ্জাক, তুমি চেষ্টা করলে নেহরুর মত আইতে পারবা। দ্বিতীয়বার যখন এই একই কথা কইলেন, আমি চিন্তা করলাম। এই মনোভাব আর বাড়তে দেওন ঠিক না। আমি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ কইর্যা কইলাম, মিঃ লাস্কি। তিনি কইলেন, ইয়েস মাই বয়। আমি কইলাম, আই ড়ু নট উইশ টু বি ম্যানশনড উইথ মিঃ নেহরু। আই এ্যাম এ মেম্বার অব মুসলিম লীগ অ্যান্ড এ ফলোয়ার অব মিঃ জিন্নাহ। এরপরে আর কিছু কয় নাই। লাঙ্কি নেহরুর খুব ভক্ত আছিল। একদিন ক্লাসে অনেক ছাত্রের মধ্যে বললেন, নো ম্যান ইজ ইনফলিবল, আমার দিকে তাকাইয়া ছোট কইর্যা কইলেন নট ইভেন মিঃ জিন্নাহ। সকলে অবাক অইয়া আমার দিকে তাকাইলেন, আমি কইলাম আই হ্যাভ প্রপার্লি আন্ডারস্টুড। মিঃ লাস্কি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার আছিল। কিন্ত মিঃ চাৰ্চিল ম্যান্ডেস্টার গেলে লাস্কিদের বাড়িতে থাকতেন। তিনি লাস্কি পরিবারের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড আছিলেন। কেউ কোনোদিন জানিবারও পারে নাই।
তরুণ বয়সে মানুষের শরীরের কোনো অংশে চোট লাগলে যৌবনে সেটা অনুভব করা যায় না অনেক সময়। বুড়ো হলেই ব্যথাটা ফিরে আসে। মানুষের বিশ্বাস এবং সংস্কার এগুলো বেশি বয়সে নতুন করে জেগে ওঠে।
১৩. আমরা তিনজন একসঙ্গে
এবার আমরা তিনজন একসঙ্গে গেলাম। ইতিহাসের শিক্ষক ড. আহমেদ কামাল এবং অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আমি যখন দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম, দেখি স্যার রেহমান সোবহান সাহেবের বেগম সালমা রেহমানের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাকে যখন চিনতে পারলেন, জিগ্গেস করলেন, লগে আরও কেউ আছে নিহি?
আমি জিল্লুর এবং কামালকে দেখিয়ে বললাম, এই দুজন। স্যারের কপালে একটা ভাঁজ পড়লো। বুঝতে পারলাম ঈষৎ বিরক্ত হয়েছেন। স্যার বলেই ফেললেন, আমি কিন্তু বাবা বেশি সময় দিতে পারুম না। সিঙ্গাপুর থেইক্যা আমার ভাইজিটা আইবার কথা।
আমরা চলে আসব কি না চিন্তা করছিলাম। স্যার জিগ্গেস করলেন, আইজ প্রেসিডেন্টের বক্তৃতাটা পড়ছেন নিহি? কামাল এবং জিল্লুর অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
আমি বললাম, সাহাবুদ্দিন সাহেব এশিয়াটিক সোসাইটিতে ড. ইব্রাহিমের স্মরণসভায় একটা বক্তৃতা দিয়েছেন।
স্যার বললেন, আমার যাওনের ইচ্ছা আছিল না। ড. আহমদ হোসেন দানির লগে দেখা অইব হের লাইগ্যা গেলাম। ড. দানি আমাগো এই অঞ্চলের ইতিহাস এত জানেন আমি তিন জন্মেও অতি জানবার পারুম না।
আমি জিগ্গেস করলাম, তিনি কি বাঙালি?
স্যার বললেন, দানি বাঙালি না। তবে খুব এফিসিয়েন্ট স্কলার।
আমি জানতে চাইলাম, মানুষ হিসেবে কেমন?
