পরের দিন সকালবেলা যাকে বলে রক্তবেগতরঙ্গিত বক্ষে স্যারের ওখানে হাজির হলাম। স্যার সদ্য ঘুম থেকে উঠে টেবিলের ওপর চরণযুগল উঠিয়ে দিয়ে গুড় ক গুড় ক হুঁকো টানছেন। স্যার বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা এত বেয়ানাবেলা চইল্যা অইলেন?
আমি জবাব দিলাম, হা স্যার চাইল্যা আইলাম, কারণ টয়েনবি সাহেবের বইটা পড়লাম।
কী মনে অইল? স্যারের প্রশ্ন।
আমি বললাম, এতকাল তো আমি এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। একটা ভাসাভাসা ধারণা ছিলো মাত্র।
স্যার বললেন, পড়বেন স্যেন, তারপরে তা জানবেন। এই বিষয়ে আপনি আরও কিছু জানতে চান নিহি?
আমি বললাম, আপনার কাছে আর কোনো বই আছে?
স্যার বললেন, আমি মেনটোর বইটা দিবার পারি।
তিনি শেলফ থেকে বের করে বইটি দিলেন এবং বললেন, তাড়াহুড়া কইরেন না। কী পড়ছেন, হেইডা পরিষ্কারভাবে বুঝবার চেষ্টা করবেন।
আমার খুব খারাপ লাগছে, বইটির টাইটেল ভুলে গিয়েছি। তিন-চারদিন বাদে বইটি যখন ফেরত দিতে গোলাম, স্যার শেলফ থেকে ফ্যাকটরস ইন মডার্ন হিস্ট্রি শিরোনামে একটি বই আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এইডা দেখবার পারেন। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলুশনের বিষয়টা বিশদভাবে এই বইতে আলোচনা করা আইছে।
লেখকের নামটিও আমি মনে করতে পারছি না। অজানা বিষয়ে জানার যে একটা আনন্দ আছে, সেই জিনিসটা তখন আমাকে পেয়ে বসেছে। একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, ইংরেজ না আমেরিকান বলতে পারবো না পি. এন. হেক্সটার নামে ভদ্রলোক সাম্প্রতিককালে ওই একই শিরোনামে ফ্যাক্টরস ইন মডার্ন হিষ্টি নামে একটা বই লিখেছেন। এই বইটা যখন ফেরত দিলাম, স্যারের মধ্যে একটা সিরিয়াস মনোভাব লক্ষ করলাম। তিনি অধিকতর যত্নসহকারে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ অর্থনীতির নানা পৰ্যায় সম্পর্কে আমার আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে আরম্ভ করলেন, তিনি বললেন, একোনমিকস্ সায়েন্সের প্রতি আপনের আগ্রহটা জাগছে এইডা ভালা লক্ষণ। আপনেগো সাহিত্যের লোকেরা বেশিরভাগ যেইসব কথা লেখে তার মধ্যে ছানা জিনিস বিশেষ থাকে না। স্যার ইকোনমিকস শব্দটাকে সবসময় একোনমিকস্ উচ্চারণ করে থাকেন। তিনি শেলফ থেকে ধুলো ঝেড়ে অ্যাডাম স্মিথের দ্যা ওয়েলথ অভ ন্যাশনস বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এইডা একটু নাড়াচাড়া কইর্যা দেখেন। কাণ্ডজ্ঞানটা পোক্ত আইব।
অজানা একটা জিনিসকে জানার প্রচণ্ড একটা উত্তেজনা আছে। আমি অ্যাডাম স্মিথ পড়তে শুরু করলাম। স্কুলে থাকার সময়ে যেরকম তন্ময় হয়ে গোয়েন্দাগল্প পাঠ করতাম, অনেকটা সেই আবেগ নিয়ে অর্থনীতির বইগুলো পাঠ করছিলাম। এই বিদ্যা আমার কোনো কাজে আসবে কি না সে চিন্তা আমার মনে একবারও উদয় হয়নি। অ্যাডাম স্মিথ যখন ফেরত দিলাম, স্যার কাধে হাত দিয়ে বললেন, আপনেরা ত মার্কস নিয়া খুব মাতামাতি করেন, কিন্তু মার্কস যার কাছে অধিক ঋণী হেই রিকার্ডোর সম্পর্কে কিছু জানলে মন্দ অয় না। তিনি তো আমাকে রিকোর্ডার বই দিলেন, কিন্তু রেন্ট ইত্যাদি তত্ত্ব পড়তে গিয়ে আমার জান যাওয়ার যোগাড়। এখনও মনে হয় না রিকার্ডে সাহেবের খটমটে তত্ত্ব আমি বুঝতে পেরেছি। অথচ মার্কস সাহেবের ক্যাপিটাল প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ড সে তুলনায় আমার কাছে অনেক সহজ মনে হয়েছে। মুশকিলের ব্যাপার হল, স্যার ধরে নিয়েছেন, আমি যা পড়ছি, ঠিকমতো বুঝতে পারছি।
তারপর তিনি ম্যাকসভেবরের ‘প্রোটেস্টান্ট এথিকস অ্যান্ড স্পিরিট অব দ্যা ক্যাপিটালিজম’ আমাকে দিলেন। ম্যাকসভেবরের বইটি আমার এত ভালো লেগে যায় যে নিজের উদ্যোগেই খোঁজখবর নিয়ে তার অন্যান্য রচনা সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে উঠি। ভেবরের রিলিজিয়ানস অব ইন্ডিয়া বইটি পাঠ করে আমি সবিশেষ উপকৃত হয়েছি।
একদিন স্যার আমাকে বললেন, সাহিত্যের পুরোনো স্ক্রিপট পর্যালোচনা করে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা করার ট্র্যাডিশন আমাদের বাংলা ভাষায় গড়ে ওঠেনি। এই ধরনের কিছু কাজ করার আমার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। স্যার তার শিক্ষক হ্যারন্ড লাস্কির লিবোরালিজম অ্যান্ড দ্য রাইজ অব ইউরোপিয়ান ক্যাপিটালিজম পড়তে দেন। বইটি যখন পড়ে ফেরত দিতে গেলাম, স্যার জিগ্গেস করলেন, বই ত পইড়া যাইতাছেন, নোট ফোট রাখবার লাইছেননি?
