গল্পটা শেষ করার পর আমার দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসলেন এবং বললেন, আপনেরা ত এখন নানারকম ছবি দেখেন। জয়নুল আবেদীন ছবিতে যেভাবে স্পেসের ব্যবহার করেন, এরকম কাউরে করতে দেখছেন? পাল্কির ছবিটা দেখবেন, বেহারাগুলার মাঝখানে যে ফাঁক সেইটা ভালো কইর্যা তাকাইবেন। বেহারাদের পরস্পরের মধ্যে যে দূরত্ব সেইটা এইদিক ওইদিক একটু বেশিকম অইলেই কিন্তু ছবিটার আবেদন কইম্যা যায়।
সাহেব অধ্যাপকের কথা যখন উঠলো, আমি সাহস করে জিগ্গেস করলাম, স্যার, আপনার সঙ্গে কি করে ডিক উইলসন সাহেবের পরিচয় হলো? আপনি কি তাকে বিলেত থেকেই চিনতেন?
রাজ্জাক স্যার মাথা নাড়লেন, উনার সঙ্গে আমার ঢাকাতেই পরিচয়। তিনি ল-এর মানুষ। কথাবার্তা শুইন্যা মনে অইল বেশ লেহাপড়া জানে। জিগাইলাম, এইখানে আমাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করবার চান নিহি। উইলসন সায়েব কইলেন, আমি চাইলেই কি মাস্টারি করতে পারি? আমাকে চাকরি দেয় কে? আমি লগে লগে ভাইস চ্যান্সেলর মুয়াজ্জেম সায়েবের সঙ্গে দেখা কইর্যা কইলাম হিয়ার ইজ অ্যান আউটস্ট্যান্ডিং পারসন, তারে চাকরি দিলে ইউনিভার্সিটি উইল বি বেনিফিটেড। মোয়াজ্জেম সাব তার চাকুরি দিতে রাজি অইলেন। আমি কইলাম, আপনে অখনই দরখাস্ত করেন। দরখাস্ত করলেন। বাস চাকুরি অইয়া গেল। ছ’মাসের বেশি আছিলেন না। আমি উইলসন সাবরে এশিয়া অঞ্চলের প্রতি দৃষ্টি দেওনের জন্য ইনস্পায়ার করছিলাম। তিনি এই অঞ্চলে বিস্তর ঘোরাঘুরি করছেন। বইটা পড়লেই টের পাইবেন। স্যার বললেন, আরও একজন ইন্টারন্যাশনালি ফেমাস মানুষ আমাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন মাষ্টারি করেছিলেন, সেই ভদ্রলোক ইংরেজ নন, ফ্রেন্স।
আমি জানতে চাইলাম, স্যার আপনি নিশ্চয়ই তাঁর নাম মনে রেখেছেন?
স্যার তার দাড়ির গোছোটাতে হাত বুলিয়ে বললেন, নাম মনে থাকব না ক্যান? তাঁর নাম ক্লদ লেভি স্ট্রস।
একদিন সকালবেলা স্যার তাঁর ছোটোবেলার স্মৃতিচারণ করছিলেন, আমরা যখন ছোড়া আছিলাম, হেই সময়ে গাঁও গোরামে উচা লম্বা একধরনের শালপ্রাংশু চেহারার মানুষের দেখা পাওন যাইত, এখন পাঁচ গ্রাম বিচরাইলেও সেইরকম বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ পাওন যায় না। আমি জিগ্গেস করলাম, কারণ কী?
