রাশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ে রাশিয়াতে কেনো সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করা প্রয়োজন, তার পক্ষে যে নৈতিক যুক্তিগুলো দাড় করিয়েছিলেন লেনিন, সেটাকেই গ্রন্থটির আকর্ষণীয় অংশ বলে আমার মনে হয়েছিল। লেনিনের মূল বক্তব্য ছিল এরকম : যান্ত্রিক প্রযুক্তি সম্প্রসারিত হচ্ছে, রাশিয়া তার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারবে না। রাশিয়ার উৎপাদন-ব্যবস্থার মধ্যেও একটি পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠেছে। রাশিয়া মান্ধাতার আমলের অর্থনীতি ইচ্ছা করলেও টিকিয়ে রাখতে পারবে না। ইতিহাসে পেছনে ফেরা নেই, যেতে হবে সম্মুখের দিকে। কিন্তু রাশিয়ান সমাজের পরিবর্তনের সূচনাটা কে করবে? পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে বুর্জোয়া শ্রেণী নেতৃত্ব দিয়ে সমাজের খোল নলচে দুইই বদলে ফেলেছে। কিন্তু রাশিয়াতে পশ্চিমের মতো কোনো সুগঠিত বুর্জোয়া জন্মায়নি। সামন্তবাদ রাশিয়ান সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সামন্ত শাসকদের দৃষ্টি ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাৎমুখী। আধুনিক কৃৎকৌশল প্রয়োগ করে সমাজের উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা তাদের নেই। আর পরিবর্তনসাধনের কাজটা যদি তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়, তারা রাশিয়ার শিল্প কৃষি সর্বত্র পশ্চিম ইউরোপের বুর্জোয়াদের ডেকে আনবে। পশ্চিমা বুর্জোয়ারা তাদের শোষণের নাগপাশ বিস্তার করে ভারত কিংবা এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোর মতো রাশিয়াকেও তাদের উপনিবেশে পরিণত করবে। রাশিয়ার সামান্তরা নিজেদের স্থায়িত্বের জন্য আপনা থেকেই পশ্চিমা বুর্জোয়াদের আগ বাড়িয়ে ডেকে আনবে। এই ধরনের একটা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে লেনিনের যুক্তি হল, রাশিয়াতে পশ্চিমের তুলনায় খুব অল্পই শিল্পায়ন হয়েছে। শিল্প-শ্রমিকের সংখ্যাও পশ্চিমের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। তার পরেও লেনিন মনে করেন, শ্রমিকশ্রেণীর হাতেই রাশিয়ার ভবিষ্যৎকে সোপর্দ করতে হবে। যেহেতু শ্রমিকরা যন্ত্রপাতি কলকবজা ব্যবহারের অধিক জ্ঞান রাখে, রাশিয়ার ভাবী শিল্পায়নের দায়িত্বও শ্রমিকশ্রেণীর ওপর ন্যস্ত করতে হবে।
মার্কসের হিসাবমতো গ্রেট ব্রিটেন কিংবা শিল্পসমৃদ্ধ জার্মানিতেই বিপ্লব হওয়ার কথা। মার্কসীয় থিসিস অনুসারে রাশিয়াতে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লব কিছুতেই সম্ভব নয়। লেনিন মার্কসীয় চিন্তা-পদ্ধতিতে একটু অদলবদল ঘটিয়ে রাশিয়াতে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে একটা বিপ্লব সম্পন্ন করার জন্যই রাশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসটি লিখেছিলেন।
