রোমের প্যাট্রিসিয়ান খ্রিস্টান এবং প্লিবিয়ান খ্রিস্টানের মধ্যবর্তী সাইকোলজিক্যাল ডিসট্যান্স অনেকদিন পর্যন্ত টিইক্যা আছিল। এই জিনিস আপনে বেঙ্গলের মুসলমানদের মধ্যেও পাইবেন। আশরাফ মুসলমান এবং আতরাফ মুসলমানদের মধ্যে আপনে খুব অল্পই কমন জিনিস খুঁইজ্যা পাইবেন। তবে মুসলমানদের আশরাফ বইন্যা যাইতে বেশি সময় লাগে না। দুধ ঘি ঠিকমতো খাইলেই অ্যারিস্টোক্রেট বইন্যা যায়। যেমন গনি মিয়া মানে আবদুল গনির কথাই ধরেন—না! তার সম্পর্কে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট, —স্যার একজন সাহেবের নাম বললেন, যা আমি মনে রাখতে পারিনি) লেইখ্যা গেছেন গনি মিয়া খুব ভালা হাৰ্মনিয়াম বাজাইতে পারতেন। আর কিছু না। গনি মিয়ার বংশধরেরা ত নতুন অ্যারিস্টোক্রেট হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাইয়া গেছিল। এই গনি মিয়ারে জাতে তোলার লাইগ্যা মওলানা ওবায়দুল্লাহ অনেক কলকাঠি নাড়াইছেন। মওলানা ওবায়দুল্লাহই আছিলেন ঢাকা মাদ্রাসার শিক্ষক আর গনি মিয়ার চামচা। আবার এই ওবায়দুল্লাহই আছিলেন আপনেগো নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির … (দাদা না নানা কী বলেছিলেন আমার মনে নেই)। তারা আছিলেন মেদিনীপুরের মানুষ। সোহরাওয়ার্দি টাইটেলটা সেই সময়ে তারা কেউ ব্যবহার করতেন না।
এরই মধ্যে স্যার একবার উঠে বাথরুমে গেলেন। ফিরে এসে গামছা দিয়ে হাত-পা মুছলেন। হুঁকোতে টান দিয়ে আমাকে জিগ্গেস করলেন, কী যান কইতে আছিলাম?
আমি মনে করিয়ে দিলাম তিনি ঢাকার গণি মিয়ার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা বলছিলেন। স্যার বললেন, তার ত কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড আছিল না। ঢাকার অ্যারিস্টোক্রেটরা গনিমিয়ার পরিবারের লগে কোনোরকমের বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতেন না। সলিমুল্লাহ মামলায় ঠেকাইয়া এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়া করছিলেন। কিন্তু সলিমুল্লাহরে বেগম সাহেবের বেডরুমে যাওনের সময় পারমিশন লইয়া যাওন লাগত। যেনো নিষিদ্ধ বিষয়ে মন্তব্য করে ফেলেছেন সেজন্য তার চোখেমুখে একটা লজ্জার আভা দেখা গেল।
আমি আলোচনাটাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করার জন্য বললাম, স্যার, খোন্দকার ফজলে রাবি দ্যা ওরিজিন অভ দ্যা বেঙ্গলি মুসলমানসার নামে একটি বই লিখেছিলেন এবং সাম্প্রতিককালে বইটির একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। স্যার বললেন, খোন্দকার ফজলে রাব্বি আছিলেন মুর্শিদাবের নওয়াবগো দেওয়ান। একোনমিষ্ট রেহমান সোবহান আছেন না, তার নানা। তথ্যটা আমার জানা ছিল না। আমি স্যারকে সোজাসুজি প্রশ্ন করলাম, খোন্দকার সাহেব লিখেছেন বেঙ্গলের মুসলমানদের বেশিরভাগই বহিরাগত মুসলমানদের বংশধর। একথা কী করে সত্যি হতে পারে? দেখলাম, ও বিষয়ে স্যারের আলোচনা করার বিশেষ আগ্রহ নেই। স্যার সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়ের শুরু করলেন। সংস্কৃতির আরবি প্রতিশব্দ তমদ্দুন। তমদ্দুন শব্দটি এসেছে মদিনা থেকে।
মদিনা শব্দের অর্থ আইল গিয়া শহর। ইসলামের লগে শহরের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে।
আমি স্যারের মতামতটাকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। তাই বললাম, এ বিষয়ে আমি বিশেষ জানি না। তথাপি আমার মনে হয় বেঙ্গলের ক্ষেত্রে একথা বোধ করি সত্যি নয়। বেঙ্গলের গ্রামেই মুসলমানের সংখ্যা বেশি।
স্যার বললেন, সেকথা ঠিক, কিন্তু সূচনাটি অইছিল শহরে, গৌড়, পাণ্ডুয়া, সোনার গাঁ, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ এর সবকটাই আছিল সীট অব পলিটিক্যাল পাওয়ার।
খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর রোমের প্লিবিয়ান এবং পেট্রিসিয়ানদের নতুন একটা বিভাজন-রেখার সৃষ্টি হয়েছিল। এই ধরনের একটা প্রায় অলঙ্ঘনীয় বিভাজন-রেখা বেঙ্গলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্রিয়াশীল রয়েছে। স্যারের এই কথার মধ্যে আমি একটা গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পেয়ে যাই। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সেই সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট। আবুল ফজল ছিলেন জিয়া সাহেবের শিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন এবং তাকে আমরা মান্য করতাম। একদিন সকালবেলা দেখতে পেলাম আবুল ফজল সাহেব মাথায় টুপি দিয়ে অপর এক উপদেষ্টা এম এ জি তাওয়াবের সঙ্গে রমনা ময়দানের ওপর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানালেন, তাওয়াব সাহেবের সঙ্গে সিরাতের মজলিসে যাবেন। আমি ভীষণ একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেব নাস্তিকতা প্রচার করতেন। ক্ষমতার কাছাকাছি এসে দেখছি তিনিও নবীভক্ত হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনাটি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। রাজ্জাক স্যার রোমের প্লিবিয়ান খ্রিস্টানদের মনন মানসিকতার বিষয়ে যে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমার মনে হল, সেই দোলাচল মনোবৃত্তিটা বাঙালি মুসলমানের মনেও কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম রচিত পুঁথিসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বাঙালি মুসলমানের চৈতন্যের একটি দিক আমি উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার রচনাটির শিরোনাম ছিল ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। লেখাটি মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই একটা তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আমি বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগকেই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বংশধর বলে মস্ত অপরাধ করেছি, এ অভিযোগ করে নানা পত্রপত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপা হতে থাকে। আমাদের দেশে এক শীর্ষস্থানীয় কবি ছদ্মনামে তিনটি প্রবন্ধ আমাকে গালাগাল করে লেখেন। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে পুরো ছয় মাস ধরে গালমন্দ করে নিবন্ধ লিখতে থাকেন। পরে ওই নিবন্ধগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে সর্বত্র বিলি করতে আরম্ভ করেন। শুক্রবারে জুমার নামাজের পর সমবেত মুসল্লিদের মধ্যে তার পুস্তিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করে জনমতকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। আজাদ সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও তার পুস্তিকাটি বিতরণ করেছিলেন। রাজ্জাক স্যারের হাতেও একটা কপি এসেছিল। আমার লেখাটিও স্যারকে দিয়েছিলাম। আমার লেখাটি সম্পর্কে স্যারের মতামত জানার চেষ্টা করিনি। আমার ধারণা ছিল কোনো একটা সময়ে স্যার তার নিজের মতামত আমাকে জানাবেন। সারাদেশে তুমুল বিতর্ক চলছে। বেশিরভাগ মানুষ আমাকে সমর্থন করছেন। যারা বিরোধিতা করছেন, তাদের সংখ্যাও অল্প নয়। সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার হল, এই লেখাটিকে উপলক্ষ করে যে-কেউ একটা সামাজিক উত্তেজনা জাগিয়ে তুলতে পারে, আর সেরকম মানুষের সংখ্যা অল্প নয়।
