একদিন বিকেলবেলা রাজ্জাক স্যারের কাছে গিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করলাম। বললাম, স্যার, বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থান কোথায়? এটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ একথা কি সত্যি?
স্যার বললেন, আপনে একটু বয়েন। তিনি বাথরুমে গেলেন। এসে গামছা দিয়ে দুপায়ের পানি মুছে যুত হয়ে বসলেন। একটা চুরুট ধরিয়ে খকখক করে কাশলেন। তারপর বললেন, ইন দ্যা স্ট্রিকটেষ্ট সেন্স অভ দ্যা টার্ম ইন্ডিয়াতে কোনো ফিউডালিজম আছিল না। বেঙ্গলের কথা ত এক্কেরে আলাদা। বেঙ্গলের কথায় পরে আইতাছি। তার আগে রেষ্ট অভ দি ইন্ডিয়ার খবর লই। ফিউডালিজম অইল একটা ক্লোজড সিস্টেম। বংশপরম্পরা একটা পরিবার স্থায়ী অইয়া একটা জায়গায় বাস করব। তার ধোপা, নাপিত, কামার, কুমার সব আলাদা। এক জায়গার মানুষ অন্য জায়গায় যাইবার পারব না। কাঁঠালের যেমন কোয়া ফিউডাল সিস্টেমে সামন্তের জমির সঙ্গে সকলের তেমন সম্পর্ক। সামান্তরা অইল নিজের জমিদারিতে সমস্ত দণ্ডমুণ্ডের মালিক। রাজসভায়
পারলে এক্কোরে সাত খুন মাফ। ইন্ডিয়াতে মোগল আমলের কথা ধরেন, জমিদারি এখানে বংশানুক্রমিক আছিল না। সম্রাট ইচ্ছা করলে জমিদারের পোলারে জমিদার নাও বানাইতে পারতেন। আর যদি বেঙ্গলের কথায় আইয়েন, তাইলে এক্কেরে অন্য কথা বলতে অয়। পুরানা বাংলা পুঁথিতে দেখা যায় বাংলার বাণিজ্যবহর জাভা সুমাত্রা এইসকল অঞ্চলে যাওয়া-আসা করছে। যেখানে বাণিজ্য এইরকম সচল থাকে। সেই সমাজটারে অন্য যা ইচ্ছা কাইবার চান কন, কিন্তু ফিউডালিজম বলবার পারবেন না। ভিটফোগোলের হাইড্রোলিক থিয়োরি বেঙ্গলের বেলায় এক্কেরে খাটে না।
আমি বললাম, তা হলে বেঙ্গলের সমাজের নেচারটা কী?
স্যার বললেন, যা ইচ্ছা কন, কিন্তু ফিউডালিজম কেইবার পারবেন না। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রোভিন্সে যেটুকু ফিউডালিজমের চিহ্ন খুঁইজ্যা পাওন যায়, বেঙ্গলে তার ছিটাফোটাও পাইবেন না। গ্রামগুলার ফরমেশন দেখলেই বুঝতে পারবেন। এইখান থেইক্যা বিহারে যান, দেখবেন সীন এক্কোরে পালটাইয়া গেছে। ফিউড়ালের অবস্থানের চাইর পাশে গোটা গ্রামবাসীর বসবাস। বেঙ্গলে সেইসব আপনে পাইবেন না। আপনে কি মনসামঙ্গলের চাদ সওদাগরের কাহিনী পড়ছেন?
আমি বললাম, একসময় বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, সেই সুবাদে বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়েছে।
তা অইলে চাদ সওদাগরের কাহিনী আপনের জানা। বেবাক বাংলা সাহিত্যে এইরকম শিরদাঁড়ার মানুষ একটাও দেখছেন? আমি বললাম, না, চাদ সওদাগরের মতো শক্তিশালী চরিত্র বাংলা সাহিত্যে একেবারে বিরল। মাইকেলের মেঘনাদকেও চাদ সওদাগরের পাশে স্নান দেখায়।
স্যার বললেন, চাঁদ সওদাগর চরিত্রের এই যে ঋজুতা এইডা আইল সমুদ্র-বাণিজ্যশক্তির প্রতীক।
আমি আমার মূল প্রশ্নে ফিরে গেলাম, উনারা যে বলছেন, পূর্ববাংল আধা-সামন্তবাদী আধা-উপনিবেশবাদী।
স্যার ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, ওরা যদি গায়ের জোরে কইবার চায় আপনে কী করবেন, মারামারি করবেন নিহি?
