-স্বয়ং উপাচার্য সাহেব পারমিশন দিয়েছেন, ট্রাক আটকাবার তুমি কে?
-আমি ওই বাগানের হেড মালি। আমার ফুলের গাছ নষ্ট করার অধিকার তোমাদের নেই। ফুল অনেক কষ্ট করে ফোঁটাতে হয়। তুমি ঠিকাদারের মানুষ রদ্দি মালের কারবারি, ফুলগাছ নষ্ট হওয়ার কষ্ট তুমি কী বুঝবে, বললেন হেড মালি।
-মালি বেটার ফুটানি কত, সরে দাঁড়াও, ট্রাক ওইদিক দিয়েই যাবে, উত্তরে বলল ওভারসীয়র। হেড মালি ওভারসীয়রের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে ভীষণ তেতে উঠল।
-দেখি ওভারসীয়রের বেটা তুমি ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাও এই আমি শুয়ে পড়লাম। সত্যি সত্যি হেড মালি ফুল গাছের সারির পাশে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল । ব্যাপারটা আরো গুরুতর রূপ নিতে পারত। শেখ তবারক আলীর জামাতা আবেদ হোসেন ঘটনাস্থলে এসে পড়ায় একটা মীমাংসা হয়ে গেল । ফুল গাছের সারি দুটো রক্ষা পেল । অনেকদূর ঘুরে ট্রাককে বাড়ির পেছনে যেতে হলো।
আজ আবু জুনায়েদের একটা বিশেষ দিন। তার জীবনের একটি প্রিয় স্বপ্ন পূর্ণ হতে চলেছে। তার বাড়িতে একটা গরু আসার উপলক্ষ দেখা দিয়েছে। এখন সেই গরুর গোয়াল তৈরি হতে যাচ্ছে। এর চাইতে প্রিয় ব্যাপার আর কী হতে পারে? তিনি শরীর থেকে স্যুট টাই অপসারণ করে পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়ে বেশ ঝরঝরে হয়ে উঠলেন। নিচে যাওয়ার জন্য স্লিপারে পা চালিয়েছেন। অমনি মনে হলো আগে সংবাদটা নুরুন্নাহার বানুকে জানানো প্রয়োজন। তিনি শোবার ঘরে গেলেন। দরজা পেরিয়ে ঘরে প্রবেশ করার আগেই লম্বাটে আয়নাটায় নুরুন্নাহার বানুর প্রতিফলিত চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। গেল রাতে শেখ তবারক আলীর স্ত্রী তাদের কন্যা দীলুকে যে বেনারশিখানা দিয়েছেন নুরুন্নাহার বানু সেটি পরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। তার হাতে গলায় তবারক আলীর স্ত্রীর দেয়া সোনার অলঙ্কারগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আবু জুনায়েদ দৃষ্টি ফেরাতে পারলেন না। নতুন বেনারশি এবং অলঙ্কারের সৌষ্ঠবে নুরুন্নাহার বানুকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। আবু জুনায়েদ পা টিপে টিপে এসে নুরুন্নাহার বানুর চোখ দুটো চেপে ধরে দুই গালে চুমো খেলেন। নুরুন্নাহার বানু বেঁকে চুরে আবু জুনায়েদের নাগালের বাইরে চলে গেলেন। তারপর আবু জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই পাষাণগলানো হাসি দেখে আবু জুনায়েদের কী একটা যেন ঘটে গেল। হাজার বছরের সুপ্ত পিপাসা তার সারা শরীরে জেগে উঠল। তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। দুহাতে নুরুন্নাহার বানুকে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে লাগলেন।
নুরুন্নাহার বানু এবং আবু জুনায়েদ হাত ধরাধরি করে নিচে নামলেন। বাইরে লোকজনের দঙ্গল দেখে ফেলে এই ভয়ে পরস্পরের হাত ছাড়িয়ে নিলেন। ইটের স্তূপ, রডের রাশি এবং সিমেন্টের ইতস্তত ছড়ানো বস্তাগুলো দেখে আবু জুনায়েদের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। তবারক সাহেব একেবারে ঘর বানাবার মাল সরঞ্জাম সব পাঠিয়ে দিয়েছেন। মাল এখনো নামানো হয়নি। ঝটপটে মাল নামানোর কাজ চলছে। শেখ তবারক আলীর জামাই আবেদ হোসেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাল নামানো তদারক করছেন। আবু জুনায়েদ এবং নুরুন্নাহার বানু নিকটে এলে আবেদ হোসেন তাদের সালাম দিলেন। আবু জুনায়েদ অনেকটা অনুযোগের ভঙ্গিতে বললেন,
-আবেদ তুমি ঘরে না এসে বাইরে কেন দাঁড়িয়ে রয়েছ?
