এই তিনদিন নানা মানুষের সঙ্গে রাজ্জাক স্যারের যেসব কথাবার্তা হল, শুনে আমার মনে হল তাঁর বাক্য থেকে ঠিকরে মণিমুক্তো বেরিয়ে আসে। অতি সামান্য কথায়ও এমন তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়, বিস্ময়ে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তাজমহলকে সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডাইনে থেকে, বায়ে থেকে যেদিক থেকেই দেখা হোক না কেনো দর্শকের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আসে না, আরও দেখার পিপাসা জাগে। আমি রাজ্জাক সাহেবকে মনে মনে তাজমহলের সঙ্গেই তুলনা করতে থাকলাম। তার ব্যক্তিত্বের এমন একটা সুন্দর সম্মোহন রয়েছে, তার আকর্ষণ এড়ানো আমার পক্ষে অসম্ভব। ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি তথা মনীষার কান্তি কী জিনিস আমাদের সমাজে তার সন্ধান সচরাচর পাওয়া যায় না। রাজ্জাক সাহেবের প্রতি প্ৰাণের গভীরে যে একটা নিষ্কাম টান অনুভব করেছি, ও দিয়েই অনুভব করতে চেষ্টা করি এথেন্স নগরীর তরুণেরা দলেদলে কোন অমৃতের আকর্ষণে সক্রেটিসের কাছে ছুটে যেতো।
পরের সপ্তাহে প্ৰায় প্রতিদিন সকালবেলা স্যারের ওখানে গিয়েছি। শেকসপীয়র বলেছেন, ফ্যামিলিয়ারিটি ব্রীডস কনটেম্পট—অতিপরিচয়ে সুন্দর সম্পর্কও মলিন হয়ে যায়। প্রত্যহের পরুষ স্পর্শে অত্যন্ত হাৰ্দ্য সম্পর্কের মধ্যেও ময়লা জমতে থাকে। রাজ্জাক স্যার সম্পর্কে আমার পূর্বের ধারণারও ঈষৎ পরিবর্তন করতে বাধ্য হলাম। রাজ্জাক সাহেব তাজমহল ঠিকই, তবে তাতে কোনো দরোজা জানলা নেই। থাকলেও তাতে কোনো ছিটিকিনি নেই। এদিকের হাওয়া ঢুকে ওদিক দিয়ে চলে যায়। ওদিকের হাওয়া এদিকে। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বার্নার্ড শ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, এ গুড ম্যান এ্যামাং দ্যা ফেবিয়ানস। রাজ্জাক সাহেবের অবস্থাও অনেকটা সেরকম।
তাঁর কাছে খুব বেশি মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণার টানে আসেন না। তাদের প্রায় সকলেরই একটা—না-একটা ধান্ধা থাকে। কারও চাকুরির উন্নতি, কারও অন্যবিধ তদবির। মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরে থাকে। একটা দৃষ্টান্ত দিলেই জিনিসটা স্পষ্ট হবে। কাহিনীটা স্যারের মুখ থেকেই শোনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের ডাকসাইটে উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী বিলেত থেকে পিএইচডি শেষ করার পর এক সন্ধেবেলা তার ডক্টোরাল থিসিসের একটা কপিসহ স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সৌজন্য বিনিময়ের পর চা-নাস্তা খেয়ে চলে গেলেন। ক্লাব থেকে ফেরার পর রাজ্জাক স্যার দেখেন যে ভুলক্রমে চৌধুরী সাহেব তার থিসিসটা ফেলে গেছেন। তিনি তখন মতিন সাহেবকে ফোনে জানালেন। আপনার থিসিস ফেইল্যা গেছেন। মতিন সাহেব জবাবে জানালেন আপনার পড়ার জন্য রেখে এসেছি। রাজ্জাক সাহেব বললেন, আমি ত কিছু বুঝবার পারুম না। মতিন সাহেব বললেন, সেকথা বলবেন না স্যার, আপনি মহাজ্ঞানী, আপনি না বুঝতে পারেন, এমন কোনো জিনিস দুনিয়াতে নেই। তখন রাজ্জাক সাহেবকে হলফ করে বলতে হলো তিনি সত্যি সত্যি কিছু বুঝতে পারবেন না। মতিন চৌধুরী সাহেব তখনই তার সংকল্পটা ব্যক্ত করলেন। আপনি থিসিসটা বুঝতে পারবেন না ঠিকই, কিন্তু সিলেকশন কমিটির দুয়েকজন মেম্বারের কাছে বলে দিতে হবে কাজটা খুব উত্তম হয়েছে।
