আমি রাজ্জাক সাহেবের হয়ে কৈফিয়ত দেয়ার কেউ নই। তথাপি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা বিরাট অংশের কাছ থেকে শুনে আসছি, আসলে অকারণে একটা রাজ্জাক মিথ খাড়া করা হয়েছে। রাজ্জাক সাহেবের ভেতরে সারপদার্থ অধিক নেই। যদি কিছু বলার থাকত অবশ্যই তিনি লিখে প্রকাশ করতেন। রাজ্জাক সাহেব কেনো লেখেননি সে জবাব দেয়ার আমি কেউ নই। তার পরেও একটা কারণে রাজ্জাক সাহেবকে আমি ধন্যবাদ না দিয়ে পারি না, তিনি এই মহাজনদের পন্থা অনুসরণ করে তাঁদের স্তরে নেমে আসেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে আরও একটা ধারণা চালু আছে। সেটা হলো এই, রাজ্জাক সাহেব আগাগোড়া কোনো বই পড়েন না। তাঁর ভক্তদের চমক লাগাবার জন্য বইয়ের ফ্ল্যাপ এবং গ্রন্থপরিচিতি মাত্র পাঠ করে সকলের সামনে তিনি যে কত বড় মহাজ্ঞানী সেটা প্রমাণ করে থাকেন। এই অভিযোগটির জবাব দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যারা অভিযোগ উচ্চারণ করেন, তাদের অপকৃষ্ট রুচি দেখে ব্যথিত অনুভব করি মাত্র। আমি রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করে কোনোদিন বাক্যালাপ করিনি। তিনি কথা বলেছেন আমি শুনেছি। তিনি যে স্পিরিটে কথা বলেছেন, আমি সেভাবে গ্রহণ করতে পেরেছি এমন দাবিও করতে পারবো না। যা শুনেছি, তার সবটাও স্মৃতিতে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
আমার এ রচনায় রাজ্জাক সাহেবের পাণ্ডিত্য এবং মননশীলতার কতিপয় প্রান্ত আমি তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। আমার মতো একজন সামান্য মানুষের পক্ষে রাজ্জাক সাহেবের অগাধ পাণ্ডিত্য পরিমাপ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তার সমালোচকদের অভিযোগের জবাব প্রত্যাশা করাও সমীচীন হবে না। আমি তাঁকে নানা সময়ে যেভাবে অনুভব করেছি, সেই অনুভবটুকু সকলের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র।
আমার সন-তারিখের ঠিক থাকে না। আর ডায়েরি লেখার অভ্যাসও আমার নেই। স্মৃতির গভীর থেকে এই বিষয়গুলো টেনে টেনে বার করছি। কোনটা আগে কোনটা পরে পারম্পর্য রক্ষা হচ্ছে না। আমি একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলাম। আমরা তৎকালীন সরকারবিরোধী একটা প্যানেল দিয়েছিলাম। একজন ছাড়া অন্য প্রার্থীদের নাম মনে পড়ছে না। তিনি মীর্জা গোলাম হাফিজ। নামকরা উকিল এবং বিএনপি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী। রাজ্জাক সাহেবকে আমি আমাকে ভোট দিতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি চোখ কপালে তুলে বলেছিলেন, আপনে আবার ওইগুলার মধ্যে গেছেন ক্যান?
আমি বললাম, স্যার, সকলে ধরে বসলেন, আমি না করতে পারলাম না। স্যার হুঁকা টানতে টানতে বললেন, ঠিক আছে আপনে যখন এক্কেরে খাড়াইয়া গেছেন, একটা ভোট আপনেরে দিমুনি।
স্যার সত্যি সত্যি আমাকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ওই নির্বাচনে আমি হেরেছিলাম। একজন ছাড়া আমাদের প্যানেলের কেউ জিততে পারে নি। তিনি মীর্জা গোলাম হাফিজ। হাফিজ সাহেব তলায়-তলায় আমাদের বিরোধী প্যানেলের সঙ্গেও একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছিলেন। এই এক মজার লোক! যে কথা তিনি শুনতে চান না, কেউ যদি বলেন, তিনি হাত-পা নেড়ে জানিয়ে দেন, তুমি কী বলছো আমি শুনতে পাচ্ছি না। কারণ আমি কানে কম শুনি। যে কথা তিনি পছন্দ করেন, ঠিকই শুনে ফেলেন। একবৰ্ণও বাদ পড়ে না। নির্বাচনে আমার অবস্থাটা হয়েছিলো সবচাইতে করুণ। আমাদের এজেন্ট ড. আহমেদ কামাল জানিয়েছিলেন, আমার নিজের ভোটটাও বাতিল হয়ে গিয়েছিলো। কোথায় টিকচিহ্ন দিতে কোথায় দিয়ে ফেলেছি!
নির্বাচনে হেরে একটু একটু জ্বালা করছিলো। তার পরের দিন স্যারের বাড়িতে গেলাম। তিনি বোধহয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্য লম্বা-চওড়া এক গল্প ফেঁদে বসলেন। পাকিস্তান হওয়ার আগে সিনেট নির্বাচনে কিভাবে হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো সেকথা জানালেন। নওয়াববাড়ির খাজা শাহাবুদ্দিন নির্বাচনের ফন্দিাফিকির খুব ভালো করে বুঝতেন। সেই সময়ে মুসলিম রেজিস্ট্রার্ডড গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিলো হিন্দুদের তুলনায় খুবই সামান্য। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভোটারদের কাছে হাজির হয়ে ব্যালটপেপার সই করিয়ে নিয়ে আসতো। রাজ্জাক স্যার জানালেন, তিনি একবার অনেকদূর পায়ে হেঁটে কুমিল্লা জেলার নবীনগর থানায় গিয়েছিলেন। নবীনগরে একজন সাব রেজিস্ট্রার থাকতেন। তার কাছ থেকে ব্যালটপেপারটা হাতে-হাতে নিয়ে আসার জন্য স্যারকে পায়ে হেঁটে অতোদূর যেতে হয়েছিলো।
দিল্লি থেকে প্রকাশিত ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অভ ইন্ডিয়া পত্রিকাটি সেই সময়ে খুব সম্ভাবতো প্রখ্যাত শিখ লেখক খুশবন্ত সিং সম্পাদনা করতেন। ওই পত্রিকাটির একটি সংখ্যায় রাজ্জাক স্যারের ওপর প্রধান রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে মার্কিনপ্রবাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিক ড. রওনক জাহানের ওপর অপর একটি রচনা ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে প্ৰকাশিত হয়েছিলো। পাশাপাশি রাজ্জাক স্যার এবং ড. রওনক জাহানের ছবি প্রকাশিত হয়েছিলো।
রাজ্জাক স্যারের ওপর লিখিত রচনাটিতে তার সম্পর্কে যেসকল কথা লিখিত হয়েছিলো, তার সবকিছু অক্ষরে—অক্ষরে আমি মনে করতে পারবো না। ইলাস্ট্রেটেড উইকলির প্রতিবেদন তাঁকে গ্রীক দার্শনিকের ডায়োজিনিসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এটা নতুন কথা নয়। এখানে অনেকেই তাকে ডায়োজিনিস বলে ডাকতেন। ওই পত্রিকায় তাকে ছয় দফার মূল প্রণেতা বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো। ড. রওনক জাহান ‘পাকিস্তান : ফেলিউর অভ ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ গ্রন্থটিতে দু’অঞ্চলের বৈষম্যের তুলনা করে দেখিয়েছিলেন পাকিস্তানের অখণ্ডতা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
