ওর এখন যা যা করণীয়, সে উঠে পড়ে ঠিক করে নিল। অন্য দিন সোমা জানলায় দাঁড়িয়ে থাকলে, তাকে পাশে নিয়ে সেও দাঁড়াত। কথা বলত। বাগানের সব নানাবর্ণের ফুলের সঙ্গে সোমার অঙ্গ—প্রত্যঙ্গের তুলনা দিতে ভালোবাসত। যেমন একটা লাল তাজা গোলাপের মতো ওর সুন্দর সুষম জায়গা, নরম তাজা, এবং লাল গোলাপ চটকালে যে মধুর ইচ্ছা কাজ করে বেড়ায় তেমন ইচ্ছায় কথা বললে, সোমা বলত, তুমি ভারি অসভ্য।
এ—মুহূর্তে সে আর সোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে না। বুকের ভিতরে সেই একটা কষ্ট, কেমন থেকে থেকে ধক করে উঠছে। এমন তো ওর কখনও ছিল না। সে, সোমাকে আজও প্রশ্ন করতে পারত, কিন্তু করে লাভ নেই। বরং সে ভেবেছে, এখন যে যে জায়গায় তার পরিচিত ব্যক্তিরা হত্যা হয়েছে, সব জায়গায় সে এক এক করে জিজ্ঞাসা করবে, প্রত্যেকে চিঠি পেয়েছিল না চিঠি পায়নি, চিঠি পাবার পর ওরা কতদিন সাধারণত দেরি করে থাকে, অথবা যারাই চিঠি পেয়েছে, তারাই নিহত হয়েছে, না কেউ কেউ রেহাই পেয়েছে, এবং সেটা শতকরা কী দাঁড়ায়, সেজন্য সে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেল। কিন্তু বাথরুমে ঢুকেই মনে হল, সোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি, সে আবার দরজা খুলে বের হয়ে এল! কিন্তু সোমা তখনও জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। এটা কেন হবে, সে সোমার পাশে গিয়ে ডাকল। কেমন অহেতুক একটা জড়তা শরীরে সোমার। সর্বনাশ এটা কী! সোমা, সোমা! আশ্চর্য তো, সোমার হুঁশ নেই।—এই সোমা!
সোমা বলল, হুঁ।
তুমি কী দেখছ?
কিছু না।
তুমি এমন শক্ত হয়ে যাচ্ছ কেন?
আমি শক্ত হয়ে যাচ্ছি!
হ্যাঁ। তোমার কী হয়েছে?
কিছু না।
এ—ভাবে কেউ দাঁড়ায়। এসো, বসবে।
সোমাকে ও খাটের দিকে ধরে ধরে নিয়ে গেল।—কী হয়েছে?
কিছু না।
ঠিক করে বল!
কিছু না।
তুমিও শেষে এমন করলে আমি কী করি!
আমি কী করেছি!
তুমি আয়নায় এসো, চোখ দেখবে।
আমার চোখ, কী!
চোখ ঘুরছে না!
কী যে বল!
সত্যি। একেবারে স্থির।
এটা হয়েছে বুঝি!
অ মাই গড। আমি কী করব।—অসিত, অসিত, সে জোরে চিৎকার করে উঠল ফোনে।
এই সকালে! কী হয়েছে?
শিগগির আয় ভাই!
অ্যাকসিডেন্ট!
না, তার চেয়েও বেশি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে ডাকল, মনোরমা, চিৎকার করে উঠল, মনোরমা! মনোরমা এলে দেখল, কেমন স্থির চোখে শুয়ে আছে দিদিমণি। চোখ দেখেই টের পেয়েছে, ভীষণ ভয় পেলে মানুষের এমন হয়ে থাকে। সে তাড়াতাড়ি এক গেলাস জল এনে, চোখে পরপর ঝাপটা দিতেই কেমন, চোখ ঘুরতে থাকল। সোমা দেখল পাশে দাঁড়িয়ে আছে মনীষ। সে কেমন বোকার মতো বলল, আমার কী হয়েছিল, চোখে জলের ঝাপটা দিলে কেন!
মনীষ বলল, শুয়ে থাক। উঠতে হবে না। কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি তো শুয়ে থাকব কেন! জোর করে শুইয়ে রাখতে চাও?
না, জোর করে না। তোমার শরীরটা ভালো না। তোমার বিশ্রামের দরকার।
সে হবে। সারাদিনই তো তার জন্য আছে। রাত্রিটা আছে। আমাকে একবার বের হতে হবে।
সোমা উঠে বসল।
প্লিজ সোমা। আমার কথা রাখো।
আমাকে এক্ষুনি একটু বিনুর কাছে যেতে হবে।
লোক পাঠাচ্ছি বিনুর কাছে। ওকে নিয়ে আসুক।
শুধু বিনুর কাছে গেলেই হবে না। অন্য অনেক জায়গায় যেতে হবে। আমার অনেক কাজ মনীষ।
সোমা!
