রাজ্জার স্যার ব্যক্তিগতভাবে অঙ্কের শিক্ষক রমজান আলী সরকারকে পছন্দ করতেন এমন মনে হয়নি। কিন্তু তিনি তার খুব প্রশংসা করতেন। সরদারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্র যিনি অক্সফোর্ডে র্যাংলার হতে পেরেছিলেন। রাজ্জাক স্যার মনে করতেন সরদার যদি তার সাধনার প্রতি যত্নবান হতেন, পৃথিবীর শ্ৰেষ্ঠ অঙ্কবিদদের একজন হতে পারতেন। সলিমুল্লাহ খানের বয়স আমার চাইতে অন্তত পনেরো বছর কম। সে রাজ্জাক সাহেবকে নির্জলা বকাঝকা করে আস্ত একটা বই লিখে ফেলেছিলো। বইটি পড়ে শুধু আমি নই, রাজ্জার স্যারের ঘনিষ্ঠদের অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সলিমুল্লাহ খান পুস্তক রচনা করে বসে থাকেনি। এক কপি নিজের হাতে লিখে বাড়িতে গিয়ে উপহার দিয়ে এসেছিলো। সাহস করে স্যারের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করিনি। একবার সলিমুল্লাহর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো। দু’জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সার্টিফিকেট খুবই প্রয়োজন। তার মধ্যে একজন প্রফেসর রাজ্জাক, অন্যজন ড. কামাল হোসেন। সলিমুল্লাহ আমাকে বারবার অনুরোধ করতে লাগলো আমি যেনো তাকে স্যারের কাছে নিয়ে যাই। স্যারকে তো তাকে প্রশংসাপত্র দিতে হবে। অধিকন্তু ড. কামালের প্রশংসাপত্ৰও সংগ্রহ করে দিতে হবে। আমি বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সলিমুল্লাহ নাছোড়বান্দা। অগত্যা একদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে স্যারকে গিয়ে বললাম, কাল সকালে আপনার ওখানে নাস্তা করতে যাবো। স্যার বললেন, ঠিক আছে আয়েন। একথা বলে স্যার দাবাখেলায় মন দিলেন। আমি আবার স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, স্যার সলিমুল্লাহ খানও আমার সঙ্গে আসার বায়না ধরেছে। স্যার বললেন, ঠিক আছে লইয়া আয়েন।
স্যার তখন একা থাকতেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা গুলশানের বাড়িতে চলে গেছেন। সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে যথারীতি কথাবার্তা বললেন। কোন বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে চায়, ও নিয়েও আলাপ করলেন। চলে আসার সময় সলিমুল্লাহকে বললেন, ঠিক আছে দুইদিন বাদে আয়েন। কাইল আমি কামাল হোসেনের কাছে যামুনে। সেবার সলিমুল্লাহর ক্যামব্রিজ যাওয়া হয়নি। কিন্তু রাজ্জাক স্যার নিজে প্রশংসাপত্র লিখে দিয়েছিলেন এবং ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকেও প্রশংসাপত্র সংগ্রহ করে এনে দিয়েছিলেন।
কিছুদিন পর আমি স্যারের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম, সলিমুল্লাহর বইটি তিনি পড়েছেন কি না। স্যার বললেন, হ্যাঁ পড়ছি। তাতে কী অইছে। ছেলেটার তা ট্যালেন্ট আছে। কী লিখছে না- লিখছে হেইডা মনে কইর্যা কী লাভ। হের ত কিছু করার ক্ষমতা আছে। হামিদাও আমারে একই কথা কইল। আমি যখন কামালরে কইলাম দুই লাইন লেইখ্যা দাও, হামিদা কয় হেই ছেলেটা না যে আপনের ওপর বই লেখছে? হেরে আমি ঘরে ঢুকবার দিমু না। আমি কইলাম, হেইডা কি একটা কথা অইল, একটা প্রমিসিং ছেলে, এমন কয়জন পাওন যায়, দাও দুই কলম লেইখ্যা। সলিমুল্লাহ খান যখন আমেরিকা গেলো, প্লেনভাড়ার টাকার এক অংশ রাজ্জাক স্যার দিয়েছিলেন। এখনও সলিমুল্লাহর খবরাখবর জানতে চান।
রাজ্জাক সাহেবকে একেবারে বৈষ্ণব মনে করাও ঠিক হবে না। কারও ওপর যদি তার মনে উঠে যায়, ফেরানো প্রায় একরকম অসম্ভব। আমি কোনো কারণে গত বিশ পঁচিশ বছর ধরে রাজ্জাক স্যারের স্নেহ পেয়ে আসছি, সেটা আমার নিজের কাছে একটা বিস্ময়ের ব্যাপার মনে হয়। আমি রাজ্জাক স্যারের কোনো কথা শুনিনি। তিনি যা বলেছেন, উলটো কাজ করেছি। পরিচিত হওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই তার সামনে সিগারেট খেতে আরম্ভ করেছি। আমি সে সময়ে বাঁশি বাজাতে চেষ্টা করছিলাম। এমন কিছু বাজাতে শিখিনি, তবু শুধু তাকে নয়, তার পরিবারের প্রায় সবাইকে আমার সে বর্বর বাজনা শুনতে বাধ্য করেছি। আমি একসময়ে কাঠ কয়লা, আলকাতরা, বাটা হলুদ, ফুলের রঙ হাতের কাছে যা পাই, তা দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেছিলাম। যেহেতু আমার অর্থসংকট যাচ্ছিলো, সেজন্য এক ছবি তিন-তিনবার কিনতে তাকে রাজি করিয়েছি। মহাকবি গ্যোতের ফাউস্ট যখন অনুবাদ করছিলাম, দিনে রাতে তাকে কত বিরক্ত করেছি। যখনই টাকার অভাব পড়েছে, হুকুম করেছি। অতো টাকা অমুক দিন আমার চাই। উনার হাতে টাকা আছে কি না সে খবর নেয়ার প্রয়োজনও বোধ করিনি। সেই পেছনের দিনগুলোর কথা যখন ভাবি, আমি অবাক হয়ে যাই। রাজাক স্যার আমাকে এতটা প্রশ্ৰয় দিয়েছিলেন কেমন করে!
সে সময়ে আমেরিকান পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই ইহুদি বংশোদ্ভূত কুশাগ্ৰ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিটি ছিলেন বাংলাদেশের পয়লা নম্বরের শত্রু। তিনি নিকসন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাঙালি জনগণের বিপক্ষে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন এই কিসিঞ্জার সাহেবই। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি। তথাপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন করে কিসিঞ্জারকে বরণ করতে হচ্ছিলো। এই মার্কিন কুটনীতিবিশারদের নেক নজরে পড়ার জন্য মন্ত্রিসভা থেকে সোভিয়েটঘেঁষা সহকর্মীদের বাদ দিতে হল। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমদও রেহাই পেলেন না।
