বুঝলাম অমিয়বাবুর এই আকস্মিক মৃত্যু তার মনে খুব লেগেছে। আগেও তাকে নানা মানুষের সঙ্গে আমি অমিয় দাশগুপ্তের ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে শুনেছি। আজিজুল হক সাহেবের সঙ্গে আলাপ করতে আমি শুনেছি, এবার অমিয়বাবু যখন ঢাকা আসবেন, অমিয়বাবুকে সম্মানসূচক ডি লিট দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবেন।
আমি আলোচনার মোড় আমাদের সময়ের দিকে ঘুরিয়ে আনলাম। জিগ্গেস করলাম, স্যার, ড. আহমদ শরীফকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? স্যার বললেন, শরীফ ত্যারাবাঁকা কথা বেশ কয়। কিন্তু একসময় ত কাম করছে। হি ডিড মেনি থিংস। টেবিলের ওপর প্রফেসর আবদুল হাইয়ের একটা জীবনীগ্রন্থ দেখিয়ে আমাকে জিগ্গেস করলেন, আবদুল হাই সম্পর্কে আপনেরা কী ভাবেন?
আমি জবাব দিলাম, হাই সাহেব আমার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বিষয়ে আমার অনেক মধুর স্মৃতি আছে। শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত মহৎ ছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে প্রথম দিনের ক্লাসের স্মৃতি হাতড়ে বললাম, তিনি বলতেন পাঁচ ‘ব’তে শিক্ষক। বিনয়, বপু, বাচন, বাৎসল্য ইত্যাদি।
স্যার বললেন, সাহিত্য পত্রিকা বাইর করতেন অন্যন্ত উচ্চমানের। ঠিক সময়ে পত্রিকা বাইর অয় না দেইখ্যা অনেক রাগারাগি করছি। হাই সাহেবরে অনেক বকছিও।
বাংলা ডিপার্টমেন্টটা ভালাই চলছিল। এই দুইজন টিচার আইস্যা বেবাক পরিবেশ বরবাদ কইর্যা দিল। স্যার একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ শিক্ষকের নাম উল্লেখ করলেন। আমি বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে স্যার কী ভাবেন জানতে চাইলাম।
স্যার বললেন, উমর যদি পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন এবং তৎকালীন রাজনীতি কেবল এই একটা বইই লিখতেন, তা অইলেই পস্টারিটি তার নাম স্মরণ করার জন্য যথেষ্ট। সে ত আরও অনেক কাম করছে। উমরের একটা ঋজু খাড়া চরিত্র আছে, বিশ্বাস অনুসারে চলবার চেষ্টা করে। আমগো সমাজে এইরকম মানুষ ক’জন আছে।
তারপর আমি ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন আহমদ সম্পর্কে স্যারের মত জানতে চাইলাম।
স্যার বললেন, আগাগোড়া ভালা মানুষ। তাঁর বউ খালেদা সালাহউদ্দিন বেশ লেখাপড়া জানেন। তারপর আমি ইংরেজি বিভাগের ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন সম্পর্কে জানতে চেয়ে বললাম, স্যার, একটা সময়ে তো সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন আপনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সাজ্জাদ সাহেব সম্পর্কে আপনি কী চিন্তা করেন?