সত্যি বলছি। তুমি ভাববে না।
তোমার চোখ কোথায় চলে গেছে!
সে তোমারও।
আমার আবার ঠিক হয়ে যাবে।
আমারও।
সোমা, অসিতকে অন্তত আসতে দাও।
কিন্তু ততক্ষণে বিনু যদি বের হয়ে যায়।
বিনুকে বাড়ি থাকতে বলে পাঠাচ্ছি।
সোমা বুঝতে পারল, অসিত না আসা পর্যন্ত সে বের হতে পারছে না। ঘরের দামি আসবাবপত্রের মতো আর সোমাকে মনে হচ্ছে না। কেন যে এক রাতেই শ্রীহীন হয়ে গেছে। সে যে রসুলকে নিয়ে শেষ রাতের দিকে মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছে, মনীষ জানে না। জানলে আরও ঘাবড়ে যাবে।
আর মনীষ পাশের একটা ডিভানে বসে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। রাতের পোশাক এখনও শরীরে। অসিত আসার আগে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অসিত না এলেও কোনো ক্ষতি নেই। যে—ভাবে সোমা এখন স্বাভাবিক, তাতে অসিত হয়তো এসে বলতে পারে, আমাকে তুই কী এপ্রিল ফুল করলি। এখন সে এলে কী যে বলবে! তবু ওর মনে হল সব খুলে বলাই ঠিক। অঞ্জনের কথা সে খুলে বলবে। সারারাত সে কাল ঘুমিয়েছে বলবে, তারপরই মনে হল, না ঘুম ঠিক হয়নি, কেমন তন্দ্রার মতো, যেন অসাড় অবশ, শুধু শুয়ে থাকা চোখ বুজে, চারপাশে কী হচ্ছে সব সে বুঝতে পারে, কেবল কথা বলতে পারে না, চোখ খুলতে পারে না, এবং এক সময় মনে হল শেষ রাতের দিকে সোমা নিচে নেমে গিয়েছিল, কেমন সে অনায়াসে এ—সব মনে করতে পারে, একটু মনের ভিতর ডুবে গেলেই যেন, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘুমের ভিতর এই বাড়িতে কী হয়েছে, কটা কীটপতঙ্গ ডেকেছে, একটা বেড়াল কখন ম্যাউ ম্যাউ করে গেছে সে সব বলতে পারে এবং এমন ভাবলেই কেমন সোমার জন্য এসব হচ্ছে টের পায়। কী দরকার ছিল, সেই লোকটার দিকে তাকানো, সে লোকটা কে! সোমা কি শেষ পর্যন্ত মনে করতে পারছে, সে কে? কোথায় তাকে দেখেছে!
মনীষ বাথরুম থেকে ফিরে ভাবল, সোমাকে বলবে, সোমা, তুমি চিনতে পারলে তাকে। কিন্তু সোমা এই অবসরে, ভীষণ সেজেছে। ওর নখে সাদা নেল পালিশ। বোধহয় সকালেই সেসব পোশাক পালটে কী পরবে ঠিক করে রেখেছিল। সে মুখ গালে এমন রঙ মেখেছে যে একসময় মনে হল মনীষ নিজেই হেসে দেবে। সোমা এমনিতেই ভারি সুন্দর, তাকালে মনে হয় সে সব দেখে ফেলছে মানুষের। মানুষেরা তাকালে মনে হবে, এক নদী বয়ে যায়। নিরন্তর গাছপালার ভিতরে সেই নদীর নীল জল ভারি গভীর। তবু এমন সাদা কেন। সেই যে মানুষটা, সে কী জেনেছে, সোমার এই ভারি চোখ, অথবা স্পষ্ট বাহু, এবং নাভিমূলে যে আশ্চর্য নীল জলের খেলা সব তার চেনা। নতুন কিছু সোমা তাকে দিতে পারে না। দিতে না পারলেই যা হয়, জ্বালা, ভিতরে জ্বালা কী যে মনে হয় নিজেকে, যেন সংকোচের শেষ নেই, নানাভাবে সেজেও মনে হয় ঠিক সাজা হল না, হয়তো সে দেখে তার দিকে তাকাবেই না। মনীষ বলল, এই সাত সকালে এমনভাবে সানফ্লাওয়ারের মতো ফুটে থাকলে!
