আমি যখন বুঝতে পারলাম, শহরবাসী আর্ট এস্টাবলিশমেন্টের লোকেরা সুলতানের শিল্পকর্মের ব্যাপক পরিচিতি এবং মূল্যায়নের পথে একটা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, তারপর আমি আমার কর্তব্য স্থির করলাম। যে-করেই হোক, সুলতানকে অবশ্যই জনসমক্ষে প্রকাশমান করে তুলতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল আমি নিজে কিন্তু চিত্রশিল্পী নই। চিত্রশিল্পের ব্যাপারে আমার মতামতের কোনো মূল্য নেই। তাই আমি চাইছিলাম, সমানে মান্যতা অর্জন করেছেন এমন কোনো ব্যক্তি যদি সুলতানকে তুলে ধরতে এগিয়ে আসেন। আমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। অনেকের কাছেই গেলাম। কেউ-কেউ আগ্রহ প্রদর্শন করলেন, কেউ-কেউ শীতলতা। যাহোক, রাজ্জাক স্যারের কাছে গিয়ে সুলতানের ছবি সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বললাম। দেখলাম, চিড়ে ভেজার কোনো সম্ভাবনা নেই। স্যার তখনও শিল্পী বলতে বোঝেন, ওই একমাত্র জয়নুল আবেদীন। চিত্রকলার অনেক লোকের সঙ্গে স্যারের ওঠা বসা, যাওয়া-আসা আছে, কিন্তু প্ৰাণের ভেতর থেকে জয়নুল আবেদীন ছাড়া অন্য কাউকে স্বীকৃতি দিতে চান না।
আমি একটুখানি দমে গেলাম। এই এতদিনে রাজ্জাক স্যারকে অত্যন্ত সংবেদনশীল চরিত্রের মানুষ বলে জেনে গিয়েছিলাম। তার কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া যখন পাওয়া গেল না। সুলতানকে নিয়ে কী করবো স্থির করতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার স্থির ধারণা সুলতান একজন বিশ্বমাপের শিল্পী। সকলে তাকে স্বীকার করে নিতে কুন্ঠা প্রদর্শন করছেন। কারণ তারা একজন আগন্তুককে শ্ৰেষ্ঠত্বের আসনখানি ছেড়ে দিতে নারাজ। আমি মনেমনে এভাবে গোটা ব্যাপারটা চিন্তা করলাম। সুলতানের মতো আমিও গ্রাম থেকে এসেছি। আজকে শহরের লোকেরা সুলতানকে যে উপেক্ষা এবং অবহেলা প্রদর্শন করছে, এই জিনিসটি একদিন আমার বেলায়ও ঘটতে পারে। সুলতানকে যদি ওই নীরব ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বের করে না আনতে পারি, একদিন আমাকেও সুলতানের ভাগ্য মেনে নিতে হবে। আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষিক শামীম শিকদার আমার বন্ধু ছিল। সে ছিল তখন ছাত্রী। শামীম এবং তার বন্ধুবান্ধবেরা আমার ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের কক্ষটিকে অনেকটা তাদের স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করতো। এই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে আমি নিজেও অল্পস্বল্প ছবি আঁকার কলাকৌশল রপ্ত করলাম। খুব গভীরভাবে শিল্পকলা সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে আরম্ভ করলাম। অনেকদিন পড়াশোনা করার পর আমার একটা প্রত্যয় জন্মালো যে সুলতানের সম্পর্কে কিছু সাহসী বক্তব্য প্রকাশ করার যোগ্যতা আমার জন্মেছে। আমি সুলতানের চিত্রকর্মের ওপর ‘বাংলার চিত্রঐতিহ্য এবং সুলতানের সাধনা’ শিরোনামে পঞ্চাশ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্ৰবন্ধ লিখে ‘মূলভূমি’ নামাঙ্কিত একটি সাময়িকীতে প্রকাশ করলাম। তারপর প্রবন্ধটা আলাদা একটি পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশ করি এবং সাহিত্যশিল্পের অনুরাগী মানুষদের একটি করে পুস্তিকা কখনো নিজের হাতে অথবা লোক মারফত কিংবা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতে থাকি। একটা পুস্তিকা নিয়ে একদিন রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে হাজির হলাম। স্যারকে বিশেষভাবে অনুরোধ করি তিনি যেনো আমার লেখাটি পড়ে দেখেন। স্যার যেনো মনে না করেন আমি একটা উটকো লোকের বিষয় নিয়ে অযথা উৎপাত করছি, সেজন্য দশ পনরোদিন ওমুখো হইনি।
এক সকালবেলা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলাম কে একজন দরোজায় টোকা দিচ্ছে। চোখেমুখে ঘুম নিয়েই আমি জিগ্গেস করলাম, কে? জবাব পেলাম, আমি আবদুর রাজ্জাক।
বজলুর ক্যান্টিনের যে ছেলেটা সকালে নাস্তা খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতো তার নামও আবদুর রাজ্জাক। আমি ভাবলাম ক্যান্টিন—বয় আবদুর রাজ্জাক আমাকে নাস্তা খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে। আমি ঘুমের ঘোরেই বলে বসলাম, রাজ্জাক মিয়া এখন যাও, পরে গিয়ে নাস্তা খাবো।
ওপার থেকে জবাব পাওয়া গেল, পরে অইলে নাস্তা নাও পাইতে পারেন।
রাজ্জাকের বাড়ি বরিশাল। এই আওয়াজটি বরিশালের নয়। আমি উঠে দরোজা খুললাম। ওমা, দেখি রাজ্জাক স্যার! স্যার ঘরে এসে বসলেন। তার হাতে পুস্তিকাটি। আমাকে বললেন, কামড়া ভালা করছেন। আপনের সুলতান কই?
আমি বললাম, তিনি নড়াইলে থাকেন।
স্যার বললেন, ঢাকায় আইব না?
বললাম, দুচার দিনের মধ্যে আসার কথা আছে।
স্যার বললেন, অইলে একবার দেখা করাইয়া দিয়েন।
সুলতানের প্রসঙ্গ শেষ করার আগে আরও দুটি মজার গল্প আমাকে বলতে হবে। আমি একটা প্রেস করেছিলাম। সেই প্রেস থেকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। বত্ৰিশ নম্বর তোপখানা রোডে ছিল অফিস। তখন আমি মীরপুরে থাকতাম। একদিন স্যারের বাড়িতে যেয়ে অনুরধ করেছিলাম, তিনি যেনো আমার প্রেসে এসে একবার পায়ের ধুলো দিয়ে যান। পরের দিন অফিসে এসেই আমার প্রেসের ম্যানেজারের মুখে শুনলাম, একজন লুঙ্গি, চাদর এবং পাঞ্জাবি-পরা বুড়োমতো মানুষ বেলা ন’টার সময় এসে অনেকক্ষণ আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করেছেন। স্যার যে পরদিনই প্রেসে চলে আসবেন ভাবতে পারিনি। আমি ম্যানেজারকে জিগ্গেস করলাম, আপনি অফিস খুলে বসতে দেননি কেনো? ম্যানেজার আমাকে জানালেন, আমি মনে করেছি প্রেসের মেশিনম্যান কিংবা কম্পোজিটরের চাকুরি চাইতে লোকটা এসেছিলো। আমাদের কোনো মানুষের প্রয়োজন নেই। তাই বলে দিয়েছি আমাদের এখানে কোনো মানুষের দরকার নেই। শুনেই লোকটা চলে গেলো।
