মাসখানেক থাকার পর অনুভব করলেন, এই দরোজা-জানালাহীন পিশাচের মতো দাঁত-বের—করা লাল ইটের জীর্ণ বাড়িতে সুলতানের পক্ষে বাস করা সম্ভব নয়। তিনি বাঁটুলকে এই বাড়িতে রেখে নড়াইল চলে গেলেন। ছবিগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে, রোদে পুড়তে থাকে। কিছুদিন বাটুল এবং তার মাকে খাওয়া—পরার পয়সা জুগিয়েছিলেন। বাটুল আদি পেশায় ছিল নরসুন্দর। সুলতানের আকর্ষণে জাতপেশা ছেড়েছিল এবং বাটুলের জননী ছিল সুলতানের শিষ্যাদের একজন। অনেকেই হয়তো জানেন না সুলতান ছিলেন নড়াইলে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের কাছে একজন দেবতার মতো মানুষ। তারা গোসাইজ্ঞানেই তাকে শ্রদ্ধা করতো। তার শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যাও ছিল অনেক।
সুলতান বাটুলকে সোনার গাঁয়ের বাড়িতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে সেই যে চলে এসেছিলেন সেই বাড়িতে আরেকবার মাত্র পদার্পণ করেছিলেন। জীবনধারণের জন্য বাটুল সে বাড়ির কাছাকাছি একটা সেলুন খুলে বসে। নড়াইল থেকে মা, বউ এবং বাচ্চাদের নিয়ে ওই বাড়িতে বাস করতে আরম্ভ করে। কিছুদিন পর বাটুলের মা ওই বাড়িতে মারা যায়। আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাঁটুলকে সপরিবারে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে বাড়ি দখল করে বসে এবং এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি লিখে একটা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়।
বাঁটুল অন্য একটা বাসা ভাড়া করে বাস করতে আরম্ভ করে। সে সময়ে আশা পোষণ করতো একসময়ে সুলতান সেই বাড়িতে গিয়ে বসবাস করবেন। উনিশশো চুরানব্বই সালে সুলতান মারা যাওয়ার পর বাটুল বিশ্বাস করতো এই বাড়িতে সুলতানের কোনো স্মৃতি থাকলো না। বাটুল প্রায়ই আমার কাছে আসতো এবং বলতো সুলতানের মতো একজন মহাপুরুষের স্মৃতি কিছুতেই মুছে যেতে পারে না। সোনার গাঁয়ের সুলতানের স্মৃতিরক্ষার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। বাটুলের এই বিশ্বাস আমার কাছে পাগলামো মনে হত। তবু তাকে সে কথা বলতে পারিনি। উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে স্থানীয় কিছু তরুণদের নিয়ে সুলতানের মৃত্যুদিবস ওই বাড়ির সামনে উদযাপন করার আয়োজন করেছিল। আমার কাছে পাকা কথা আদায় করেছিল। ঠিক দুটোর সময়ে পানামের বাড়িটির সামনে গিয়ে হাজির হই। আমি রত্নেশ্বর নামক তরুণ এবং বন্যা নামের এক তরুণীকে নিয়ে ঠিকই সোনারগাঁয়ে গিয়েছিলাম। ওই বাড়িটির সামনে গিয়ে দেখি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। বাটুলকে অনেক খোঁজ করে বের করতে হলো। বাটুল জানালো সে লজ্জিত। কিন্তু আমাদের সান্ত্বনা দিতে ভুললো না। স্যার, কিছু মনে করবেন না। ফাঁকিজুকি আর ক’দিন চলবে! কতদিন আর দেবতার জায়গা দখল করে রাখতে পারবে! দেখবেন এই বাড়িতেই শিল্পী সুলতানের শিল্পমন্দির তৈরি হবে। এই সোনার গাঁতেই একদিন শিল্পী সুলতানের নামের ডঙ্কা বাজবে।
