কিসিঞ্জারের সম্মানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবর্ধনাসভার আয়োজন করা হয়েছিলো। হোটেল শেরাটনের নাম ছিল তখন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল। নিমন্ত্রিত অতিথির তালিকায় রাজাক স্যারের নামও ছিল। এখন ঠিক মনে আসছে না। অনুষ্ঠানটি কখন ছিল, সকালবেলা না বিকেলবেলা। সেদিন স্যারের বাড়িতে আমি ছিলাম। ড. রওনক জাহানও ছিলেন। আমার মনে নেই ড. রওনক জাহান স্যারকে কিসিঞ্জারের অনুষ্ঠানে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য গিয়েছিলেন কি না। হুঁকোর নলটি রেখে খদ্দরের চাদরটি কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে বললেন, একটু ঘুইর্যা আহি। ড. রওনক জাহান বললেন, ওমা, এই বেশে আপনি কোথায় চললেন?
স্যার বললেন, ওই যে লোকে কয় কিসিঞ্জার সাব আইছেন, একটু মোলাকাত কইর্যা আহি।
ড. রওনক জাহান বললেন, এই কাপড়ে আপনি সেখানে যাবেন?
রাজ্জাক স্যার ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধী বালকের মতো মুখ নিচু করে বললেন, আমার আর কোনো কাপড়াচোপড় নাইক্যা।
আমি বললাম, সেদিন তো স্যার আপনাকে একটা সিল্কের সুন্দর পাঞ্জাবি দিলাম, কোথায় রাখছেন?
স্যার বললেন, দিছিলেন তা ঠিকই, অখন কই রাখছি মনে পড়ে না। আমরা সকলে মিলে ঘরের আনাচে কানাচে খুঁজতে লাগলাম। একসময় পাঞ্জাবির সন্ধান পাওয়া গেল। তিনি মুড়ির টিনের মধ্যে সুখে নিদ্রা দিচ্ছিলেন।
কিছুদিন পরে ডিক উইলসন সাহেবের লেখা বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থ ‘এশিয়া অ্যাওয়েকস’ প্ৰকাশিত হল। উইলসন সাহেব তার গ্রন্থের উৎসর্গের বাক্যটা এভাবে লিখেছেন, ‘টু আবদুর রাজ্জাক অব ঢাকা, হু ব্রট ইস্ট ইন মাই মাইন্ড’। আজিজুল হক মন্তব্য করলেন, ডিক উইলসন সাহেবের গ্রন্থটি মানের দিক দিয়ে গুনার মিরডালের এশিয়ান ড্রামার কাছাকাছি। ‘এশিয়ান ড্রামা’র জন্য গুনার মির ডালকে পরে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিলো। তখনও আমি ‘এশিয়ান ড্রামা’ পড়িনি। কিছুদিনের মধ্যেই ‘এশিয়ান ড্রামা’ এবং ‘এশিয়া অ্যাওয়েকস’ দুটো বই পাশাপাশি পড়ার সুযোগ হলো।
ডিক উইলসনের উৎসর্গবাক্যটি পাঠ করেই আমার দৃষ্টি থেকে একটা পর্দা সরে গেলো। ডিক উইলসনের মতো একজন বিশ্বনন্দিত স্কলারকে যিনি প্রভাবিত করতে পারেন, তার মেধা এবং মনীষা কতদূর প্রসারিত হতে পারে, ধারণা করার ক্ষমতাও তার চারপাশে যে-সমস্ত মানুষ ঘুরে বেড়ান, যাঁরা তার চাটুকারিতা করেন, কিংবা নিন্দা করেন তাদের নেই। তার পর থেকে রাজ্জাক স্যারকে আমি পাটক্ষেতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বটবৃক্ষের মতো দেখে আসছি। তার সামনে গেলে সবসময়েই আমার মনে হতো আমি বিশাল কিছু, গভীর কিছুর সন্নিধানে উপনীত হয়েছি।
রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে একটা বিষয়ে শিল্পী জয়নুল আবেদীন সাহেবের চমৎকার মিল লক্ষ করেছি। আবেদীন সাহেব প্রকৃত কাজের মানুষদের চিনতে পারতেন। রায়ের বাজারের মৃৎশিল্পীদের পল্লী থেকে আবেদীন সাহেব মরণচাঁদকে আবিষ্কার করেছিলেন। মরণচাঁদের দক্ষতা এবং সততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আর্ট কলেজে একটা চাকুরি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। উত্তরকালে মরণাচাঁদের একজন ভাস্কর হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ঋজুতা এবং চারিত্রিক স্বচ্ছতার দিকটি বিচার করে আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে মোস্তফাকে নিয়োগ করেছিলেন। আবেদীন সাহেবের পছন্দের মানুষ দুটি রাজ্জাক সাহেবেরও বিশেষ প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন। আর মোস্তফা রাজ্জাক স্যারের অনুগৃহীতদের মধ্যে বিশেষ একজন হয়ে গিয়েছিলেন।
০৬. একা একা দাবা খেলছেন
একদিন সকালবেলা স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি, তিনি একা একা দাবা খেলছেন। আমাকে দেখামাত্রই জিগ্গেস করলেন, মৌলবি আহমদ ছফা কী খবর?