স্যার বললেন, সাজ্জাদারে আমি খুব পছন্দ করতাম। একবার যুনিভার্সিটিতে একটা প্রোভাইস চ্যান্সেলর অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিবার কথা অইল। ভাইস চ্যান্সেলর মাহমুদ হোসেন আমারে কইলেন, আপনে তিনটা নাম ঠিক করেন, আমি তিনটা নাম ঠিক করি। আমি যে লিস্ট করছিলাম, তাতে সাজ্জাদের নাম আছিল দুই নম্বরে। পরে মাহমুদ হোসেনের লিস্টের সঙ্গে মিলাইয়া দেখলাম, তিনিও সাজ্জাদরে দুই নম্বরে রাখছেন। মাহমুদ হোসেন সাহেব আমারে জিগাইলেন, সাজ্জাদের ব্যাপারে আমার লগে আপনের মতামত মিইল্যা গেল। আপনে কী কারণে সাজ্জাদরে দুই নম্বরে রাখছেন? আমি কইলাম, পয়লা আপনের মতটা শুনি, তারপরে আমারটা কমু। মাহমুদ সাহেব কইলেন, সাজ্জাদ’স আদার কোয়ালিফিকেশনস আর অলরাইট। বাট হি ল্যাকস চ্যারিটি। যার মনে দয়া নাই তারে উপরে আনা ঠিক নয়। আমি কইলাম, আমিও সাজ্জাদের ব্যাপারে এটজ্যাকলি একই কথা চিন্তা করছিলাম। তারপর থেইক্যা সাজ্জাদের লগে আমার রিলেশন খারাপ অইয়া গেল। এখানে উল্লেখ করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন সাহেব ইংরেজিতে যে আত্মজীবনী লিখেছেন, তাতে রাজ্জাক সাহেবের নামে অনেক নালিশ করেছেন।
সাজ্জাদ হোসেন পর্ব শেষ হওয়ার পর আমি বললাম, স্যার, সৈয়দ আলি আহসান সম্বন্ধে কিছু বলেন।
স্যার এভাবে শুরু করলেন। সাজ্জাদ অ্যান্ড আলি আহসান, আলি আশরাফ, দে আর কাজিনস। সাজ্জাদ অনার্সে ফাস্ট ক্লাস পাইছিলেন, এম.এ-তে সেকেন্ড ক্লাস। আর আলি আশরাফ অনার্সে ফাস্ট ক্লাস, এম.এ-তে সেকেন্ড ক্লাস। আলি আহসান এম.এ. এবং অনার্স দুইটাতেই সেকেন্ড ক্লাস। তার কনসেপশন খুব ক্লিয়ার আছিল। অ্যাসথেটিকস সেন্স খুব কীন। যে-কোনো বিষয়ে কলম ধরলেই লেখা অইয়া যাইত। আলি আশরাফের লেখার হাত ভোলা আছিল না। ধর্মটর্ম খুব করতেন। তবে আলি আহসানের ব্যাপারে একটা কথা আইল সত্য কথা কদাচিৎ বলতে পারতেন। আমি আলি আহসানরে আত্মজীবনী লেখার পরামর্শ দিছি। কইছি, এখন তা সব সত্য কথা আপনে কাইবার পারবেন না। লেইখ্যা রাইখ্যা যান। আপনের মরণের পর প্রকাশ অইব।
প্রফেসর রেহমান সোবহানের সঙ্গে রাজ্জাক সাহেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই পণ্ডিত ভদ্রলোকটিকে আমি বিশেষ পছন্দ করি না। স্যারের তাঁর প্রতি অতান্তক অনুরাগের কারণটা কী জানতে চাইলাম।
স্যার বললেন, মানুষ হিসাবে রেহমান সোবহানের কারও বিরুদ্ধে কোনো খারাপ মন্তব্য করতে শুনি নাই। তার বাপ আছিল কেনিয়ার পাকিস্তান হাই কমিশনার। মরবার আগে ভদ্রলোক আরেকটা বিয়া কইর্যা ফেলাইছিল। স্বামীর মরণের পর ঐ ভদ্রমহিলা খুব ভয়ে ভয়ে আছিল। পাছে সৎ ছেলেরা তারে প্রপার্টি থেকে ডিপ্রাইভ করেন। রেহমান আর ফারুক তারা দুই ভাই। ভদ্রমহিলারও একটা বাচ্চা আছিল। রেহমান বিদেশ থেইক্যা আইস্যা করাচিতে যাইয়া ভদ্রমহিলার লগে দেখা কইর্যা কইলেন বাবার সম্পত্তি কোথায় কী আছে ইউ নো বেটার দ্যান আই ড়ু। সব আপনের। ভদ্রমহিলারে বাড়িঘর সব দিয়া-থুইয়্যা চইল্যা অইলেন। বাড়িটাও তার অইত না। বউয়ের কারণে অইছে। বউটা রেহমানের চাইতে চালাক-চতুর। আমি অখনও রেহমানের লগে দেখা অইলে ঠাট্টা কইর্যা সরস্বতীর বাহন সেই হাঁসের গল্পটা কই। আপনে সেই হাঁসের মতন পানি মিশান দুধের সবটা দুধ খান। আর আপনের বন্ধুর জন্যে থাকে সবটা পানি।
