আমি ভীষণ শরমিন্দা হয়ে পড়লাম। দুপুরবেলাতেই স্যারের বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে সকলে তখন খেতে বসছেন। স্যার আমাকে দেখেই বললেন, এ্যাতো দেরি কইর্যা অইলে আপনের ব্যবসা চলব কেমন কইর্যা। আমি আমার কর্মচারীর খারাপ ব্যবহারের জন্য মাফ চাইতে যাচ্ছিলাম। স্যার আমাকে মুখই খুলতে দিলেন না। বললেন, হাত ধুইয়া বইয়া পড়েন, অনেকদিন আপনে আমাগো লগে খাইতে আহেন না।
আরেকবার আমার এক জার্মান-প্রবাসিনী পশ্চিমবাংলার বান্ধবী এসেছিল। তাকে নিয়ে গুলশানে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি তখন তার ভ্রাতুষ্পপুত্র আবুল খায়ের লিটুর সঙ্গে থাকতেন। সেদিন দুপুরে আমরা স্যারের ওখানে খাওয়াদাওয়া করেছিলাম। তখন চৈত্রমাস শেষ হতে চলেছে। আমরা খেয়েদেয়ে বাড়ির সামনের উঠানে এসে দাড়িয়েছি, আমার বান্ধবীটি গাছে থরেথরে ঝুলন্ত কাঁঠাল দেখে ভীষণরকম উদ্বেল হয়ে ওঠে। সে স্যারকে জিগ্গেস করে বসে, কাকাবাবু, আপনার বাড়ির কাঁঠাল দিয়ে এঁচোড় রান্না করা যায় না?
স্যার বললেন, আপনের এঁচোড় খাইবার খুব ইচ্ছা হয় নিহি?
আমার বান্ধবীটি বলল, সেই কবে ছোটোবেলায় খেয়েছি। আপনার গাছের কাঠাল দেখে এঁচোড়ের কথা মনে পড়ে গেল।
স্যার বললেন, এঁচোড় যে খাইবার চান কী করে রানতে আয় হেইডা জানেন কি না।
আমার বান্ধবী মুখ কালো করে বললেন, না কাকাবাবু, এঁচোড় কী করে রাঁধতে হয় শিখিনি।
স্যার আমাকে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা এক কাম করেন, আপনি কই থাকেন ঠিকানা লেইখ্যা থুইয়া যান। কাইল দুপুরে এঁচোড় রাইন্ধ্যা পাঠাইয়া দিমুনে।
আমি ঠিকানা লিখে চলে এলাম।
পরের দিন আমার বান্ধবীকে কাচপুর ব্রিজের কাছে নদী দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে বেলা হয়ে গেল। ঘরে এসে যখন গোসল করে বসলাম, আমার কাজের ছেলে ইদ্রিসের কাছে কাহিনীটা শোনা গেল।
ইন্দ্রিস বলল, একটা বুইর্যা মানুষ এই টিফিন ক্যারিয়ারটা রাইখ্যা গেছে। তখনই মনে পড়ে গেল। রাজ্জাক স্যার বলেছিলেন তিনি এঁচোড় রান্না করে দুপুরবেলা পাঠিয়ে দেবেন। আমি ইদ্রিসকে জিগ্রগেস করলাম, তুমি ভদ্রলোককে খাতির করে ঘরে ডেকে বসিয়েছিলে কি না।
ইদ্রিস জবাব দিল, মানুষটার গায়ে একটা ফাডা ছিড়া পাঞ্জাবি আর ময়লা লুঙ্গি আর ঢাকাইয়া কথা কয়। কই থেকা আইছে যখন জিগাইলাম, কয় সায়েব টিফিন ক্যারিয়ার দেখলেই বুঝতে পারবো নে। আমিও ডাকি নাই। হেই বেডাও বসবার চায় নাই।
এখন সুলতানের কথায় আসি। মাসখানেক পড়ে সুলতান এলেন নড়াইল থেকে। আমি ওনাকে নিয়ে স্যারের বাড়িতে গেলাম। সুলতানের একটা বৈশিষ্ট্য আমি গোড়া থেকেই লক্ষ করে এসেছি। যাঁদের সঙ্গেই তার পরিচয় হয়, সকলে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। স্যারের বেলায়ও তার ব্যত্যয় হল না। স্যার একা নন, তাঁর পরিবারের সকলেই সুলতানের প্রতি মমতাসম্পন্ন হয়ে উঠেছেন। স্যারের ভ্রাতৃবধূ, দুই ভ্রাতুষ্পপুত্রী মায় অতিশিশু নাতিটি পর্যন্ত সুলতানের অনুরাগী হয়ে উঠেছে। এত মিষ্টি করে এমন সুন্দর কথা সুলতানের মতো আর কাউকে বলতে দেখিনি।
