তার কিছুদিন পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্জাক স্যারকে ডিলিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। এই ডিলিট ডিগ্রিপ্রাপ্তির ঘটনাটিকে উপলক্ষ করে আমি স্যারকে একটা সিল্কের পাঞ্জাবি, পাজামা, একটি ভালো ফাউন্টেন পেন এবং খুব দামি কিছু লেখার কাগজ উপহার দিয়েছিলাম। আমি অনুরোধ করেছিলাম, স্যার যেনো আমার উপহার দেয়া কলম এবং কাগজে তার আত্মজীবনীটা লেখা শুরু করেন।
আত্মজীবনী লেখার কথা যখন উঠল স্যার হাসতে হাসতে একটা ঘটনার উল্লেখ করলেন, আমি একবার মিস্টার এ কে ফজলুল হকরে যাইয়া কইলাম, আমি আপনের জীবনীটা লেখবার চাই। আপনে যদি দয়া কইর্যা পারমিশনটা দেন, কাজ শুরু করবার পারি। হক সাহেব তখন ইস্ট পাকিস্তানের গভর্নর। আমার প্রস্তাব শুইন্যা খেকাইয়া উইঠ্যা কইলেন, আমার জীবনী লেখতে চাও, নিশ্চয়ই তোমার একটা মতলব আছে। আমি কইলাম, মতলব ত একটা অবশ্যই আছে। হক সাহেব কইলেন, আগে হেইডা কও। আমি কইলাম, আপনে যখন গাও গোরামে যান, মাইনষের লগে এমন ব্যবহার করেন, তারা মনে করে জনম ভইর্যা আপনে গাও গেরামে কাটাইয়া তাগো সুখদুঃখের অংশ লাইতাছেন। তারপরে গাও গেরাম থেইক্যা ঢাহা শহরে আইস্যা আহসান মঞ্জিলের ছাদে উইঠা নওয়াব হাবিবুল্লাহর লগে যখন ঘুড্ডি উড়ান, লোকজন দেইখ্যা আপনেরে নওয়াববাড়ির ফরজন্দ মনে করে। তারপরে আবার যখন কলিকাতায় যাইয়া শ্যামাপ্রসাদের লগে গলা মিলাইয়া শ্যামাপ্রসাদরে ভাই বইলা ডাক দেন কলিকাতার মানুষ চিন্তা করে আপনে শ্যামপ্রসাদের আরেকটা ভাই। বাংলার বাইরে লখনৌ কিংবা এলাহাবাদে গিয়া মুসলিম নাইট নবাবগো লগে যখন বয়েন, দেখলে মনে আইব আপনে তাগো একজন। এই এতগুলা ভূমিকায় আপনে এত সুন্দর সাকসেসফুল অভিনয় করতে পারেন, এইডা ত একটা মস্ত ক্ষমতা। এই ক্ষমতা স্যার অলিভার লরেন্সেরও নাই। এই অভিনয়ক্ষমতার একটা এনকোয়ারি আমি করবার চাই। আর নইলে আপনের আসল গুণাপনা কোথায় হেইডা ত আমাগো অজানা নাই। হক সাহেব হুঙ্কার ছাইড়া জিগাইতে লাগল, তুমি আমার সম্পর্কে কী জান? আমি কইলাম, আপনে সুন্দর সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য মিছা কথা কইবার পারেন। আমার জবাব শুইন্যা হক সাহেব হ হ কইর্যা হাইস্যা উঠলেন।
হক সাহেব সম্পর্কে কথাবার্তা আর বেশিদূর অগ্রসর হতে পারলো না। মিসেস হামিদা হোসেন এসে গেছেন। মিসেস হোসেন শেখ সাহেবের কেবিনেটের জাদরেল মন্ত্রী ব্যারিষ্টার কামাল হোসেনের বেগম এই ভদ্রমহিলা রাজ্জাক স্যারের বিশেষ স্নেহের পাত্রী। তিনি ছাত্রী থাকাকালীন বিলেতের অক্সফোর্ড না ক্যামব্রিজে এ কে ফজলুল হকের ওপর গবেষণা করছিলেন। ফজলুল হক সম্পর্কিত তথ্যাদি জানার জন্য ঢাকায় রাজ্জাক সাহেবের কাছে এসেছিলেন। রাজ্জাক সাহেবের বাড়িতেই হামিদার সঙ্গে ড. কামালের পরিচয়। পরিচয়ের পর প্ৰেম, তারপর বিয়ে।
