আসল ঘটনাটি এরকম। রাজ্জাক স্যার আওয়াজ করে মশা মারছিল, এবং খুব কাশছিলেন। কাশির শব্দ শুনে বেগম সাহেবার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি কাজী সাহেবকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, নিচে কে একটা কাশছে, দেখে এসো। কাজী সাহেব বললেন, দেখে আসার দরকার নেই। ওটা আবদুর রাজ্জাক। দাবা খেলতে এসে আটকা পড়ে গেছে। পাঁচটার পর কারফিউ। যেতে পারেনি। বেগম সাহেব জানতে চাইলেন, একটা মানুষ নিচে রেখে এসেছেন, তার ভাতপানি কিছুর দরকার আছে একথা আপনার মনে ছিলো না। কাজী সাহেব জানালেন, না, সে কথা আমার বিলকুল মনে আসেনি। বেগম সাহেব চটে গিয়ে বললেন, যান এখুনি উপরে ডেকে নিয়ে আসেন। বেগম সাহেবের ধাতানি খেয়ে রাজ্জাক সাহেবকে ওপরে ডাকতে এসেছেন।
মাঝখানে স্যার একবার সপরিবারে ভারতে গিয়েছিলেন। আমি যখন শুনলাম তারা কাশীর যাবেন, হঠাৎ ইচ্ছা জাগলো স্যারকে আমার জন্য একটা শাল আনতে বলি। বললামও। স্যার বললেন, আর কোনো জিনিস আপনের দরকার নিহি? আমি বললাম, যদি আপনি বইয়ের দোকানে যাওয়ার সুযোগ পান ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের একটা নির্ভরযোগ্য ইতিহাস আনবেন আমার জন্য। আমি ধরে নিয়েছিলাম স্যার ভুলে যাবেন। প্রায় আড়াই সপ্তাহ পরে ক্লাবের সামনে স্যারের সঙ্গে দেখা। স্যার ফিরে এসেছেন। আমি কোনো সংবাদ পাইনি। আমি অবাক হয়ে বললাম, স্যার কখন ফিরলেন?
বললেন, আজ বেয়ানের ফ্লাইটে। মৌলবি আহমদ ছফা আপনে কেমন ছিলেন?
আমি বললাম, ভালো স্যার।
কাইল বেয়ানে আপনে একবার আয়েন।
পরদিন সকালবেলা আমি স্যারের কাছে গেলাম। স্যার বললেন, চলেন নাস্তা খাই। নাস্তা খাওয়ার পর স্যার আমার হাতে সত্যি সত্যি ঘিয়ে রঙের একটা কাশ্মিরী শাল তুলে দিলেন। আমি কী যে খুশি হয়েছিলাম! আমি স্যারকে দেখাবার জন্য চাদরটা গাটে জড়িয়ে নিচ্চিলাম, নিচের সিঁড়িতে দুজন শিক্ষকের গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। স্যার তাদের কণ্ঠস্বর শুনেই বললেন, চাদরটা ওইদিকে থুইয়া দ্যান। আমি স্যারের কথা বুঝতে পারিনি। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে আমার গা থেকে চাদরটা টেনে নিয়ে বিছানার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। স্যারের এই আচরণে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার বেয়াদবিটা কোথায় হয়েছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছিলো একদৌড়ে পালিয়ে আসি। স্যার বোধহয় আমার মনোভাবটা বুঝে ফেললেন, মৌলবি আহমদ ছফা যায়েন না, আপনের লগে একটু কথা আছে।