স্যার বললেন, ওই মন রাখা কথা বলার অভ্যাস আছে।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা কোটেশন আপনে লেইখ্যা রাখেন, সুযোগমতো ব্যবহার করবার পারবেন, দেয়ার আর পিরিয়ডস ইন হিস্টোরি হোয়েন ক্রলিং ইজ দ্যা বেষ্ট মীনস অব কম্যুনিকেশন। এই হামাগুড়ি দেওনের পাল্লায় ইন্টেলেকচুয়ালেরা সকলের আগে থাকে। এখন বাংলাদেশের সেই অবস্থা। সকলে কইতাছে খুব ডেভলপমেন্ট অইতাছে। কাইল পানি আছিল না, আইজ ইলেকট্রিসিটি নাই, পরশুদিন গাড়িঘোড়া নাই, এইগুলা অইল সিম্পটম অভ ডেভলপমেন্ট, শুইন্যা শুইন্যা কান পইচা গেছে।
বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন সাহেবের ইব্রাহিম স্মারক বক্তৃতার কথা কেনো উল্লেখ করলেন, আমার মনে কারণটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। নিশ্চয়ই সাহাবুদ্দিন সাহেব ইব্রাহিমকে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা-ট্রস্টা এইরকম কিছু বলেছেন। কথাটা স্যারের মনে লেগেছে। আমার ধারণা স্বাধীন বাংলাদেশের কনসেপ্টটা বিকশিত করার পেছনে স্যারের যে ভূমিকা তার সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা যাবে না। স্যারের অবদান সকলে অস্বীকার করছেন, মুখে কিছু না বললেও স্যার অন্তরে আহত হয়েছেন। আমার ধারণা স্যারের বিরক্ত হওয়ার এটাই কারণ।
স্যার সময় বেঁধে দিয়েছেন। আমরা চলে আসার কথা চিন্তা করছিলাম। স্যার টেবিল থেকে একটা বই টেনে নিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এইডা কী কাইবার পারেন? স্যারই বললেন, রামকৃষ্ণের কথামৃত। কথাবার্তা যেসব কইছেন এক্কেরে খাঁটি। কোনো খাদ আছিল না। মানুষ অ্যাসেস করার একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছিল। বিদ্যাসাগর, দেবেন ঠাকুর, কেশব সেন, বঙ্কিম, গিরিশ ঘোষ সকলের সম্পর্কেই রামকৃষ্ণের বিশেষ বিশেষ মন্তব্য আছে। সেগুলা অনেকটাই সত্যের কাছাকাছি। তিনি ত দেবেন ঠাকুর সম্পর্কে কইছেনই যে–মানুষ চৌদ্দটা পোলা মাইয়া জন্ম দিছেন, হে সাধনা করবার সময় পাইল কখন!
আমরা হা হা করে হাসলাম। স্যার বঙ্কিমে চলে এলেন। বঙ্কিমের একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আছিল। তার পড়াশোনা অইছিল মুসলমানের টাকায়। মুহসিন ফান্ডের টাকায় তিনি লেখাপড়া করছিলেন। মুসলমানের বিরুদ্ধে কলম ধইরা সেই ঋণ শোধ করছিলেন। তারপর স্যার বললেন, রামকৃষ্ণ বঙ্কিমরে দেইখ্যা কইছিলেন, তোমার মনে এত অহঙ্কার কেন?
আমি বললাম, বিদ্যাসাগরের সঙ্গেও বঙ্কিমের সাক্ষাতের এরকম একটি গল্প চালু আছে। বিদ্যাসাগর বিএ-তে বাংলার প্রশ্নপত্র তৈরি করেছিলেন এবং প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছিলো, সে কারণে বঙ্কিম কম নম্বর পেয়েছিলেন। তাঁকে গ্রেস মার্কস দিয়ে বিএ পাশ করতে হয়েছিল। একারণেই তিনি বিদ্যাসাগরের ওপর খাপ্পা ছিলেন।
