কথায়–কথায় ভারতের প্রসঙ্গ উঠল। স্যার উনিশশো সাতচল্লিশ সালে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লাইফ ম্যাগাজিনের একটা কভারের কথা বললেন : হেইবার লাইফ ম্যাগাজিন ইন্ডিয়ার ইনডিপেন্ডেন্সের ওপর একটা কভার স্টোরি করছিলো। অগ্নিহোত্র অনুষ্ঠানে নেহরু খালি গায়ে বইস্যা মন্ত্র পড়ছেন। তাঁরে ঘিইর্যা বইয়া আছেন মন্ত্রিমণ্ডলী বেদির চাইরপাশে। বেদি থেইক্যা দূরে খাড়াইয়া আছেন দুইটা মানুষ—আম্বেদকর আর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। অনুষ্ঠানটা অইতাছে বেদের নিয়মানুসারে। সেইখানে অহিন্দুর থাকনের পারমিশন নাই। লাইফ ম্যাগাজিন একটা মজার ক্যাপশন দিছিল—বাৰ্থ অব এ সেকুলার স্টেট।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রসঙ্গ ওঠায় রাজ্জাক স্যার মন্তব্য করলেন, মাওলানার সত্য কথা বলার অভ্যাস আছিল খুব কম, অ্যান্ড হি ওয়াজ এ কনজেনিটাল লায়ার। তরজুমানুল কোরআন যে বইটা মাওলানা লিখছেন, ইন্ডিয়াতে সেইটারে মাওলানার মস্ত কীর্তি বইল্যা দেখান অয়, অ্যারাব ওয়ার্ডের কোনো জায়গায় কোথাও এই বইয়ের কোনো ম্যানশন নাই। আরবরা ইন্ডিয়াতে লেখা যে বইটার উপর গুরুত্ব দিয়া থাকেন, হেইড অইল ফতোয়ায়ে আলমগীরী। তারপর রাজ্জাক স্যার আধুনিক ভারতের ভাষা-সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, আইজাকার ইন্ডিয়ার এড়ুকেটেড মানুষেরা যে ভাষায় পরস্পরের লগে কম্যুনিকেট করেন, হেইডা কোনো ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ না। তাঁরা ইংরেজির মাধ্যমেই পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেন। বৃটিশের চইল্যা যাইবার পঞ্চাশ বছর পরেও যারা একটা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা তৈয়ার করতে পারে নাই, তারা একলগে থাকব কী কইর্যা আমি ত চিন্তা করবার পারি না।
রাজ্জাক স্যার তাঁর স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণ করতে আরম্ভ করলেন। আমার বাবা আছিলেন পুলিশ অফিসার। বদলির চাকুরি। তিনি বহরমপুরে পোস্টিং পাইলেন। আমরা তিন ভাই বহরমপুর স্কুলে আইস্যা ভরতি অইলাম। টোটাল ছাত্রসংখ্যা আছিল পাঁচশত। মুসলিম ছাত্র হবায় আমরা তিন ভাই। হেই সময়ে স্যার যদুনাথ সরকারের হিস্ট্রি অভ আওরঙ্গজেব বইটা বাইর অইছে। স্কুলে থাকনের সময়ে আমি বইটা পড়ি। অ্যান্ড স্যার যদুনাথ ওয়াজ এ গ্রেট স্কলার। তিনি আওরঙ্গজেবের অনেক সদগুণের উল্লেখ করছেন। লম্বা ফিরিস্তির পর একটা বাট লাগাইয়া লিখলেন, ইসলাম ধর্মের উপর অত্যন্ত নিষ্ঠার জন্য এইরকম একজন সম্রাটের নানাবিধ গুণ কোনো কামে আইল না। এই অংশটা পইড়া মুখটা তিতা অইয়া গেল।
১২. স্যার অনেক দূরে থাকেন
