স্যার চিরাচরিত সেই হাসিটা হাসলেন। একটুখানি ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে বললেন, বয়েন। তারপর চেয়ার হাতড়াতে লাগলেন।
আজিজুল হক সাহেব বললেন, স্যার, আপনার পেরেশান হওয়ার প্রয়োজন নাই। এই যে চেয়ার আছে বসতাছি।
আমরা যখন বসলাম, আজিজুল হক সাহেব রসিকতা করে বললেন, যেভাবে কাঁথাকুঁথা গায়ে লাগাইছেন মনে হয় স্যারের খুব শীত লাগছে।
স্যার কবুল করলেন। হা শীত একটু লাগছে। অখন কী খাইবেন কন।
খাওনের লাইগ্যা আপনার এমন উতলা হওয়ার প্রয়োজন নাই। কী বই পড়ছেন কন।
স্যার পঠিত পৃষ্ঠাতে একটি চিহ্ন দিয়ে বইটি সন্তৰ্পণে বন্ধ করলেন। অতি পুরোনো বই। নাড়াচাড়া করলেই ঝুরঝুর করে পাতা ঝরে পড়ে। স্যার বললেন, জন অ্যাডামসের রিপোর্টটা দেখতাছি। বইটা এখন দুষ্প্রাপ্য অইয়া গেছে। আমার কাছে এক কপি আছে।
হক সাহেব বললেন, নতুন খবর পাইলেন?
স্যার বললেন, নতুন কিছু নয়, খবর সব পুরানা। বেঙ্গলের সবচাইতে মিসফরচুন ব্যাপার অইল, এইখানে সাপোর্টিং কলেজ অওনের আগে য়্যুনিভার্সিটি তৈয়ার অইছে। আর মিডল স্কুল তৈয়ার না কইর্যা কলেজ বানাইছে। শুরু থেইক্যাই বেঙ্গলের এড়ুকেশন সিসটেমটা আছিল টপ হেভি। হের লাইগ্যা এইখানে ডিগ্রির লাইগ্যা মানুষের একটা ক্ৰেজ জন্মাইছে। আমাগো সময় পর্যন্ত সেই জিনিসটা চালু রাইছে। গ্রামে গঞ্জে যেখানেই যাইবেন, দেখবেন কলেজ জন্মাইতেছে। অখন আমাগো দরকার শক্তিশালী মিডল স্কুল। হেইদিকে কারও নজর নাই।
এরই মধ্যে কাজের ছেলেটা বাকরখানি এবং মাংসের দুটো প্লেট দিয়ে গেলেন। আজিজুল হক সাহেব ছেলেটিকে বললেন, স্যারের প্লেট কই?
তিনি বললেন, আমি একটু আগে খাইছি, আপনেরা খান।
আমরা খাচ্ছিলাম এবং স্যারের কথা শুনছিলাম। মিডল স্কুলের সূত্র ধরেই স্যার বলছিলেন, গ্রেট ব্রিটেনের বাজেতে ডিফেন্সের চাইতে এডুকেশনে বেশি অর্থ অ্যালট করা হয়। এখন দেখতে পাইবেন, এভারেজ ইংলিশ চিলড্রেনরে স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে এক পাউন্ড দুধ খাইতে অয়। হের লাইগ্যা এভারেজ ইংলিশ চিলড্রেনের হেলথ ম্যাচ বেটার দ্যান ওয়াজ ইন দ্য টাইম অভ এম্পায়ার।
আমরা খাওয়া যখন শেষ করেছি, স্যার নতুন প্রকাশিত একটি বাংলা বই নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। অমলেশ ত্রিপাঠির ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পার্টির ইতিহাস বইটি সবে প্রকাশিত হয়েছে। ভদ্রলোক কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময়ে তার এক ছেলে বাংলাদেশে ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনার ছিলেন। অমলেশবাবুকে বাংলা একাডেমীর তরফ থেকে একটি সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো। ওটা বোধহয় কূটনৈতিক গুরুত্বের কারণেই দেয়া হয়েছিলো। হক সাহেব জিগ্গেস করলেন, কেমন লাগল ত্রিপাঠির বই?
