স্যারের শিক্ষাসম্পর্কিত আলোচনা শেষ হলে আমি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে স্যারের মতামত জানতে চাইলাম। তখনও শেখ সাহেব বেঁচে আছেন। স্যার একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন নাইন্টিন সিক্সটি নাইন থেইক্যা সেভেন্টি ওয়ান পর্যন্ত সময়ে শেখ সাহেব যারেই স্পর্শ করছেন, তার মধ্যে আগুন জ্বালাইয়া দিছেন। হের পরের কথা আমি বলবার পারুম না। আমি গভর্নমেন্টের কারও লগে দেখাসাক্ষাৎ করি না। সেভেন্টি টুতে একবার ইউনিভার্সিটির কাজে তার লগে দেখা করতে গেছিলাম। শেখ সাহেব জীবনে অনেক মানুষের লগে মিশছেন ত আদব লেহাজ আছিল খুব ভালা। অনেক খাতির করলেন। কথায়-কথায় আমি জিগাইলাম, আপনের হাতে তা অখন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। আপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে। জওহরলাল নেহরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়ণরে কইলেন, তোমরা অপজিশন পার্টি গাইড়া তোল। শেখ সাহেব বললেন, আগামী ইলেকশানে অপজিশান পার্টিগুলা ম্যাক্সিমাম পাঁচটার বেশি সীট পাইব না। আমি একটু আহত অইলাম, কইলাম, আপনে অপজিশনরে একশো সিটি ছাইড়া দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন। আমি চইল্যা আইলাম। ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেট্সম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।
দিন তারিখ সাল এসব আমার মনে থাকে না। আর আমি স্মৃতি থেকেই এসব কথা লিখছি। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মজহারুল হক মারা গেছেন। ড. হকের মৃত্যু রাজ্জাক স্যারকে খুব জখম করেছে। বারবার স্যার অর্থনীতি সম্মেলনে দেয়া তার ভাষণটির কথা বলছিলেন। সেই সময়ে সাহস করে ড. হক অনেকগুলো সত্য কথা বলেছিলেন, যা সকলের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পেরেছিল। ড. হক রাজ্জাক স্যারের সতীর্থ কি ছাত্র ছিলেন সে খবর আমি কখনো তাকে জিগ্গেস করিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুতেও তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে উঠতে দেখিছি। মোজাফফর সাহেব ছিলেন রাজ্জাক স্যারের ছাত্র। অত্যন্ত স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। অন্য মানুষের কাছে আমি শুনেছি মোজাফফর সাহেব যখন উনিশশো বাহান্ন সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে জেলে গিয়েছিলেন, রাজ্জাক স্যার তার পরিবারের আংশিক দায়দায়িত্ব বহন করতেন।
উনিশশো আটাত্তর কি উনআশি সালের দিকে হবে। কানাডার টরেন্টো কী অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক প্রফেসর ওয়াহিদুল হক রাজ্জাক স্যারের বাড়ির নিচতলায় থাকতে আরম্ভ করেন। তিনি জিয়া সরকারের মন্ত্রী-টন্ত্রী কিছু একটা হয়ে যাবেন। এরকম গুজব শোনা যাচ্ছিলো। পরে অবশ্য তিনি এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। সে অনেক পরের ব্যাপার। জিয়ার আমলে তিনি যখন এসেছিলেন, রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে থাকতেন এবং আহারাদি করতেন। স্যারের বাসায় যাওয়া-আসা করতে গিয়ে ওয়াহিদুল হক সাহেবের সঙ্গে আমারও একরকম চেনাজানা হয়েছিল। সেবার তিনি দুমাসের মতো ছিলেন। ওয়াহিদুল হক সাহেব চলে যাওয়ার পর স্যারের কাছে একটা তদবির নিয়ে গেলাম। আমাদের চেনাজানা একটি ছাত্র কানাডার কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হওয়ার চেষ্টা করছিলো। ওয়াহিদুল হক সাহেবের মতো একজন নামকরা প্রফেসরের কাছ থেকে যদি একটা সুপারিশপত্র আদায় করা যায়, ছাত্রটির ভরতি হওয়ার পথ সহজ হয়। স্যারকে সমস্ত ব্যাপারটি খুলে বলেছিলাম। শুনেই স্যার মাথা দুলিয়ে বললেন, আমি পারুম না।
আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না স্যার এরকম অস্বীকার করলেন কেনো। তাঁর একটা অনুরোধে যদি ছাত্রের উপকার হয়। স্যার সে কাজটি করতে অসম্মত হবেন কেনো? অতীতে আমি অনেককেই এরকম সাহায্য করতে দেখেছি। আমার ধারণা হলো, স্যার না বললেও ভালো করে চেপেচুপে ধরলে শেষ পর্যন্ত তিনি ওয়াহিদুল হক সাহেবকে একটা চিঠি লিখবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে অনুরোধটা আমি তিন-চারবার করলাম। একদিন স্যার মহা বিরক্ত হয়ে বললেন, এইখান থেইক্যা যাওনের পর ওয়াহিদুল হক আমার কাছে একখান পোষ্টকার্ডও লেখেন নাই। এইবার আসল ব্যাপার বুঝলাম।
প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ মরহুম ড. আবু মাহমুদও লিবিয়া থেকে আসার পরে রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে থাকতেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মাহমুদের চাকুরি ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক উপাচার্য ড. ফজলুল হালিম চৌধুরীর সঙ্গে ড. আবু মাহমুদকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করার আবেদন জানান। সেই আবেদনের কারণেই ড. আবু মাহমুদকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র দেয়া হয়। নতুনভাবে চাকুরিতে যোগ দেয়ার পর ড. আবু মাহমুদকেও রাজ্জাক সাহেবের নামে অনেক আজেবাজে কথা বলতে শুনেছি। প্রফেসর ওয়াহিদুল হক কিংবা ড. আবু মাহমুদকে অহেতুক খাটো করে দেখানো অথবা প্রফেসর রাজ্জাককে তাঁদের তুলনায় মহৎ করে দেখানোর জন্য এ বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হচ্ছে না। রাজ্জাক স্যারের কাছাকাছি থাকার সময় যেসব ব্যাপার আমি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি এবং যেগুলো স্মৃতি থেকে এখনও হারিয়ে যায়নি, সেগুলো প্রকাশ করা আমার একটা দায়িত্বও বটে। মুখ্যত সে কারণেই প্রফেসর ওয়াহিদুল হক এবং ড. আবু মাহমুদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম। স্যারকে এ নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করতে আমি শুনিনি।
১১. আজিজুল হক সাহেব
একদিন আজিজুল হক সাহেবকে নিয়ে স্যারের বাড়িতে গেলাম। তিনি তখন গুলশানে থাকছেন। শীতকাল। স্যার একখানা কথা-গায়ে টেবিলের ওপর ঝুকে পড়ে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে কী একটা অতি পুরোনো হলদে হয়ে আসা বই পড়ছেন। তার চোখের দৃষ্টি কমে এসেছে। প্রথম দৃষ্টিতে মানুষ চিনতে তাঁর কষ্ট হয়। কণ্ঠস্বর শুনেই আজিজুল হক সাহেব খুব কাছে গিয়ে স্যারকে বললেন, মনে হচ্ছে স্যার অত্যন্ত জরুরি কিছু তালাশ করছেন।