স্যার হুঁকোর নলটা ঠোঁটের কাছে ধরে কী একটা চিন্তা করলেন, তারপর বললেন, পুষ্টিকর খাবারের দুষ্প্রাপ্যতাই মানুষের স্বাস্থ্যহানির আসল কারণ। আগে গ্রামে অঢেল খাদ্যদ্রব্য পাওন যাইত। অখন যায় না। নদীনালা বিলে হাত দিলেই মাছ পাওন যাইত। এখন একরকম অদৃশ্য অইয়া গেছে। মাইনষে খাইব কী। আগের নদীও কি এখন আছে! পূর্বের দিনে ঢাহা শহর থেইক্যা আমাগো গ্রামে যাইতে অইলে তিন জাগায় নদী পার আওন লাগত। এইবার যাইয়া নদীর দেখাও পাইলাম না। বেবাক খটখট্যা শুকনা। নদী কই সাইর্যা গেছে। তারপর রাজ্জাক স্যার তাঁর ছেলেবেলার এক মধুর স্মৃতির কথা উল্লেখ করলেন। আমাগো ছোড়বেলায় বাড়ির পেছনে একটা লম্বা বরই গাছ আছিল। শীতকালে টিনের চালের থেইক্যা নিচে মাটিত টুপটুপ কইর্যা শিশিরের ফোটা ঝইর্যা পড়ত। সারারাত গাছ থেইক্যা পাকনা বরই পয়লা চালের ওপর, তারপর মাটিতে আইস্যা পড়ত। আমরা আধা ঘুমের মধ্যেও টের পাইতাম, বরই পড়তাছে।
আমি বললাম, বেঠোফেনের মুন লাইট সোনাটায় এইরকম ব্যাপার আছে। শুনলে মনে হবে আপনি টুপটাপ শিশির ঝরার শব্দ শুনছেন।
স্যার হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনে কি আবদুল করিম খান সাহেবের গান শুনছেন? আমি বললাম, একটা মাত্র লং প্লেয়িং রেকর্ড ঢাকায় পাওয়া যায়। সেটি শুনেছি।
স্যার আমার প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, করিম খান সাহেবের কণ্ঠে দানাদার মিছরির মতো একটা মিষ্টি স্বাদ আছে। অন্য কোনো গায়কের কণ্ঠে সেই জিনিস আপনে পাইবেন না। গান-বাজনার কথা যখন উঠলোই, আমি চাইছিলাম স্যার এ বিষয়ে আরও কিছু কথাবার্তা বলুন। তিনি বলে যেতে থাকলেন, মেগাফোন না হিজ মাস্টার্স ভয়েস মনে নাই, একসময়ে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের এক বা একাধিক বেহালার রেকর্ড বাইর করছিল। সেইসব জিনিস এখন আর পাওনা যায় না। আমি জানতে চাইলাম। আর কার কার গান বাজনা আপনার ভালো লাগে। স্যার একটু হাসলেন। আমাগো সময় আর আপনেগো সময়ের টেষ্ট এক না। অনেক কিছু পালটাইয়া গেছে। আমি গিরিজা দেবীর গান খুব পছন্দ করতাম, ফৈয়াজ খ্যা সায়েবের গান খুব ভালো লাগত।
স্যারের কাছ থেকে গীবনের ডে ক্লাইন অ্যান্ড ফল অব দ্যা রোমান এম্পায়ার বইটি আমি ধারা এনেছিলাম। শেষ করার পর বইটি যখন ফেরত দিতে গেলাম, দেখি স্যার বসে বসে জনসন সাহেবের লাইভস অব দ্যা ইংলিশ পোয়েটস বইটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। আমাকে দেখে বললেন, বিয়েন মৌলবি আহমদ ছফা। আমি জানতে চাইলাম, বইটা কি খুব ভালো?
স্যার বইটি বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওহ্ ভেরি ভেরি ম্যাচ ওয়েল রিটেন। জনসন সাহেব ভীষণ প্রিসাইজ। বাংলা ভাষায় এইরকম একখান বই লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত। আমি গীবনের বইটি ফেরত দিলে তিনি বললেন, ডেক্লাইন অ্যান্ড ফল অব দ্যা রোমান এম্পায়ার আপনে কি আগাগোড়া পড়ছেন?
আমি বললাম, স্যার একরকম পড়েছি।
স্যার বললেন, একটা জিনিস কি লক্ষ করছেন?
আমি বললাম, কোন জিনিসটা?
স্যার বললেন, গোড়ার দিকে রোমের যেসব মানুষ খ্রিস্টান অইছিল, তারা আছিল মোস্টলি প্লিবিয়ান অ্যান্ড পার্সিকিউটেড। একসময়ে তাগো সংখ্যা যখন বাইড়া গেল এম্পারার জাস্টিনিয়ান রাজ্যরক্ষার প্রয়োজনে নিজেই খ্রিস্টান আইয়া গেলেন। প্যালেস্টাইনের খ্রিস্টান ধৰ্ম আর রোমের খ্রিস্টান ধর্ম এক জিনিস নয়।
