শেখ তবারক আলীর গোয়ালঘর বানানোর পরিকল্পনা শুনে আবু জুনায়েদ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন,
-এই রকম একটা বাড়ি পেলে ভাই আবেদ আমিই তো বাস করতে চলে আসি।
আবেদ হোসেন আবু জুনায়েদের কথার কোনো জবাব দিলেন না। তারপর একটু ঢোক গিলে বললেন,
-গরুটার কথা তো স্যার আপনাকে চিন্তা করতে হবে। সাভার ডেয়ারি ফার্মে সুইডিশ এবং অস্ট্রেলিয়ান গরুর মধ্যে ক্রস ঘটিয়ে একটা বাচ্চা জন্মানো সম্ভব হয়েছে। আব্বা ওই গরুটিই আপনার গোয়ালে পাঠাবার কথা চিন্তা করছেন।
আবু জুনায়েদ কোনো মন্তব্য করলেন না। এতক্ষণ নুরুন্নাহার বানু একটি কথাও বলেননি। তার দুটি কারণ। প্রাতঃমৈথুনের আনন্দের রেশটি তখনো কাটেনি। দ্বিতীয়ত এত কুলি-কামিনের মধ্যে মুখ খুললে তিনি মনে করেন, অনাবশ্যক নিজেকে খেলো করে তুলবেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকা নুরুন্নাহার বানুর ধাতের মধ্যে নেই। এবার তিনি কথা বলতে আরম্ভ করলেন। বিশেষত আবু জুনায়েদের সে কথাটির প্রতিবাদ করা প্রয়োজন মনে করলেন। আবু জুনায়েদ এক পর্যায়ে বলে ফেলেছেন, প্রস্তাবিত গরুর ঘরটির মতো একটা ঘর পেলে নিজে বাস করতে আসবেন। আবু জুনায়েদ ফকির মানুষের বেটা। কথায় কথায় ফকিরালি স্বভাবটি তার বেরিয়ে আসে। তবারক চাচার জামাইয়ের কাছে এই কথাটা বলা মোটেই আবু জুনায়েদের উচিত হয়নি। নুরুন্নাহার বানুর মনেও বড় একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করার ইচ্ছে আছে। সেই ব্যাপারটি জানিয়ে দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
-আবেদ, তুমি তো আমার ছোট বোনের বর, সুতরাং তোমাকে তুমিই বলব। তুমি কি রাগ করবে?
না আপা রাগ করব কেন, অবশ্যই তুমি বলবেন। জবাব দিলেন আবেদ হোসেন।
নুরুন্নাহার বানু বললেন,
-উত্তরাতে আমাদের বার কাঠা জমি আছে। বাড়ি বানানোর সময়ে চাচাকে ধরে বলব, চাচা আপনি একটা সুন্দর নকশা এঁকে দেন। চাচা সুন্দর সুন্দর বাড়ির নকশা করতে পারেন ।
আবেদ বললেন,
-আব্বা বাড়ির প্ল্যান করতে ওস্তাদ। তার সামনে বিদেশী স্থপতি পর্যন্ত পেন্সিল ধরতে সাহস পান না।
এরই মধ্যে মাল সরঞ্জাম নামিয়ে তূপ করে রাখা হয়েছে। হেড মিস্ত্রি কোন জায়গায় ঘরটা ওঠানো হবে সীমানা নির্দেশ করতে বললেন। আবু জুনায়েদ স্থান নির্বাচন করতে গিয়ে একটু গোলের মধ্যে পড়ে গেলেন। তার ইচ্ছে হলো উপাচার্য ভবনের লাগোয়া পেছন দিকটাতেই গোয়াল ঘরটা বানানো ভালো হয়। তিনি পেছনের দরজা খুলে যখন ইচ্ছে গরুটা দেখতে ছুটে আসতে পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো, চারপাশে ফাঁকা জায়গার মাঝখানে একটা বর্বর হর্তুকি গাছ আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আবু জুনায়েদ বললেন
ওই হর্তুকি গাছটা কেটে ফেলে এখানে ঘরটা তুললে ভালো হয়। তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন।
আবেদ হোসেন বললেন,
-স্যার আমার একটা কথা আছে। ঢাকা শহরে হর্তুকি বিরলপ্রজাতির বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সুতরাং গাছটা কাটা ঠিক হবে না। তাছাড়া বসতবাড়ির অত সন্নিকটে গোয়াল ঘর থাকাও উচিত নয়। গরুর গোবর, প্রস্রাবের ঘ্রাণ এসব পীড়াদায়ক বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তার চাইতে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে যে খালি জায়গাটি আছে, সেখানে ঘরটি তৈরি করলে সবদিকে উত্তম হয়।
-আবু জুনায়েদ বললেন,
-আবেদ জায়গাটি উত্তম, কিন্তু অসুবিধের কথা হলো কী জানো, গোটা বর্ষাকাল সারা মাঠটা প্যাক কাদায় একেবারে ফকফকে হয়ে থাকে। এই এতটা পথ গরুর দেখাশোনার জন্য গোয়াল ঘরে আসা-যাওয়া একটা কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
আবু জুনায়েদের আশঙ্কার জবাবে আবেদ হোসেন বললেন,
-স্যার প্যাক কাদা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। সমস্ত রাস্তাটাই আমরা কংক্রীট দিয়ে বাঁধিয়ে দেব।
ঠিক হলো আবেদ হোসেনের নির্দেশিত স্থানে গোয়ালঘর বানানো হবে।
মিস্ত্রিরা ফিতা টেনে জায়গাটা চিহ্নিত করে ফেললেন। আবেদ হোসেন শেখ তবারক আলীর স্বহস্তে আঁকা নকশাখানা ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন । সাত-আটজন মজুর একসঙ্গে দেয়াল বানাবার জন্য মাটি কাটতে লেগে গেল। মাটি কাটাকাটি করতে দেখলে আবু জুনায়েদের খুব ভালো লাগে। বালক বয়সে তারা একটি কুয়ো খনন করেছিলেন। আবু জুনায়েদ সারা দিন বসে থেকে মজুরদের মাটি তোলা দেখতেন। পৃথিবীর গভীরে আরো গভীরে কী আছে জানার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠত। বার বার আব্বাকে প্রশ্ন করতেন,
-আব্বা মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে একেবারে পৃথিবীর বুক ভেদ করে অপর পাড়ে যাওয়া যায় কি না। আব্বা হাসতেন। আবু জুনায়েদ বার বার জানতে চাইতেন। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলতেন,
-দূর পাগলা এমন কথা কেউ বলে নাকি।
মাটি খোঁড়াখুড়ি করতে দেখলে আবু জুনায়েদের এসব কথা মনে পড়ে যায়।
নুরুন্নাহার বানু তার গায়ে ঠেলা দিয়ে বললেন, তুমি এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? আবেদকে একবারও চা খেতে বলবে না নাকি?
স্ত্রীর কথা শুনে মনে হলো মস্ত অন্যায় হয়ে গেছে। শেখ তবারক আলী সাহেবের জামাইকে একবারও ঘরে যেতে বলেননি। অনেকটা মাফ চাইবার ভঙ্গিতে বললেন
-ভাই আবেদ রাগ করবে না। আগেই তো বলেছি বার বছর মাস্টারি করলে যে কোনো মানুষ গাধা হয়ে যায়। চলো ঘরে চলো। আবেদ স্মিথ হেসে বললেন,
-স্যার আজ থাক অন্যদিন আসব । এখন আমাকে বুড়িগঙ্গার পাড়ে ছুটতে হবে। একখানি ড্রেজার অচল হয়ে গেছে।