সেই সময়ে মতিন চৌধুরী সাহেব ছিলেন একজন প্রফেসর পদপ্রার্থী। মতিন সাহেবের হয়ে তিনি অনুরোধ করেছিলেন কি না বলতে পারবো না। তবে যাঁরা তাঁর চারপাশে ঘুরঘুর করতেন, তাঁকে দিয়ে তাঁরা অনেক কাজ করিয়ে নিতেন। এইরকম দীপ্তিমান মনীষাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি এই অজস্র বামুন-পরিবেষ্টিত অবস্থায় সকলের মাপে নিজেকে ছোটো করছেন কেনো তার কারণ আমি নিজেকেই বারবার জিগ্গেস করেছি। তার কারণ আবিষ্কার করতে অনেক সময় লেগেছে।
০৫. থিসিসের কথাটা
এরই মধ্যে একদিন গিয়ে আমি অত্যন্ত সসঙ্কোচে আমার থিসিসের কথাটা তুললাম। স্যার জানতে চাইলেন, এর মধ্যে লেখাপড়া কদ্দূর করছেন? আমি কিছু বইয়ের নাম করলাম, যেমন বি. বি. মিশ্রের ইন্ডিয়ান মিডল ক্লাসেস, উইলিয়াম হান্টারের অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল এজাতীয় আরও কিছু বই। রাজ্জাক স্যার জিগ্গেস করলেন, পড়ার সময় দরকারি অংশ টুইক্যা রাখার অভ্যাসটা করছেন কি না?
আমি চুপ করে রইলাম। তার অর্থ এই যে আমি কোনো নোট রাখিনি।
স্যার মন্তব্য করলেন, তাইলে ত কোনো কামে আইব না। ক্ষেত চাষবার সময় জমির আইল বাইন্ধ্যা রাখতে অয়।
তারপর রাজ্জাক স্যার শেলফের লেনিন রচনাবলীর ভেতর থেকে একটা বই টেনে বের করলেন। গায়ের চাদর দিয়ে মলাট মুছে নিয়ে বললেন, আপনেরা তো অখন বিপ্লব টিপ্লব অনেক কথা কইবার লাগছেন। দেখি লেনিন সাহেবের এই বইটা আগাগোড়া পইড়া সারসংক্ষেপ কইর্যা দেখান।
সেদিন আর বিশেষ কথাবার্তা হলো না। স্যারের কোনো একজন আত্মীয়ের অসুখ, হাসপাতালে যাওয়ার তাড়া ছিলো। আমি লেনিনের ইকোনমিক হিস্টরি অব রাশিয়া বইটি নিয়ে হোস্টেলে ফিরে এলাম। পুরো বই আদ্যোপান্ত পাঠ করে প্রাতিটা অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ করতে আমার জান কাবার হওয়ার দশা। ইংরেজি ভাষাতে সে সময়ে আমার দখল ছিলো যৎসামান্য। তা ছাড়া অর্থনৈতিক পরিভাষাগুলোর অর্থ কোনোরকমে বুঝতে পারলেও আমি নিজে সেগুলো ব্যবহার করার পারঙ্গমতা অর্জন করতে পারিনি। তথাপি লেনিনের রাশিয়ার অর্থনীতির ইতিহাসের বিশ্লেষণগুলো পাঠ করে আমি ভীষণ উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিলাম এবং লেনিনের অন্তর্দৃষ্টি আমাকে বিস্ময়াবিষ্ট করে তুলেছিল। একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। লেনিন সাহেব দেখিয়েছেন বৃহৎ জোতের জমি চাষের প্রচলন শুরু হওয়ার পরে উন্নত জাতের ঘোড়া জমি চাষার কাজে ব্যবহার হওয়ার কারণে উৎকৃষ্ট অশ্ব-প্রজননের ধুম পড়ে যায়। ভালো জাতের ঘোড়ার প্রজননবৃদ্ধির জন্য ঘোড়ার বৈদ্য একটি অর্থনৈতিক শ্ৰেণী সৃষ্টি হয়েছে, সেই জিনিসটিও উল্লেখ করতে ভুল করেননি।