সেদিনই বিকেলবেলা সুলতান তাঁর জোব্বাজাব্বা, নিজের হাতে বানানো বাঁশির বোঝা, গাঁজার কন্ধি এবং অন্যবিধ সাজসরঞ্জাম নিয়ে স্যারের বাড়ির নিচতলায় এসে আস্তানা পাতালেন। তার পর থেকে যখনই স্যারের বাড়িতে যাই দেখি আমার সঙ্গে সুলতানের কথা বলার সময় হয় না। কখনো দেখি স্যারের মুখোমুখি বসে গম্ভীরভাবে আলাপ করছেন এবং মাথা দোলাচ্ছেন। অথবা বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে প্রবাসজীবনের গল্প করছেন। স্যারের শ্যামলা নাতি লিটুর ছেলে যার চোখদুটি খুব বড় বড় এবং যে বড়সড়ো খাঁচায় দুটো রাজঘুঘুর বাচ্চা পোষে, তার সঙ্গেও দেখি সুলতানের গলায়-গলায় ভাব। প্রতিদিনই দেখি সুলতান স্যারকে নিয়ে নানা জায়গায় যাচ্ছেন। আমার খুব ঈর্ষা হচ্ছিলো। আমিই সুলতানকে স্যারের কাছে নিয়ে এলাম, এখন দেখতে পাচ্ছি। সুলতান আমাকে হটিয়ে দিয়েছেন।
একদিন সকালবেলা স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি সুলতান নেই। আমি স্যারকে জিগ্গেস করলাম, সুলতান ভাই কই?
স্যার বললেন, সুলতানের লোকরা আইস্যা ডাইক্যা লইয়া গেছে।
আমি বললাম, সুলতানের আবার লোকজন আসবে কোত্থেকে!
স্যার বললেন, তামুক টামুক খাইবার লোকজন আর কি।
আমি বললাম, গাঁজাখোররা আপনার বাড়ির ঠিকানা পেল কেমন করে?
স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ঠিকানা পাওনের কোনো কষ্ট নাই, অরা গায়ের গন্ধেই টের পাইয়া যায়।
তারপর স্যার আসল কথা পাড়লেন। কয়েকদিন থেকে সুলতান নাকি স্যারকে বলছেন তার তিনশোর মতো ছবি সোনার গাঁয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এগুলো যদি ওখান থেকে উদ্ধার করা না যায় ছবিগুলোর কিছুই থাকবে না। সুলতানের ছবি সোনার গাঁয়ে গেল কী করে সে কাহিনীটা বলা প্রয়োজন। উনিশশো ছিয়াত্তর সালে শিল্পকলা একাডেমীতে যখন সুলতানের চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়, সেই সময়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী নূরুল ইসলাম শিশুর বেগম প্রদর্শনীতে ছবি দেখে সুলতানের ছবির প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। ভদ্রমহিলার বোধহয় অল্পস্বল্প আঁকার ঝোঁক ছিলো। তিনি সুলতানকে ছবি আঁকা শিখিয়ে দিতে অনুরোধ জানান। সুলতানও রাজি হয়ে যান। কিছুদিন মন্ত্রীর বাড়িতে সুলতানের নিয়মিত যাওয়া-আসা চলে। সেই সূত্রে নূরুল ইসলাম শিশুর সঙ্গে সুলতানের পরিচয়। একদিন কথায়—কথায় সুলতান মন্ত্রীসাহেবকে জানান, এই প্রদর্শনীর শেষে ছবিগুলো নিয়ে কোথায় রাখবেন ও নিয়ে তাঁর ভয়ানক দুশ্চিন্তা। ঢাকা কিংবা কাছাকাছি কোথাও একটু জায়গা পাওয়া গেলে সুলতান ছবিগুলো সরিয়ে নিয়ে রাখতে পারেন। নুরুল ইসলাম শিশু সাহেব সরকারি ক্ষমতা খাটিয়ে সোনার গাঁইয়ের পানামে একটা পরিত্যক্ত দোতলা বাড়ি সুলতানকে বরাদ্দ করেন। সুলতান শিল্পকলা একাডেমী থেকে ছবিগুলো সে বাড়িতে নিয়ে যান এবং তার বিশ্বস্ত চেলা বাঁটুলকে নিয়ে সে বাড়িতে বাস করতে আরম্ভ করেন। এই জায়গাটি সুলতানের মনে ধরেছিলো, তার পেছনে বোধকরি একটাই কারণ—এই বাড়ির পাঁচ সাত বাড়ি পরে জয়নুল আবেদীন লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপন করেছিলেন। হয়তো সুলতানও ওরকম কিছু একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন।