এই বৃহৎ কলেবারের গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ করতে গিয়ে প্রায় পনেরো দিন দৈনিক ছয় সাত ঘণ্টা করে আমাকে খাটতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করে কাজটা শেষ করার পর যখন এক সকালবেলা স্যারকে দেখাতে নিয়ে গেলাম, তিনি বললেন, ওইখানে পিছনের টেবিলে রাইখ্যা যান, সময় অইলে দেখুমনে। তার পরে যেমন বই পড়ছিলেন, পড়তে থাকলেন। আমি একটু দামে গেলাম। এত কষ্ট করে কাজটা করলাম, আমার ধারণা ছিল তিনি দেখামাত্রই কাগজের শিটগুলো আমার হাত থেকে তুলে নিয়ে বলবেন, হায় হায় করছেন কী, এক্কেরে বেবাক বইটা সারসংক্ষেপ কইর্যা ফেলাইছেন! সেদিন তিনি এক কাপ চাও খেতে বলেননি। অগত্যা আমাকে মনোবেদনা চেপে গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে হলো।
কিছুদিন ফাঁক দিয়ে আমি আবার স্যারের কাছে গেলাম। তিনি নাস্তা খাওয়ার পর কাগজ পড়ছিলেন। সেই চিরাচরিত হাসিটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো। বুঝলাম স্যারের মেজাজ বেশ ফুরফুরে। চোখ থেকে চশমা নামিয়ে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা, লেনিনরে নিয়া বেশ মেহন্নত করছেন দেখলাম। ইংরেজি না লেইখ্যা বাংলাতে লিখলে পারতেন।
যাক বাঁচা গেল, তিনি আমার সিরিয়াসনেসটা অনুধাবন করতে পেরেছেন, এটাই আমার বড় সান্ত্বনা!
একথা সেকথার পর সমাজতন্ত্রের ভালোমন্দ নিয়ে কথা উঠলো। আমি সরাসরিই একটা প্রশ্ন করে বসলাম। স্যার, সমাজতন্ত্রের কোন জিনিসটা আপুনার ভালো লাগে?
তিনি বললেন, কেমনে কই কোন জিনিস ভাল লাগে। তবে আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা কইবার পারি। ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পরে একজন রাশিয়ান আইছিল ঢাকায়। তখন ত অন্যরকম সময়। একজন রাশিয়ান ভদ্রলোকের লগে মাখামাখি করলে ইন্টিলিজেন্সের কাছে জবাবদিহি করতে আয়, এই ভয়ে অর কাছে কেউ ঘোষবার চাইত না। অখন নামটা মনে করবার পারছি না। একসময় ভদ্ৰলোকের সঙ্গে আমার বেশ খাতির অইয়া গেল। একসময় তিনি আমাগো লগে থাকতে অইলেন। হেই সময় আমি শান্তিনগর থাকতাম। একদিন দুপুরবেলা ইউনিভার্সিটি থেইক্ক্যা যখন বাড়িতে ফিরবার লাইছি। সেই ভদ্রলোক আমার লগে আছিল। তখন দুপুরবেলা। খুব গরম। রিকশার বদলির সময়। সহজে রিকশা পাওন যায় না। যেই চড়বার লাইছি, সেই ভদ্রলোক আমার হাত ধইর্যা টাইন্যা নিয়া কইল, এইটাতে চড়ন। যাইত না, দেখছেন না কেমন হাড়জিরজিইর্যা মানুষ! আমি যত রিকশা ঠিক করি, একটা একটা অছিলা বাইর কইরা বিদায় কইর্যা দেয়। হেইদিন বেবাক পথটা হাইট্যা বাড়িত ফিরতে অইছিল। মেহন্নতি মানুষের ওপর এই যে জাগ্রত সহানুভূতি আমার মনে অইছে এইডাই সমাজতন্ত্রের সবচাইতে বড় কস্ট্রিবিউশন।
রুশ বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ট্রটস্কির প্রতি আমি ভীষণ অনুরক্ত ছিলাম। এই দেশে ট্রটস্কি ভীষণ ঘৃণিত মানুষ। আমার ইচ্ছা হল ট্রটস্কির প্রতি স্যারের মনোভাবটা জেনে নিই। তাই জিগ্গেস করলাম, ট্রটস্কি সম্পর্কে কিছু বলেন।
