তিনি স্মিত হেসে বললেন, আমি বিলাত থেইক্কা ফিইর্যা ট্রটস্কির ‘থিয়োরি অব পার্মানেন্ট রেভ্যুল্যুশনে’র বাংলা তরজমা করছিলাম। তারপর চুরুটা ধরিয়ে একটুখানি লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, বিলাত থেইক্কা আইস্যা আরও একটা তরজমার কাজ আমি করছিলাম।
আমি আগ্রহসহকারে বললাম, কী কাজ স্যার?। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার ব্ৰত’ কইর্যা একটা ছোট বই আছে না, হেইডার ইংরেজি অনুবাদ।
রাজ্জাক স্যারের অনুবাদকর্মের কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। অধীর আগ্রহে জিগ্রগেস করলাম, পাণ্ডুলিপিগুলো কোথায়?
তিনি ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে ডান হাত দিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন, দেখে আমার রবীন্দ্রনাথের একটি গানের দুটি পঙক্তি মনে পড়ে গেল। পথিক পরান চলরে ওরে তুই/ যে পথ দিয়ে গেছে চলে বিকেলবেলার জুঁই।
এখানে আমি কিছু নিজের কথা বলবো। পরবর্তীকালে রাজ্জাক সাহেব সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ববিষয়ক যেসব কথাবার্তা বলেছেন আমার কাছে, আমি মনেমনে সেগুলোকে অবন ঠাকুরের ‘বাংলার ব্ৰত’ এবং ট্রটস্কির ‘থিয়োরি অব পার্মানেন্ট রেভ্যুল্যুশন’-এর মধ্যিখানে রেখে একটা গড় করে গ্রহণ করেছি। রাজ্জাক সাহেব সারাজীবনে কিছু লেখেননি কেনো, এই নালিশ আমি সকলের কাছে অহরহ শুনে আসছি। রাজ্জাক সাহেব উল্লেখ করার মতো কিছু লেখেননি কেনো, সে কৈফিয়ত একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। তার হয়ে কিছু বলা আমার উচিত হবে না। তথাপি আমি আমার যে ধারণা জন্মেছে, সেটা বলতে পারি। যৌবনে যে মানুষ ট্রটস্কির থিয়োরি অব পার্মানেন্ট রেভ্যুলুশনের বাংলা এবং অবন ঠাকুরের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন, সেই মানুষের পক্ষে অন্য কোনো মামুলি বিষয়ে কাজ করা অসম্ভব ছিলো, তার মানসিক সূক্ষ্মতার এমন একটা সমুন্নত উত্তরণ ঘটেছিল, সেখান থেকে তৎকালীন বিদ্যাচর্চার স্তরটিতে নেমে আসা সত্যি সত্যি দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। জ্ঞানচর্চার সামাজিক প্রেক্ষিতটির কথা অবশ্যই ধর্তব্যের মধ্যে আনতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে। কেনো এ তুলনাটা করা হয় তার হেতু অদ্যাবধি আমি আবিষ্কার করতে পারিনি। ঘর, বাড়ি, দালান, অট্টালিকা এসকল ভৌত কাঠামোগত কারণে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অক্সফোর্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়, আমার বলার কিছু থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে কেউ-কেউ ছিলেন, যাঁরা জ্ঞানচর্চার নানা ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা ছিলেন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোডাক্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেসকল ছাত্র পাশ করেছেন, তাঁরা জ্ঞানচর্চায় কোন ক্ষেত্রটিতে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, সেই জিনিসটি নতুন করে যাচিয়ে দেখা প্রয়োজন। উনিশশো একুশ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে। উনিশশো একুশ থেকে সাতচল্লিশ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রও আইসিএস পাশ করেনি। একথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলবার উপায় নেই।
ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের তিনটি প্রধান অবদানের একটি হল পাকিস্তান আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভিতটি তৈরি করা। দ্বিতীয় অবদান বাংলা ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদান এবং তৃতীয় অবদান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংকল্প ও কর্মপন্থার দিকনির্দেশনা। এই জনগোষ্ঠীর জীবনে ওই তিনটিই অত্যন্ত তাৎপৰ্যপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু জ্ঞানচর্চার যে আরও একটা বৈশ্বিক মানদণ্ড রয়েছে তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিশেষ কিছু নেই। বিশেষত পাকিস্তান সৃষ্টির পরে জ্ঞানচর্চার উত্তাপ আরও অবসিত হয়েছিলো। পাকিস্তান-সৃষ্টির পরে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষও নতুন কোনো গবেষণাকর্মে আত্মনিয়োগ করেননি। তিনি বিয়ে পড়ানো এবং মিলাদ শরিফ করে সময় কাটাতেন। জ্ঞানবিজ্ঞান ব্যক্তির সাধনায় বিকশিত হয়, কিন্তু সমাজের মধ্যে জ্ঞানের প্রয়োজন অনুভূত হওয়া চাই। বৃহত্তর অর্থে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনাও বৃহত্তর সমাজপ্রক্রিয়ার একটি অংশ। অনেক সময় উৎকৃষ্ট বীজও পাথরে পড়ে নষ্ট হয়। আমার ধারণা রাজ্জাক সাহেবের ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছিলো। হ্যাঁ, রাজ্জাক সাহেবের যদি চাকুরিবাকুরির ক্ষেত্রে উন্নতি করার আকাঙ্খা থাকত অবশ্যই তাঁকে লিখতে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে যে গবেষণা হয়েছে তার বেশিরভাগই চাকুরির প্রমোশনের উদ্দেশ্যে লেখা। রাজ্জাক সাহেবের যদি সে বালাই থাকত লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকসের হ্যারন্ড লাস্কির মৃত্যুর পর তাঁর লেখা থিসিসটা বগলে নিয়ে বিনা ডিগ্রিতে লন্ডন থেকে ফিরে আসতেন না। গোঁড়া ইংরেজ সুপারভাইজারের নির্দেশ মোতাবেক যেন-তেন প্রকারের একটি থিসিস লিখে ডিগ্রিটা অর্জন করতেন। রাজ্জাক সাহেব যদি সংসারধর্ম পালন করতেন, তা হলেও হয়তো জাগতিক উন্নতির প্রয়োজনে তাঁকে কিছু লেখালেখি করতে হতো।
অনেকে, তার মধ্যে রাজ্জাক সাহেবের প্রিয়তম ছাত্রও রয়েছেন, মনে করেন রাজ্জাক সাহেব একজন গোড়া মুসলিম লীগ সমর্থক। কিন্তু আমার মূল্যায়ন একটু ভিন্ন রকমের। তাঁর অবস্থান কিছু অংশে মুসলিম লীগ পাটাতনে ছিল একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি যদি মুসলিম লীগ না করতেন, তাকে অবশ্যই কমিউনিস্টদের সঙ্গে যেতে হতো। কিন্তু সেখানেও একটা বড় অসুবিধা ছিলো। কৃষিপ্রশ্নে লেনিন এবং কাউটিস্কির মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিলো তাতে রাজ্জাক সাহেবের সায় ছিল কাউটিস্কির অনুকূলে। লেনিন, রেনিগেড কাউটিস্কি শিরোনামে একটি পুস্তিকা লিখে কাউটিস্কিকে কষে গালাগাল দিয়েছিলেন। এখন অনেকেই মনে করছেন কৃষিপ্রশ্নে লেনিন-কাউটস্কি যে বিতর্ক হয়েছিলো, তাতে কাউটিস্কির অবস্থানটিই সঠিক ছিল। রাজ্জাক সাহেবকে এভাবে বোধ করি বিচার করা যায়, এ ট্রটস্কিয়াইট এ্যামাং দ্যা মুসলিম লীগারস।
