মিস্ত্রিদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে অপেক্ষমাণ পাজেরোতে উঠে স্টার্ট দিল। আবেদ চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত আবু জুনায়েদ মজুরদের কাজ দেখতে থাকলেন। তার মনের মধ্যে একটা ছুটির হাওয়া দোলা দিতে থাকল। স্কুল পালানো বালকের মতো একটা নির্মল আনন্দে তার সারা মনপ্রাণ ভরে গেছে। নুরুন্নাহার বানু তার পাঞ্জাবির কোণা আকর্ষণ করে বলল, চলো ঘরে যাই। নুরুন্নাহার বানুর পেছন পেছন তিনি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। নুরুন্নাহার বানু জানতে চাইলেন
-আজ কি তোমার অফিস নেই?
-অফিস আছে, কিন্তু ও বেলা যাব। জবাব দিলেন আবু জুনায়েদ।
-ঠিক আছে গোসল সেরে একটু পাক-পরিষ্কার হয়ে নাও, তারপর দুটি খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে একেবারে বিকেল বেলা অফিসে যাবে।
নুরুন্নাহার বানুর কথার জবাবে আবু জুনায়েদ বললেন,
-আবার গোসল কেন, সকালে তো একবার করেছি।
-গোসল কেন আবার বুঝিয়ে দিতে হবে। নুরুন্নাহার বানু একটা ইঙ্গিত করলেন, নুরুন্নাহার বানু বললেন, চলো আমার সারা গা কুট কুট করছে। তোমার রাতদিন কোনো জ্ঞান নেই।
.
০৮.
দুদিনের মধ্যেই লাল ইটের দেয়াল মাটি ছাড়িয়ে উঠে গেল। সাত আটজন মিস্ত্রি কাজ করছে। সারা দিন তো কাজ করেই হ্যাজাক জ্বালিয়ে আধারাত পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে। আবু জুনায়েদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। তার স্বপ্নের গোয়াল ঘর তৈরি হতে যাচ্ছে। ইট গাঁথা হচ্ছে, সিমেন্টে বালু মেশানো হচ্ছে, নির্মীয়মাণ গোয়ালঘরের কোণাকানচিগুলো স্পষ্ট আকার ধারণ করছে। সবকিছুর মধ্য দিয়ে আবু জুনায়েদের আজন্মলালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে। গোয়ালঘর তৈরি হবে এবং সেই ঘরে বাস করতে একটি গাভী আসবে। প্রচণ্ড একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আবু জুনায়েদের ফুরসৎ খুবই কম। তবু দিনে দুতিনবার গিয়ে মিস্ত্রিদের কাজ দেখে আসেন। অফিসে যাওয়ার আগে একবার দেখেন। দুপুরে খেতে এলে গাড়ি থেকে নেমেই ছুটে যান। বিকেলে যেদিন কাজ থাকে না, ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে থাকেন। এই অল্প কদিনের মধ্যেই দেয়ালগুলোর উচ্চতা চারফুট উঠে গেছে। এখন কলাম বসবে। কলামের ফাঁকে ফাঁকে জানালা। ভেতরে ভেতরে যে উত্তেজনা তিনি অনুভব করছেন, নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পূর্বেও সে রকম অনুভূতি তার হয়নি।
নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গেও তার সম্পর্কটা এখন খুবই ভালো। কোনো দাম্পত্য কলহ নেই, পারিবারিক জীবনে কোনো খিটিমিটি নেই। দুজন যখন একান্তে আলাপ করেন তখন গরুর কথাটা আপনি এসে পড়ে। নুরুন্নাহার যখন প্রথম বাচ্চা পেটে ধরেছিলেন, ওনিয়েও দুজনের মধ্যে এমন সহমর্মিতা দেখা যায়নি। প্রথমবারের গর্ভবতী হওয়ার পর নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ সব সময়ে খাট্টা হয়ে থাকত। একটুতেই তিনি রেগে যেতেন, কেঁদে বুক ভাসাতেন এবং আবু জুনায়েদকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতেন। কেননা আবু জুনায়েদই তার এই ভোগান্তির কারণ। শেখ তবারক আলীর বাড়ি থেকে ফেরার পরপরই নুরুন্নাহার বানুর মনটা নতুন করে আবু জুনায়েদের দিকে ঢলতে আরম্ভ করেছে। নুরুন্নাহার বানুর সাজ-পোশাকের বহর এখন অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন করে ভাজভাঙা শাড়ি পরেন। তবারক আলীর স্ত্রীর কাছ থেকে যে সকল অলঙ্কার উপহার পেয়েছেন, পারতপক্ষে সেগুলো শরীর থেকে নামান না। নুরুন্নাহার বানু কীভাবে রানী-রানী ভঙ্গি সৃষ্টি করা যায়, আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নুরুন্নাহার বানুর এই সার্বক্ষণিক সাজগোজের ঘটা দেখে মেয়েটা ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেছে। তার একটা প্রত্যক্ষ কারণ অবশ্য আছে। তবারক আলীর স্ত্রী দীলুকে যে বেনারশিখানা উপহার দিয়েছেন, সে কাপড়টার প্রতি নুরুন্নাহার বানুর ভীষণ লোভ। যখন তখন সেই শাড়িটাই পরে বসেন। একদিন মেয়ে বলেই বসল,
আম্মা নানি আমাকে যে শাড়িখানা দিয়েছেন সেটা তুমি যখন তখন পরে বসো কেন? ওটা তো আমার । নুরুন্নাহার বানু মেয়ের কথা গায়ে মাখেন না বিশেষ। দীলু চেঁচামেচি করলে জবাব দেন,
-তুই তো সারাক্ষণ সালোয়ার কামিজ পরে থাকিস। আমি শাড়িটা এক আধটু পরলে কি তোর শাড়ি ছিঁড়ে যাবে। তোর শাড়ি তো তোরই থাকবে।
-আম্মা ছিঁড়ে না যাক আমার কাপড় তুমি যখন তখন পরে বসবে না। তোমার যদি খুব শখ হয়, তাহলে নানিকে বলো যেন তোমাকেও একখানা কিনে দেন।
মেয়ের কথার কোনো জবাব দেন না নুরুন্নাহার বানু। ঠিক এই রঙের নয়, এই জাতীয় একখানি শাড়ি যদি চাচি তাকেও দিতেন খুব ভালো হতো। হার, ব্রেসলেট, ইয়ারিং এবং হাতের চুড়ির সঙ্গে এই শাড়িটাই মানায় চমৎকার । চাচির কাছে ওরকম আরেকখান শাড়ি চাইবেন কি না ভেবে দেখেন। না সম্ভব নয়। সেটি তিনি করতে পারবেন না। তিনি উপাচার্যের বেগম। কারু কাছ থেকে কিছু চাওয়ার মধ্যে একটা কাঙালপনা আছে। সেটি তিনি করতে পারবেন না। নুরুন্নাহার বানুর হাতে যখন কোনো কাজ-কর্ম থাকে না, দূরের আত্মীয়দের কাছে টেলিফোন করে সুসংবাদটা প্রকাশ করেন। তবারক চাচা তাকে একই সঙ্গে গরু এবং গোয়াল দুটিই উপহার দিতে চাচ্ছেন। নুরুন্নাহার বানুর বাবা যখন বেঁচেছিলেন তার বড় এবং মেজো দুবোনকেই প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর আস্ত গাইগরু উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই বাবার কাছে গাভী পাওয়ার প্রত্যাশা করে। এ প্রত্যাশা নুরুন্নাহার বানুরও ছিল। কিন্তু তিনি চাইতে পারেননি। চাইলে বাবা অবশ্যই একটা দুধের গাই দিতেন, যাতে নাতি নাতনিরা দুধ খেতে পারে। তিনি মুখ ফুটে চাইতে পারেননি। কারণ বাবা যদি বলে বসেন, বানু গাই কিনে দিলে তুমি রাখবে কোথায়। তোমার তো মোটে দুখানা ঘর। যেখানে