স্যার অনেক দূরে থাকেন। আমাদের পক্ষে ঘনঘন যাওয়া সম্ভব হয় না। কাজ-কর্মে ফাঁক পেলে স্যারের বাড়িতে হামলা করি। অনেকদিন থেকে রাজ্জাক স্যার হেলু চাচির বাড়িতে থাকছেন। হেলু চাচি হলেন রাজ্জাক স্যারের ছোট ভাই মরহুম খালেক সাহেবের বেগম। আবুল খায়ের লিটুর মা। কয়েক বছর ধরে তিনি তার অপর পুত্র এবং স্যারসহ আলাদা বাড়িতে থাকছেন। গুলশানের একশো নম্বর রাস্তার তিরিশ নম্বর বাড়িতে তারা সবাই থাকেন। সেবার আমার সঙ্গে তরুণ অর্থনীতিবিদ বিআইডিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ছিলেন। তা ছাড়া ছিল একজন তরুণ লেখিকা। নাম সেলিনা শিরিন সিকদার। সে স্যারের ওপর একটি ভিডিও ফিল্ম তৈরি করছে। আমাদের যেতে যেতে অনেক বেলা হয়েছিলো। আমরা একটুখানি ইতস্তত করছিলাম। স্যার মাত্র কদিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেছেন। চোখের চিকিৎসার জন্য তাকে সেখানে নেয়া হয়েছিলো। স্যার জানতেন তার নানা সময়ের কথাবার্তাগুলো আমি লিখছি। আগে যেটুকু লিখেছি তার কম্পিউটার টাইপ করা অংশ স্যারকে দেখলাম। তিনি এক ঝলক দেখে শিটগুলো সরিয়ে দিয়ে বললেন, যা খুশি লেখবার চান লেখেন।
আমি প্রশ্ন করলাম, স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আপনি অনেকদিন ছিলেন, বলতে গেলে গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছেন। আপনি নিজে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। একসময়ে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অনেক নামকরা মানুষ ছিলেন। কোন কোন শিক্ষককে এখন আপনার সবচাইতে উজ্জ্বল মনে হয়।
স্যার বললেন, আমাগো সময়ে সত্যেন বসু ছিলেন। তিনি ফিজিকসের মানুষ অইলেও অন্যান্য বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য আছিল অগাধ। যে-কোনো বিষয়ে তার ব্যাপক পড়াশোনা আছিল। এমন মানুষ আর একটাও দেখা যায় না। সাহিত্যের উপরও তার দখল আছিল খুব। আমরা যখন ভরতি অইছি, তখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রিটায়ার করছেন। আমরা মোহিতলাল মজুমদাররে পাইছি। মোহিতলালবাবু বড় স্কলার আছিলেন। কিন্তু জিভটা আছিল বড় খারাপ। অকারণে মাইনষেরে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। এস. কে. দে মানে সুশীলকুমার দে আছিলেন, অত্যন্ত উচ্চশ্রেণীর মানুষ হিসাবে এবং স্কলার হিসাবে। তারপর আমার ডাইরেক্ট টিচার আছিলেন অমিয়বাবু। অমিয়বাবু মানে অমিয় দাশগুপ্ত। বরিশালের মানুষ। এইখান থেইক্যা তিনি দিল্লি চইল্যা যান। তার ছাত্রদের মধ্যে কেউ-কেউ নোবেল প্রাইজ পাইবার যোগ্য অইছে। এই যে অমর্ত্য সেনের কথা সকলে কয়, তিনিও ত অমিয়বাবুর ছাত্র। এইরকম আরও অনেক আছেন। বাংলাদেশ হওনের পর একবার তিনি এই দেশে আইছিলেন। জিল্লুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনেগো বিআইডিএস-এর একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করনের লাইগ্যা, তখন আমার এখানে আছিলেন। এইবারও আওনের কথা আছিল। রেহমান সোবহানের মাধ্যমে আমারে খবর দিছিলেন, রাজ্জাকরে কইবেন, এইবারও আমি তার ওইখানেই থাকুম। হে যেন ব্যবস্থা করে। যেদিন আইব তার একদিন আগে হার্টফেল কইর্যা … স্যার চুপ করলেন।
