যাহোক মূল বিষয়ে ফিরে আসি। রাজ্জাক স্যার বললেন, সুলতানের ছবিগুলা নিয়া আইবার কথা কইবার লাগছে তিন চার দিন থেইক্যা। হাঁচাই ত এইভাবে পইড়া থাকলে ছবির ত কিছু থাকত না। আমি হুদা সাহেবরে কইয়া একখানা ট্রাকের ব্যবস্থা করছি। কাইল আপনের হাতে যদি সময় থাকে একটু গেলে ভালা অয়। সুলতান সায়েব আপনাভোলা মানুষ। কওনি তো যায় না কখন কী কইর্যা বসে। সরকারি গাড়ি পাঁচটার আগে ইডেন বিল্ডিংসের গেরেজে দিয়্যা আইতে অইব। নইলে হুদা সাহেবকে বিব্রত বোধ করতে অইব।
হুদা সাহেবের একটু পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। হুদা সাহেব মানে মির্জা নূরুল হুদা। একসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন। তারপরে জিয়ার সময়ে বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি রাজ্জাক সাহেবের ছাত্র এবং অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকও ছিলেন।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, যাবো।
তার পরের দিন ট্রাক নিয়ে সোনার গাঁ চলে গেলাম। সুলতান সাহেবের নামে বরাদ্দ করা বাড়িটা দেখলাম। চুন বালি ঝরে গেলেও বাড়ির কাঠামোটা এখনও বেশ শক্ত। কিন্তু একটিও দরোজা—জানালা নেই। ড্রাইভার এবং আরেকজন লোকের সাহায্যে ছবিগুলো একে একে ট্রাকে তুলতে লাগলাম। সাধারণত সুলতান খুব বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকতেন। উনিশশো ছিয়াত্তর সালের একজিবিশনের জন্য সুলতান তিরিশ-পঁয়ত্ৰিশটা ছোটো ছোটো ছবি এঁকেছিলেন। একজিবিশনে এই ছোটো ছবিগুলোর দিকে ভালো করে তাকাতে পারিনি। এখন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একেকটি ছবিকে জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার একেকটি কবিতার সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে হল।
সব ছবি ওঠানোর পর বাধাঁছাঁদা করে সব যখন ঠিক করে ফেলেছি, গোল বাঁধালেন সুলতান স্বয়ং।। গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা দাড়িঅলা একটা মানুষ একতারা-হাতে হাজির হলো। সুলতান দাঁড়িয়ে লোকটির সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তারপর দুজনে গাঁজা টানতে বসে গেলেন। গাঁজার কল্কিতে দম দিয়ে সুলতান মাথা দোলাচ্ছেন আর বুড়োটি শুরু করেছেন একতারা বাজিয়ে গান। সুলতানকে টেনেও ওঠানো যায় না। আমি পড়ে গেলাম মহামুশকিলে।
কাটায়-কাটায় পাঁচটার সময় ট্রাক ইডেন বিল্ডিংসে ফেরত দিতে হবে। তারপর যেতে হবে আমার বন্ধু কুমারশঙ্কর হাজরার বৌভাতের নিমন্ত্রণে। সুলতানকে যতোই বোঝাই, তাঁর একই জবাব—ম্যায় সুলতান হ্যাঁয়, কিসিকা হুকুম সে কোযি কাম নেহি করত। হাম আপনা মার্জি সে হার কাম করতা।
দোসরা লোকটি সায় দিয়ে বলল, বিলকুল ঠিক, আপ তো সুলতান হ্যাঁয়।
এখন বুঝতে পারলাম, রাজ্জাক স্যারের অনুমান কতদূর সত্য।
সুলতানকে কোনোরকমে আসন থেকে টলাতে না পেরে অগত্যা আমি ট্রাকে উঠে বসে ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি স্টার্ট দিন। আমাদের পাঁচটার মধ্যে পৌঁছতে হবে। গাড়ি যেই আওয়াজ করে ধোয়া তুলে চলতে আরম্ভ করে কিছুদূর এগিয়ে এসেছে, পেছন থেকে সুলতানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ছফা ভাই, আমাকে ফেলে যাবেন না।