খাওয়া সেখানে শোয়া, সেখানে রান্না। বাবা মারা গেছেন। তবারক চাচা আছেন, আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন। আর নুরুন্নাহার বানুদের একটা গাই পোষার ক্ষমতা হয়েছে। বাবার দায়িত্ব চাচা পালন করছেন। শেখ তবারক আলী তার বাবার আপন ভাই না হোক, তার চাইতে অনেক বেশি। নুরুন্নাহারের আপন মায়ের পেটের ভায়েরা তার জন্য কতটুকু করে? আব্বার বিষয় সম্পত্তি সব লুটে-পুটে খাচ্ছে। বোনের কথা কি তাদের খেয়াল । আছে। বউরা তাদের ভেড়য়া বানিয়ে রেখেছে। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, তবারক চাচার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে শোক পেয়েছিলেন, তবারক চাচা তার অনেকখানিই ভরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তবারক চাচাকে একখানি দিলও দিয়েছেন। ফাঁকে ফাঁকে তিনি আবু জুনায়েদের কথাও চিন্তা করেন। মানুষটা যেন কী? তবারক চাচা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করেন, অথচ আবু জুনায়েদ তার কোনো খবর জানেন না। মানুষটা যেন কী? আগে হলে বলতেন আচাবুয়া গর্দভ। এখন তার মূল্যায়নের ধারাটা একটু পাল্টেছে। এখন তিনি মনে করছেন আবু জুনায়েদ সব সময়ে ভাবের ঘোরে থাকেন। তাই ডানে বায়ে কী ঘটছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে পারেন না। হালফিল এটাকে একটা চমৎকার গুণ বলে মনে করেছেন। আবেদ হোসেন কথা দিয়েছিলেন আট দশ দিনে গোয়াল ঘর তৈরি করে ফেলবেন। কিন্তু তৈরি করতে পনের দিন লেগে গেল। তারপরেও কিছু কাজ বাকি পড়ে রইল। উত্তর দিকে যে শেডটা বানানোর কথা ছিল, এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আবেদ হোসেন জানালেন তার ক্যালকুলেশন কখনো ফেল হয় না। এবার হয়ে গেল, কারণ একটা অঘটন ঘটে গেছে। হেড মিস্ত্রির মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেছে। হেড মিস্ত্রির জামাই পণের টাকার দাবি নিয়ে অনেকদিন থেকেই মেয়েটার উপর অত্যাচার করছিল। শেষমেশ অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করে পণের টাকার দায় থেকে আত্মরক্ষা করেছে। হেড মিস্ত্রিকে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ছুটে যেতে হয়েছিল এবং থানা পুলিশ অনেক কিছু করতে হয়েছে। উত্তর দিকের শেডটা আবেদ হোসেন খুব সুন্দরভাবে বানাতে চান। শেখ তবারক আলী তাকে সেরকমই নির্দেশ দিয়েছেন। মামুলি মিস্ত্রি দিয়ে সুন্দর জিনিস বানানো যায় না। তাই এ বিলম্ব এবং সেজন্য তিনি লজ্জিত। যা হোক, হেড মিস্ত্রি যখন ঝামেলা মিটিয়ে চলে আসতে পেরেছে, আর দুশ্চিন্তা নেই। এই দুচারদিনের মধ্যেই সব কমপ্লিট হয়ে যাবে। আবেদ হোসেনের দুচারদিন দশদিনে গিয়ে দাঁড়ালো। একটু বেশি সময় নিল, তারপরেও যে গোয়াল ঘর তৈরি হলো, দেখে আবু জুনায়েদের মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। আল্লাহ এতদিনে তার একটা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন।