-স্যার এদিকটার কাজকর্মের একটা গতি হোক আগে। জবাব দিলেন তবারক আলীর জামাতা।
-তাহলে তবারক সাহেব একেবারে গোয়াল ঘর তৈরি করেই ছাড়লেন। কথার পিঠে কথা বললেন আবু জুনায়েদ।
-স্যার, আব্বার কড়া হুকুম, সাত দিনের মধ্যে গোয়াল ঘর বানিয়ে ফেলতে হবে। এখন কথা হলো আপনি কী ধরনের ঘর পছন্দ করবেন সেটা জানার প্রয়োজন আছে। আপনি যে রকম চাইবেন মিস্ত্রিরা বানিয়ে দেবেন। আবেদ হোসেন কথার উত্তরে জানালেন-
আমার আবার পছন্দ অপছন্দ কী? একখানা গোয়ালঘর হলেই আমার চলে। যে কোনো রকমের একখানা গোয়ালঘর। আমার আব্বা পাটের বেড়া এবং খড়ের চালা দিয়ে গোয়ালঘর বানিয়েছিলেন, সেখানেই সারা জীবন গরু রেখেছেন।
আবেদ হোসেন বললেন,
-স্যার এখন কি আর পাটখড়ির যুগ আছে? তাছাড়া এই মনুমেন্টাল বিল্ডিংয়ের পেছনে যেমন তেমন একটা স্ট্রাকচার খাড়া করে দিলে তো আর চলবে না। আব্বা বলে দিয়েছেন, এমন ঘর তৈরি করতে হবে যাতে গোটা পরিবেশের সঙ্গে চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়।
আবু জুনায়েদ বললেন,
-ভাই আবেদ, তুমি তো জানো বার বছর মাস্টারি করলে মানুষ গাধা হয়ে যায় । আমার পঁচিশ বছর চলছে। তোমাদের যা মন লয় করো, আমার কিছুই মনে আসছে না।
আবেদ জানালেন শেখ তবারক আলী সাহেব দশ বাই বার ফিট ঘরের একটা নকশা এঁকে দিয়েছেন। ঘরটা দেখতে চৌকোমতে হবে। চারপাশের দেয়াল চারফুট পর্যন্ত উঁচু হবে। সর্বসাকুল্যে উচ্চতা দাঁড়াবে দশফুট। বাকিটা কলাম করতে হবে। ছয়টা ফাঁক থাকবে। দুটো ফাঁকে দুটো দরজা বসবে। সামনের দরজাটা হবে বড়, পেছনের দরজা অপেক্ষাকৃত ছোট। কলামের ফাঁকে ফাঁকে চারটি কাঁচের জানালা হবে। ঘরে যাতে প্রচুর আলো-বাতাস খেলতে পারে, সেজন্য জানালাগুলো যাতে খোলা এবং বন্ধ করা যায় সে ব্যবস্থা থাকবে। ছাদটা হবে টিনের। কিন্তু নিচে বাঁশের বেড়া ফিট করে দিতে হবে। নইলে গরম কালে খুব গরম হবে। আর দক্ষিণ দিকে ঘরের লাগোয়া একটি টিনের শেড থাকবে। দিনের বেলা গরু এই শেডের নিচে থাকবে। এই পাশে খইল কুড়োর গামলা এবং ঘাস বিচালির ‘আড়া’ বানানো হবে। আপনারা যাতে মাঝে-মাঝে এসে গোয়ালঘরের পাশে এসে কিছুটা সময় ব্যয় করতে পারেন, সেজন্য উত্তর দিকে আরো একটা শেড নির্মাণ করা হবে। সেখানে সিমেন্ট দিয়ে একটা মস্ত বড় গোল টেবিল বানানো হবে, যার চারপাশে বসার ব্যবস্থা থাকবে।