ছবিগুলো এনে রাজ্জাক স্যারের বাড়ির নিচের তলায় গুছিয়েগাছিয়ে রাখলাম। একটুখানি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক ছবিগুলো বেঁচে গেলো। মাসখানেক পরে নড়াইল থেকে আবার সুলতান এলেন। এবার দেখলাম তার কণ্ঠস্বর ভয়ানক বদলে গেছে। কার কাছে তিনি শুনেছেন তার অবর্তমানে রাজ্জাক সাহেব তার ছবিগুলো বেচে দিতে পারেন। সুলতান আবার জেদ করতে আরম্ভ করলেন, ছবিগুলো আবার ট্রাকে করে নড়াইলের বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসতে হবে। আমি লজ্জায় স্যারকে মুখ দেখাতে পারছিলাম না। আমি জানতাম স্যার গোপনে সুলতানকে তিরিশ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। সুলতান তার প্রায় সবটা এলিফ্যান্ট রোডের সুরীশ্ৰী থেকে বাদ্যযন্ত্র কিনে খরচ করে ফেলেছিলেন। আর সুলতানের ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। যাহোক, রাজ্জাক স্যারকে আবার ট্রাকের ব্যবস্থা করতে হলো। আড়াই হাজার কি তিন হাজার টাকা ভাড়া ছাড়া কেউ নড়াইল যেতে রাজি ছিলো না। ছবি তো সুলতান সাহেব নড়াইল নিয়ে গেলেন। ছবিগুলোর ভাগ্যে কী ঘটলো সেটাও একটু বলা প্রয়োজন। একবার একটা দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হল। সুলতানের বাড়িতে খাবার নেই। তাঁর জীবজন্তুগুলো অনাহারে ঝুঁকছে। এই নাজুক সময়টিতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলের মালিক সুলতানের কাছে হাজির হলেন। মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা সুলতানকে নগদে পরিশোধ করে ট্রাকে ভরে ছবিগুলো আবার চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। ওই হোটেল-মালিকের কাছ থেকে চট্টগ্রামের শিল্পপতি এ কে খানের ছেলে পাঁচ-সাতটি ছবি কিনেছিলেন।
উনিশশো সাতাশি সালে গ্যোতে ইনস্ট্যুট সুলতানের ছবির একটা প্রদর্শনী করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমিও তার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যাঁদের সংগ্রহে সুলতানের ছবি আছে প্রদর্শনের জন্য ধার হিসেবে ছবিগুলো সংগ্রহ করেছিলাম। সকলে সানন্দে তাদের ছবি দিয়েছেন। এ কে খান সাহেবের ছেলের কাছে যখন ছবিগুলো ধার দিতে চিঠি লিখলাম, তিনি জানালেন, দু লক্ষ টাকার ইন্সুরেন্স করতে হবে এবং প্রিমিয়ামের প্রথম ইনস্টলমেন্টের টাকা প্রদর্শনী কর্তৃপক্ষকে শোধ করতে হবে। অনেক ধরাপড়ার পর বিনা ইন্সুরেন্সে ছবিগুলো তিনি নিজের খরচে পাঠিয়েছিলেন এবং ফেরত নিয়েছিলেন। অবশ্য রাজ্জাক স্যারের ভ্রাতুষ্পপুত্র আবুল খায়ের লিটুর সঙ্গে সুলতান ছবি আঁকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সে অনেক আগের ব্যাপার। সে বিষয়ে আমি কিছু বলবো না।
১০. সালমান রুশদির উপন্যাস মিডনাইট চিলড্রেনস
সালমান রুশদির লেখা ইংরেজি উপন্যাস মিডনাইট চিলড্রেনস ঢাকার বাজারে এসেছে। স্যার এক কপি কিনেছেন। পড়া শুরু করার পর থেকেই ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন। পড়ছেন এবং তারিফ করছেন। ইংরিজি ভাষার ইডিয়াম ব্যবহারের পদ্ধতিটাই এক্কোরে পাল্টাইয়া ফেলাইছে। এই এতদিন পরে ইন্ডিয়ানরা ইংরেজগো উপর প্রতিশোধ লইবার লাগছে। ইংরাজ আমলে ইন্ডিয়ায় যারাই ইংরেজি লিখছেন, তার মধ্যে একমাত্র গান্ধী ছাড়া আর কারও লেখাই টিকব না।
