আমি প্রতিবাদ করে বললাম, বঙ্কিমের সব রচনার বিষয়বস্তু তো ধর্মীয় নয়।
স্যার বললেন, ওই অইল একই কথা, রিভাইভিলিস্ট স্পিরিট অ্যান্ড মডার্ন স্পিরিট এ ওর গায়ে ঠেস দিয়া খাড়াইয়া আছে।
স্যারের কথাটা পুরোপুরি মেনে নিতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো। তাই বললাম, মাইকেল, বঙ্কিম ওনাদের হাতেই তো বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার সূত্রপাত।
স্যার বললেন, আধুনিকতা জিনিসটিরেও তা ভালা কইর্যা বুঝন লাগব। আধুনিকতা জিনিসটি বেবাক দুনিয়ায় একই সময়ে আইছে। দশ বছর আগে কিংবা দশ বছর পরে। বিলাতে রেলগাড়ি চালু অওনের দশ বছর পরে ইন্ডিয়াতে রেল আইয়া গেছে। বঙ্কিম মারা গেছেন আঠার শো তিরানব্বই সালে। আর টলস্টয় মারা গেলেন উনিশশো এগারো সালে। বঙ্কিমের তুলনায় টলস্টয় দীর্ঘ জীবন পাইছিলেন। সেই দিক দিয়া দেখতে গেলে টলস্টয় বঙ্কিমের কন্টেম্পরারি। দুইজনের লেখার কন্টেন্ট মিলাইয়া দেখেন। টলস্টয় কমন ম্যানকে কী চৌকে দেখছেন, আর বঙ্কিম কী চৌকে দেখছেন। শুধু টলস্টয় আর বঙ্কিম কেন ইউরোপের লিটারারি স্টলওয়ার্ট ফ্লবেয়ার, মোপাসাঁ, চেখভ, টুর্গেনিয়েভ, গোগল, জোলা সকলে একটা বিশেষ সময়ের মানুষ। এদের লগে আপনে রবীন্দ্রনাথরেও ধরবার পারেন।
আমি বললাম, স্যার, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কিছু বলেন।
স্যার বললেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ঠিকই আছিল। বাংলা ভাষাটি ত রবীন্দ্রনাথের হাতেই পুষ্ট অইছে। এক হাতে বিচিত্র বিষয় নিয়া লিখছেন, এইটাই রবীন্দ্রনাথের সবচাইতে বড় ক্রেডিট। আদার দ্যান লিটারারি ট্যালেন্ট অন্যান্য বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের যদি বিদ্যাসাগরের মতো মানুষদের সঙ্গে তুলনা করেন, হি কামস নো হোয়ার নিয়াবার টু দেম।
স্যারের কথাটা শুনে আমার ভালো লাগল না। আমি রবীন্দ্রনাথকে খুব বড় একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। তাই জিগ্গেস করলাম, রবীন্দ্রনাথ কি খুব বড় একজন মানুষ নন?
স্যার বললেন, রবীন্দ্রনাথ বড় লেখক, মানুষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর কিংবা তার মতো মানুষদের ধারে কাছেও আসতে পারেন না। বড় লেখক এবং বড় মানুষ এক নয়। বড় লেখকদের মধ্যে বড় মানুষের ছায়া থাকে। বড় মানুষরা আসলেই বড় মানুষ। লেখক কবিরা যা বলে সেরকম আচরণ না করলেও চলে। হের লাইগ্যা প্লেটো তার রিপাবলিক থ্যাইক্যা কবিগো নির্বাসনে পাঠাইবার কথা বলছিল।
আমি বললাম, একথা কি রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও প্রযোজ্য।
স্যার বললেন, রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম অইল কেমনে। তিনিও ত এই ক্যাটাগরির মধ্যে পড়েন।
আমার মনের মধ্যে একটুখানি খুঁতখুঁতানি থেকে গেল। সেজন্য পালটা প্রশ্ন করলাম, রবীন্দ্রনাথ কি বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে উৎকর্ষের একটা বিশেষ স্তরে নিয়ে যাননি?
স্যার বললেন, বাংলা ভাষাটা বাঁচাইয়া রাখছে চাষাভুষা, মুটেমজুর—এরা কথা কয় দেইখ্যাই ত কবি কবিতা লিখতে পারে। সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় কেউ কথা কয় না, হের লাইগ্যা অখন সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় সাহিত্য লেখা অয় না।
স্যার তারপর রবীন্দ্রনাথের সামাজিক প্রবন্ধ নিয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সামাজিক প্ৰবন্ধসমূহে যে সকল এমপিরিক্যাল কথাবার্তা কইছেন, সেগুলা খুব কাজের জিনিস অইছে। এ নিয়া বেশি মানুষরে কথাবার্তা কইতে দেখা যায় না। আমার ইচ্ছা আছিল যে সকল সামাজিক প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে স্থান পাইছে, সেগুলোর একটা তালিকা করা।
কিছুদিন পরেই দেখতে পেলাম রাজ্জাক স্যার রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধসমূহ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছেন, বিশেষ বিশেষ জায়গায় লাল পেন্সিল দিয়ে চিহ্নিত করছেন। ছোটো ছোটো কাগজের টুকরো দিয়ে চিহ্নিত পৃষ্ঠাসমূহে নিশানা দিয়ে রাখছেন। আরও কিছুদিন পরে গিয়ে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের বই স্যারের টেবিল থেকে উধাও। বুঝতে বাকি রইলো না স্যারের মহৎ সঙ্কল্পগুলোর এভাবেই ইতি ঘটে থাকে। প্রথম দিকে রাজ্জাক স্যারের রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল না। শেষের দিকে দেখলাম তিনি রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো গানের তারিফ করেছেন। বিশেষ করে ধ্রুপদাঙ্গের গানগুলো।
০৯. চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান
এই রচনায় চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে রাজ্জাক স্যারের সম্পর্কের বিষয়টি আমি বিবৃত করতে চাই। আমার সঙ্গে আকস্মিকভাবে সুলতানের পরিচয় হয়। কী করে কোন পরিস্থিতিতে সুলতানের সঙ্গে আমার পরিচয় হল, সে বিষয়ে এখানে বিশেষ বলার অবকাশ নেই। শুধু এটুকু বলতে চাই, উনিশশো ছিয়াত্তর সালে শিল্পকলা একাডেমীতে সুলতানের আঁকা প্রায় পাঁচশো ছবির একটা প্রদর্শনী হয়। এই প্রদর্শনীতেই প্রথম আমি সুলতানের আঁকা ছবি দেখি এবং অভিভূত হয়ে যাই। পত্রপত্রিকায় সুলতানের বেশভুষা, বৈচিত্র্যময় জীবন, এবং গঞ্জিকাপ্রীতি এসব নিয়ে এন্তার গল্প কাহিনী প্রচারিত হলেও চিত্রশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা সুলতানের আঁকা ছবির উৎকর্ষ বা অপকর্ষ সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে কেউ রাজি ছিলেন না। নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলে একটা ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হয় যে ইংরেজিতে যাকে কনস্পিরেসি অভ সাইলেন্স বলা হয়, সুলতানকে ঘিরেও একটা নীরব ষড়যন্ত্র আর্ট এস্টাবলিশমেন্টের লোকেরা করে যাচ্ছিলেন। নীরব উপেক্ষার মাধ্যমে সুলতানের শিল্পকর্মকে সর্বসাধারণের সচেতন মনোযোগ থেকে আড়াল করে রাখাই ছিল এঁদের অভিপ্ৰায়।