কিছুদিন পর এক সকালে গিয়ে দেখি নিয়াজ মোর্শেদ বসে আছে। তার সঙ্গে স্যার ড. কাজী মোতাহের হোসেনের গল্প বলছেন। কাজী কোথায় গিয়ে কী কারণে জানি আটকা পড়ে গিয়েছিলেন, দেশে ফেরার পথে তিনি ক্লাবে এসে রাজ্জাক স্যারের খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু নামটা ভুলে গেছেন। স্যার ঘটনাটা এইভাবে বললেন, আপনেরা ছেলেটারে দেখছেননি? সকলে জানতে চাইলেন, স্যার, আপনি কোন ছেলেটার খোঁজ করছেন? মোতাহের সাহেব বললেন, সেই ছেলেটা কী যেন নাম। নাকি দাড়িটাড়ি রাইখ্যা বেশ কাপ্তেন আইছে। কে একজন বললেন, স্যার, আপনি কি রাজ্জাক সাহেবের কথা বলছেন? হ্যা হ্যাঁ, তার নাম আবদুর রাজ্জাক। এতক্ষণে মনে পড়ছে। একথা বলে স্যার খুব করে হাসলেন। তারপর রাজ্জাক স্যার কাজী মোতাহের হোসেন সাহেবের আরেকটা গল্প বললেন। রাজ্জাক স্যার তখন ছাত্র। মোতাহের হোসেন সাহেব স্ট্যাটিসটিকস ডিপার্টমেন্টে ডেমোনেস্ট্রেটর না লেকচারার। তিনি দাবাখেলার পার্টনার খুঁজে বেড়াতেন। সবসময় কিন্তু পার্টনার পাওয়া যাইত না। বাধ্য অইয়া কাজী সাহেবকে কলতাবাজার যাইতে অইত। কশাইগো মধ্যে দুয়েক জন ভালো প্লেয়ার আছিল। কাজী সাহেব তাগো লগে বইয়া যাইতেন। একবার খেলতে বাইলে দিন রাইতের খবর থাকত না। একবার অইল কী, আমি উনার ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিতে গেলাম। উনি ফ্রি আছেন কি না দেখতে। দেখলাম তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে ছাত্রদের অংক বুঝাইতেছেন, আমারে দেহামাত্রই বাইরে আইস্যা মৃদুস্বরে কইলেন, তুমি একটু পরে আইয়ো। এই ক্লাসটার পরে তোমার সঙ্গে বসা যাইব। কিছুক্ষণ পর আমি যখন গেলাম ততক্ষণে ক্লাস শেষ অইয়া গেছে। তিনি সাইকেলসহ আমারে সঙ্গে কইরা সেগুনবাগিচার বাড়িতে গেলেন। সাইকেলটা হেলাইয়া রাইখ্যা দাবার বোর্ড লইয়া বাইলেন। দুই দান খেলা শেষ অইছে। আমি কইলাম, বেলা পাঁচটার পরে আমার চাইল্যা যাওন লাগব। পাঁচটার পর কারফিউ। তখন ওআর টাইম। কাজী সাহেব কইলেন যখন যাইবা তখন ত যাইবা। অখন বোর্ড সাজাও। বাধ্য আইয়া খেলতে লাগলাম। রাইত নটার সময় খেলা শেষ কইর্যা কইলেন, এখন তুমি কেমনে যাইবা? আমি কইলাম, কারফিউর মধ্যে আমি কেমনে যামু? উনি কইলেন, হেইডা একটা কথা। তুমি এখন কী করবা, এইহানে শুইয়া থাকতে পারবা? লজ্জায় কইলাম, ঠিক আছে শুইয়া থাকুমনে। কাজী সাহেব তা উপরে উইঠা গেলেন। আমি ঘুমাইতে চেষ্টা করলাম। কিছুতেই ঘুম আসে না। একে ত পেটে দানাপানি কিছু পড়ে নাই, তারপর এত বড় বড় বাদুরের মতো মশা। সারা শরীর এক্কেরে রক্তাক্ত কইর্যা ফেলাইছে। এর মধ্যেও চোখ বন্ধ কইর্যা পইড়া রাইছি। আধা রাইত পরে উপর থেইক্যা নাইম্যা কাজী সাহেব আমারে ডাকতে আরম্ভ করল, আবদুর রাজ্জাক, এ্যাই আবদুর রাজ্জাক, তুমি ঘুমাইয়া পড়ছ নিহি। আমি উইঠা কইলাম, না স্যার, আমি জগন্নাই আছি। তোমার একটু উপরে আওন লাগে। আমি অবাক অইয়া কইলাম, কেন স্যার? তোমারে উপরে ডাকতে আছে।