রাজ্জাক সাহেবের পছন্দের মানুষ আছেন। তার মধ্যে ড. কামাল সাহেব বিশিষ্ট একজন। ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দীন উমর, ড. আনিসুজ্জামান, ড. রওনক জাহান, সরদার ফজলুল করিম, ড. সালাউদ্দিন আহমদ, ড. মোশাররফ হোসেন, ড. মমতাজুর রহমান তরফদার এঁরা তার পছন্দের মানুষ। এ ছাড়া নিশ্চয়ই অনেকে আছেন, কিন্তু আমি তাদের নাম জানি না। ড. আনিসুজ্জামানের প্রতি তার এক বিশেষ ধরনের স্নেহ রয়েছে। সরদার ফজলুল করিমকে তিনি প্রায় সময়ে স্মরণ করতেন। সমুদ্রের জোয়ারভাটার মতো তার সম্পর্কেরাও ওঠানামা আছে। একসময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মরহুম সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে তাঁর উষ্ণ সম্পর্ক ছিলো। নানা সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নে তাদের মধ্যে মতান্তর ঘটে যায়। তাঁর পছন্দ অপছন্দের বোধটি এত প্রবল যে মতান্তর ঘটলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মনান্তর ঘটে যায়। কবি সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে সম্পর্কটা সেই উনিশশো নব্বই একানব্বই পর্যন্ত আমি বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ লক্ষ করেছি। আরেকজন মানুষকে তিনি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা করতেন। সেই ভদ্রলোকটি ছিলেন মরহুম ড. খোন্দকার মোকাররম হোসেন। খোন্দকার সাহেবের মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিবারের দেখাশোনা করতে দেখেছি। মোকাররম সাহেবের ছেলের সঙ্গে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রী দীপ্তীর বিয়ে দিয়েছিলেন। কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর প্রাক্তন ডিরেকটর এবং জিয়া সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব আজিজুল হককে ভীষণ পছন্দ করতেন। আমার কাছে প্রায়ই বলতেন, তাঁর যোগ্যতা বিশ্বমানের।
রাজ্জাক স্যার একটা কথা প্রায়ই বলতেন। আমরা শিক্ষকেরা প্রতি বছরই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিটা নতুন বছরে আমাদের কাছে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এসে হাজির হয়। এই তরুণদের চাহিদা, চাওয়া-পাওয়ার খবর আমাদের মতো লোলচর্মের বৃদ্ধদের জানার কথা নয়। এটাই হল শিক্ষক-জীবনের সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডি। তার পরেও রাজ্জাক সাহেবের চরিত্রের মধ্যে এমন একটা আকর্ষণী শক্তি ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান বিভাগের দীপ্তিমান ছাত্রদের তিনি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতেন। কারও মধ্যে সামান্যতম গুণের প্রকাশ দেখলেও তিনি সাধ্যমতো সাহায্য করতে চেষ্টা করতেন। একবার আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারের চাকুরির দরখাস্ত করেছিলাম। আমার ধারণা তিনি আমাকে স্নেহ করেন। কিন্তু আমার জন্য সুপারিশ না করে মাদ্রাসা থেকে আগত এক ভদ্ৰলোকের জন্য সুপারিশ করেছিলেন এবং তার চাকুরিটি হয়েছিলো। ভদ্রলোক আরব দার্শনিক আল মাওয়ারদির একটি লেখা আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দেখিয়েছিলেন। রাজ্জাক স্যার প্রায়ই আফসোস করতেন, আরবি ফারসি এবং সংস্কৃত পালি জনা লোকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে দুর্লভ হয়ে উঠছে। এই ভাষাগুলোর অভাবে ওরিজিনাল সোর্স ব্যবহার করার ক্ষমতা কারও জন্মাবে না। সেকেন্ড হ্যান্ড সোর্স পর্যালোচনা করে যেসব গবেষণাকর্ম করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে বিস্তর অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে।