স্যার মুখের একটা বিশেষ ভঙ্গি করে বললেন, এক্কোরে মনগড়া সব কথা লেইখ্যা থুইছে।
আমি বললাম, অমলেশবাবুর লেখাটা যখন দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিলো, ছেচল্লিশের রায়ট নিয়ে খুব বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। আরও একটি সাময়িক পত্রিকা চতুরঙ্গেও এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। সে সময়ে যে সব ইন্ডিয়ান আইসিএস অফিসার ছিলেন, তাদের মধ্যেও অনেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ ব্যক্তি চল্লিশের দাঙ্গার জন্য মুখ্যত হোসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দিকে দায়ী করেছেন। সুহরাওয়ার্দি সাহেব মুসলিম পুলিশদের দিয়ে দাঙ্গা করিয়েছিলেন।
রাজ্জার স্যার মন্তব্য করে বসলেন, সুহরাওয়ার্দি সাহেব পুলিশ দিয়া দাঙ্গা করাইছেন, উনারা যখন কইতাছেন, হাচা কইতাছেন মাইন্যা নিলাম। এই কথা ত তারা নতুন কইতাছেন না। ফরটি সিক্স থেইক্যাই কইতাছেন। কিন্তু আমার কথা অইল নাইনটিন ফরটি সিক্স-এ ক্যালকাটায় মুসলিম পুলিশের সংখ্যা আছিল কত? ওয়ান ফোর্থও না। সুহরাওয়ার্দি সাহেব যদি মুসলিম পুলিশের সাহায্য লইয়াও থাকেন, তাগো নাম্বার ওয়ান ফোর্থের অধিক না। বাকি পুলিশ সব আছিল হিন্দু আর শিখ। তারা ত বইয়া আছিল না, তারা কী করছিল?
স্যার তারপর সুহরাওয়ার্দি সাহেব সম্বন্ধে বলতে আরম্ভ করলেন। সুহরাওয়ার্দি সাহেব নামে আছিলেন মুসলিম এবং মুসলিম লীগার। তার খাওন উঠাবসা সব আছিল হিন্দু ভদ্রলোকদের সাথে। বিধান রায়, শরৎ বসু এইসব মানুষদের সঙ্গে তিনি চলাফেরা করতেন। তাঁর পার্সোনেল ফ্রেন্ডদের অনেকেই আছিলেন হিন্দু। যতোবারই রাজ্জাক স্যার সুহরাওয়ার্দির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন, মনে করিয়ে দিতে ভুল করেননি সুহরাওয়ার্দি টাইটেলটা নকল। এবারেও তার পুনরাবৃত্তি করলেন। তারপর সুহরাওয়ার্দি সম্পর্কে আরও কিছু মজার গহন সংবাদ পরিবেশন করলেন। আমি বারবার জানতে চাইছি সুহরাওয়ার্দি সাহেবের আসল প্রফেশনটা কী ছিল।
আমি বললাম, উনি তা লইয়ার ছিলেন। স্যার হাসলেন, হেইডা ত মাইনষে জানে। কিন্তু তিনি ত প্র্যাকটিস করতেন না।
আমি মিনা পেশোয়ারির নামটা উচ্চারণ করলাম।
স্যার বললেন, স্পেসিফিক নামটাম কাইবার পারুম না।
আকাশে চড়চড়ে রোদ উঠেছে। তিনি গায়ের থেকে কাঁথাটা খুলে চেয়ারের হাতায় রাখলেন। তারপর হুঁকোর নলটা তুলে নিয়ে টানতে আরম্ভ করলেন।
আজিজুল হক সাহেব বললেন, স্যার আপনি যে হুঁকা টানতাছেন, কল্কিতে ত তামুক দেওয়া নাই।
স্যার বললেন, আইজকাল এইরকমই। ডাক্তার তামুক এক্কেরে না করছে। যখন ইচ্ছা অয়, এমনি দুয়েকটা টান দিয়া দেখি।