পাছে স্যার অন্য প্রসঙ্গ তুলে প্রয়োজনটা ভুলিয়ে দেন। সেই আশঙ্কা করে আগেভাগে আমার আরজিটা পেশ করে বসলাম। বললাম, স্যার, দরিয়ায় ঘিইর্যা গেছি, উদ্ধার পাইবার পথ বাতিলাইয়া দেন। স্যারের সঙ্গে কথা বলে বলে এক আধটু ঢাকাইয়া বুলি ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছি।
স্যার বললেন, কোনো খারাপ খবর নিহি?
আমি জবাবে বললাম, তেমন খারাপ খবর নয়।
স্যার বললেন, তয় কন অইছেডা কী।
আমি কথাটা এইভাবে শুরু করলাম। ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের ধাক্কা বেঙ্গলেও এসে লেগেছিল। এই বিষয়ের ওপর আমাকে আলোকপাত করে অন্তত দশপাতা লিখতে হবে। কিন্তু তার আগে শিল্পবিপ্লব জিনিসটা কী জানতে চাই। অল্পের মধ্যে ধারণা নিতে পারি, এমন একটা বইয়ের কথা বলেন।
স্যার বললেন, টয়েনবির লেখা ষাট-সত্তর পৃষ্ঠার বই আছে। পইড়া দেখবার পারেন। টাইটেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলুশন।
আমি বললাম, ইনি কি ঐতিহাসিক টয়েনবি।
স্যার বললেন, না, তার চাচা। ভদ্রলোক এক্কেরে তরুণ বয়সে মারা গিয়েছিলেন। বড় জোর তিরিশ একতিরিশ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলুশন টার্মটা তিনিই কয়েন করেছিলেন। তিনি নিজে লেখাটি লিখে যাননি। তার লিখিত নোটস পর্যালোচনা করে বন্ধুবান্ধবেরা বইটি তৈরি করেছিলেন। নতুন এডিশনে জুনিয়র টয়েনবি মানে ঐতিহাসিক টয়েনবি একটা ছোটো অথচ চমৎকার ভূমিকা লিখেছেন।
আমি লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটা ইস্যু করে আনলাম। সিনিয়র টয়েনবির যুক্তির ধারা এবং চিন্তার স্বচ্ছতা আমাকে একেবারে মুগ্ধ করে ফেললো। ইংল্যান্ডে কোন আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তার আগে কৃষিতে কী পরিবর্তন ঘটেছিল টয়েনবি সাহেব তার পেছনের কারণগুলো প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। টয়েনবির বইটা পাঠ করার পর আমার মনে হলো গতকালের আমি-র সঙ্গে আজকের আমি-র অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। একেকটা বইয়ের চিন্তা-চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করার কী অপরিসীম ক্ষমতা! ফেডারিক এঙ্গেলস-এর কনডিশন অব দ্যা ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড পাঠ করার পরেও আমার মনে এমন একটা ভাবান্তর জন্ম নিয়েছিলো।