আমি বললাম, নোট রাখার বিশেষ অভ্যাস নেই। তার একটা কারণ মনে রাখার মতো কিছু চোখে পড়লে মনের ভেতর গোথে যায়। সে সময় আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিলো।
স্যার বললেন, নোট রাখার অভ্যাসটি করলে ভালা অইত। কথা প্রসঙ্গে ড. আনিসুজ্জামানের নাম উল্লেখ করলেন। আনিস যেমন পরিচ্ছন্ন গবেষণার কাম করে, সেরকম বেশি দেখা যায় না।
স্যার তখন একের পর এক বই তুলে দিচ্ছিলেন আর আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। তিনি কেনো আমাকে দিয়ে ওইসব ছাইপাশ পড়িয়ে নিচ্ছিলেন, আমি কেনো পড়ে যাচ্ছিলাম, তার কারণ আমি আজও খুঁজে বের করতে পারিনি। এইভাবে প্রায় সাত মাস চলে গেল। থিসিসের কাজ পড়ে আছে। সে সময়ে আমার মনোভাব ছিল এরকম, এতসব প্রয়োজনীয় বিষয় আমি জানতে পারছি, থিসিস লেখার কাজে নষ্ট করার সময় কই? স্যার আমাকে দিয়ে অনেক কিছু পড়িয়েছেন। কিন্তু পড়ে কী লাভ হয়েছে খতিয়ে দেখার সময় হয়নি। দৃশ্যত অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অধিক মনোসংযোগ করার কারণে আমি ভেতরে ভেতরে অনেকখানিই বদলে গিয়েছিলাম। তার ফল হয়েছে এই যে, সাহিত্য যারা করেন তাদের সঙ্গে পুরোপুরি মিশতে পারিনি এবং সমাজবিজ্ঞানীদের দলেও ভিড়তে পারিনি। সেই যে দুই পা দুই নৌকায় রাখতে অভ্যাস করিয়েছিলেন রাজ্জাক স্যার, অদ্যাবধি আমার পক্ষে এক করা সম্ভব হয়নি।
০৭. প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল হক
কিছুকাল আগে প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল হক ‘পূর্ববাংলা আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক? এই শিরোনামে একটি নাতিক্ষুদ্র পুস্তিকা লিখেছিলেন। পুরো ষাটের দশক, এমনকী সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পুস্তিকাটি বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের কিছুটা প্রভাবিত করেছিল। কমরেড আবদুল হক চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মাও সে তুং, চীনাসমাজের যে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটি দাড় করিয়েছিলেন সেই লাইন অনুসরণ করে এই ব্যাখ্যাটি দাড় করিয়েছিলেন। র্যাডিক্যাল অর্থনীতিবিদ বলে খ্যাত ড. আবু মাহমুদের মতো মানুষও আবদুল হকের ব্যাখ্যাটি সঠিক প্রমাণিত করে একাধিক রচনা প্রকাশ করেছেন। আমার কাছে এই ব্যাখ্যাগুলো হেঁয়ালির মতো মনে হচ্ছিলো। অন্যদিকে মানবেন্দ্রনাথ রায় ‘ইন্ডিয়া ইন টানজিশন’ গ্রন্থে যে পদ্ধতিতে ভারতীয় সমাজের ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছিলেন সেটা আমার কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু আমি সামান্য মানুষ। এই সমস্ত বিষয়ে কোনো মতামত প্ৰদান করা কিংবা মতামত সত্যি বলে মেনে নেয়া কোনোটাই সম্ভব ছিল না।