এরই মধ্যে বাটুল আমার কাছে আরও পাঁচ-সাতবার আসা-যাওয়া করেছে। সে এলে আমি ভারি বিব্রত হয়ে পড়তাম। কোনোরকমে যাওয়া-আসার পথখরচটা দিয়ে রেহাই পেতে চেষ্টা করতাম। তথাপি বাটুলকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। কারণ তার মধ্যে আমি একটা পবিত্র অগ্নিশিখা জ্বলছে, এরকম অনুভব করতাম। দুমাস আগে বাটুলের ন্যাড়ামাথা বড়ো ছেলেটি এসে জানিয়ে গেলো দশদিন আগে তার বাবা মারা গেছে। ছেলেটি জানালো মরবার আগেও তার বাবার মুখে ছিল সুলতান সাহেবের নাম। ছেলেটি দশ পনেরো দিন অন্তর একবার করে আসে। আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় তার একটি চাকুরির প্রয়োজন। এখনও পর্যন্ত আমি তার কিছুই করতে পারিনি। আর আসে প্রফুল্ল। প্রফুল্লের কথাটি বলে আমি আবার রাজ্জাক স্যারের কথায় ফিরে যাবো।
আগুন যেমন পতঙ্গকে আকর্ষণ করে সুলতানের প্রতিও কিছু মানুষ তেমনি আকৃষ্ট হত। প্রফুল্ল তার একজন। প্রফুল্লর বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। পেশাতে সে কাঠমিস্ত্রি। বাড়িতে তার এক বুড়ো দাদা আর তার ছেলেমেয়ে। প্রফুল্লের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। এখনও বিয়ে করেনি। একসময় ঠিকা কাজ করতে সোনার গাঁ এসেছিলো। তখনই সুলতানের সঙ্গে পরিচয়। তার পর থেকেই সে ছবি আঁকতে শুরু করে। গুরু সুলতান। তিনি ভরসা দিয়েছেন, একে যাও, একসময় তুমি নামকরা শিল্পী হবে। গুরুর আশীৰ্বাদ সম্বল করেই প্রফুল্ল এঁকে যাচ্ছে। রঙ নেই, তুলি নেই, কিছু নেই, তথাপি প্রফুল্লের বিরাম নেই। দূর থেকে দেখলে প্রফুল্লের ছবিগুলোকে সুলতানের ছবি বলে ভ্রম হয়। কাছে এলে অবশ্য টের পাওয়া যায়। প্রফুল্লের যদি আরেকটু বিদ্যা থাকত, সে যদি আরেকটু সচ্ছল হত! সুলতানকে কেনো আমি অসাধারণ একজন মানুষ মনে করতাম, এতদিনে তার একটা কারণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। সুলতান প্রফুল্লের মতো একজন মাঝ—বয়সী অশিক্ষিত মানুষের মনেও শিল্পী হওয়ার বীজ বুনে দিতে পেরেছিলেন। এমন তো আর কাউকে দেখিনি!
এ লেখা যখন লিখছি তার এক সপ্তাহ আগে প্রফুল্ল এসেছিল। জামার পকেট থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো একটা পেপারকাটিং বের করে দিয়ে বলল, স্যার পড়ে দেখুন।
আমি বললাম, তুমিই পড়ে শোনাও।
সে পড়ে শোনালো। ভ্যান গ’গ-এর একটি ছবি নীলামে বিক্রি হয়েছে। আমাদের টাকায় দাম উঠেছে আটান্ন কোটি টাকা। প্ৰফুল্ল বলল, স্যার, আটান্ন কোটি অনেক টাকা—তার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো—অথচ লোকটা না খেতে পেয়ে আত্মহত্যা করেছে।
রাজ্জাক স্যারের কথা বলতে গিয়ে সুলতানের কথা বলতে হচ্ছে। সুলতানের কথায় বাটুল এবং প্রফুল্লের কথা ঢুকে পড়েছে। এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। তবু বললাম। হয়তো সুলতানের ওপর আবার লেখার সুযোগ আমার হবে না।