স্যার এই দুই শিক্ষক ভদ্রলোকের সঙ্গে পূর্ণিমাচাদের গল্প করতে আরম্ভ করলেন। কথা আর ফুরোয় না। আমি বসে বসে উসখুস করছিলাম। অবশেষে তারা বিদায় হলেন। স্যার বিছানা থেকে শালখানা কুড়িয়ে নিয়ে আমার কাধের ওপর রেখে দিয়ে বললেন, কিছু জিনিস কাউরে অন্য মাইনষের সামনে দিলে মনে কষ্ট পাইতে পারে। তারপর তিনি কলকাতা থেকে আনা বইয়ের পুঁটুলিটা খুলে আমার হাতে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য না বসু (মনে নেই, পদবিটা কী) লিখিত দ্যা হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক বইটি আমার হাতে দিলেন। আমার ভাবতে খুবই আফসোস হয়, স্যারের দেয়া দুটি উপহারের কোনোটাই আমি সংরক্ষণ করতে পারিনি। একবার খাটের ওপর অ্যাশট্রেতে জ্বলন্ত সিগারেট রেখে আমি ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের বাইরে গিয়েছিলাম। পাখাটি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। রাত বারোটার সময় বাইরে থেকে এসে দেখি ঘর ধোঁয়ায় ভরে গেছে। ফ্যানের বাতাসে অ্যাশট্রে থেকে সিগারেটের আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। চাদরটাও গেছে। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের হিস্ট্রিটা এক ভদ্রলোককে ধার দিয়েছিলাম। বইটা ফেরত আনা যাতে অসম্ভব হয় সেজন্য ভদ্রলোক কায়দা করে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলেন।
কয়েকদিন পরে সকালবেলা স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি পরিবারের সকলে নাস্তার টেবিলে এসে বসেছেন। সকলে ঈষৎ উত্তেজিত। লক্ষ করলাম সেটা স্যারকেও একটুখানি স্পর্শ করেছে। গতোরাতে শিল্পী কামরুল হাসান টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শিল্পী জয়নুল আবেদীনের বিষয়ে কী একটা মন্তব্য করেছেন, যা স্যারের পরিবারের প্রায় সকলের কাছেই নিষ্ঠুর বলে মনে হয়েছে। এ নিয়ে সকলে কথা-বলাবলি করছিলেন। স্যার কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেন। নাস্তা খাওয়ার পর স্যার যখন তার ঘরে এলেন, আমি জিগ্গেস করলাম, স্যার, আপনি কি মনে করেন জয়নুল আবেদীন খুব বড় শিল্পী?
তিনি সরাসরি আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটি গল্পের অবতারণা করলেন। একসময়ে এক ইংরেজ ভদ্রলোক, পেশায় যিনি বিলেতের কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষ উপলক্ষে ঢাকা এসেছিলেন। স্যার বললেন, সেই সায়েবরে আমি ঢাকা শহর ঘুরাইয়া দেখাইতে আছিলাম। শহর দেখানোর কাজ যখন শেষ, আমি কইলাম, চলেন আপনেরে একজন শিল্পীর কাছে লইয়া যাই। উনি কইলেন, আই উড লাভ টু। তারপর সায়েবরে লইয়া শান্তিনগরে আবেদীন সাহেবের বাড়ি গেলাম। আবেদীন সাহেব হবায় দুইখানা ওয়াটার কালার আঁইক্যা শেষ করছেন। এই ওয়াটার কালার দেইখ্যা ত সাহেবের চক্ষু ছানাবড়া। আমার কানের কাছে মুখ আইন্যা কইলেন, এই ছবিগুলার দাম কত অইব আপনে ধারণা করতে পারেন? আমি জিগাইলাম, আপনি কি ছবি কিনবার চান? সায়েব কইল, আমি একজন গরিব মাস্টার। এইরকম অপূর্ব ছবি কিনার টাহা আমি কই পামু? তারপর আমি আবেদীনের লগে কথা কইলাম। তিনি একেকটা ছবির জন্য মাত্র তিনশ টাহা দাম চাইলেন। লগে লগে মানিব্যাগ খুইল্যা ছয়শ টাহা দিলেন সায়েব। ছবি দুইটা যখন বগলের তলায় লইয়া ফির্যা আইবার লাগছিল, তারে খুব খুশি দেখাইতে আছিল। আমারে কইল এক তাল সোনা কুড়াইয়া পাইলেও আমি এত খুশি আইতাম না।
