সোমা বলল, সত্যি।
মনীষ পাশে গিয়ে বলল, ভীষণ খারাপ লাগছে।
ভীষণ খারাপ লাগছে কেন!
আর একটু হলে হেসে দিতাম। বলেই সে ঠোঁটে চুমু খেল। লক্ষ্মী মেয়ে, অসিত আসছে। মুখের রঙ ধুয়ে ফেল, তোমার নিজের এমন সুন্দর রঙ থাকতে কেন যে ছাইপাঁশ মাখা বুঝি না। ভীষণ ভালো তুমি। তুমি পরিষ্কার হয়ে এসে বোসো।
আর তখনই মনে হল কেউ উঠে আসছে। নিচে কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মনীষ বাইরে বের হয়ে সিঁড়ির মুখে দাঁড়াল। সিঁড়ির মুখে পার্লারে বসাল অসিতকে এবং তারপর ডেকে যখন সাড়া পেল সোমার, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে, সোমা এল সাধারণ বেশে। সোমাকে মনীষের আবার সুন্দর লাগছিল। আসলে সোমার চারপাশে থাকে বর্ণময় এক গন্ধ। ছুঁয়ে দিতে পারলেই যেন লাভ, কী যে মিহি শরীর, অথচ কী দেখে এমন হয়ে গেল! এবং মনীষ অসিতকে সকালের ঘটনা বলে কী ভাবল, তারপর সোমাকে ছেড়ে দিল। সিঁড়ি ধরে নামার সময় অসিত বলল, হিস্টিরিয়ার মতো কিছু একটা হচ্ছে।
তুই একবার ডাক্তার অমিতাভ চৌধুরীকে দেখাতে পারিস। মন—টনের ব্যাপারটা তিনি ভালো বোঝেন। বলেই বলল, তুই কেমন আছিস?
ভালো।
আর চিঠি এল?
না।
সব বাজে। আজকাল অনেক উড়ো চিঠি আসছে। তবে সময় খারাপ। বড় খারাপ। সে তারপর বলল, যাই হোক, সাবধানে থাকিস। আর নামতে নামতেই যেন মনে পড়ে গেল। বলল, সোমা লোকটাকে চিনতে পারল?
না।
কিছু বলছে না?
কী বলবে। সকালে মূর্ছা যাবার আগে কিছু একটা নিশ্চয় দেখেছিল।
সেটা কী?
আমি জানি না।
তুই জানিস না মানে! তুই তখন কোথায় ছিলি?
ঘরেই।
তবে?
আমি কী করে বুঝব, দাঁড়িয়ে সোমা মূর্ছা যেতে পারে। কী করে বুঝব বাজ—পড়া মানুষের মতো সোমা দাঁড়িয়ে আছে।
দেখে বুঝতে পারিসনি?
সকাল বেলাতে রোদ আসার আগে ওর তো অভ্যাস, জানালায় দাঁড়ানো। আজও তেমনি দাঁড়িয়ে আছে ভাবলাম। ঘুম থেকে উঠেই ভাবলাম, একবার শান্তিবাবুর কাছে যাব। তারপর যাব সমরজিতের কাছে। ফোনে এ—সব কথা হয় না। গরজ আমার, নিজেই যাব ভাবছি।
ওরা গাড়ি বারান্দায় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। পাশে একটু দূরে ড্রাইভার। মনীষ আস্তে আস্তে মুখোমুখি কথা বলছে। অসিত সময় দিয়ে শুনছে। যেন কেউ শুনতে না পায়, শুনলে আবার দুকান হবে, সে সন্তর্পণে বলছে, শান্তিবাবুদের নাকি একটা লিস্ট টানিয়ে দিয়েছে!
কীসের লিস্ট?
কীসের লিস্ট আবার। লাল কালির লিস্ট।
কে কে আছেন?
প্রায় একুশ জনের নাম আছে।
—সবাই অধ্যাপক!
সবাই। কেউ আরও উঁচুতে।
এইসব নিরীহ মানুষদের মেরে কী হবে!
জানি না।
তুই এখন ওখানে যাবি?
না গিয়ে উপায়! এখন কাউকে কিছু বিশ্বাস করে বলাও যায় না। কে যে কার লোক! আর জানিস সবসময় ভয় হয়, কেউ আমাকে ফলো করছে।
অসিত কিছু বলতে পারল না। কারণ সে সঠিক বলতে পারবে না কী ঘটনা। সে শুধু সাবধান করে দিতে পারে। সে আর বলতে পারে না, শুধু মিথ্যা ভয় দেখানো। বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হয়তো শান্তিবাবুরা যাবেন। ওদের তিন মাসের সময় দেওয়া হয়েছে।
অসিত একটু ভেবে বলল, তোকে কোনো সময় দেয়নি?
না।
পুলিশে চিঠিটা দিয়ে দে।
কী হবে! ওরা তো তবে আরও ক্ষেপে যাবে। আমি চেষ্টা করছি ভালো হবার। যারাই পুলিশে কেস দিয়েছে কেউ বাঁচেনি। ওদের ভিতরও লোক আছে। তাছাড়া ওরা নিজেরাই তো নিজেদের রক্ষা করতে পারছে না।
চেষ্টা করছিস?
কী করব! ভেবেছি আজই গিয়ে সব চর্বিটর্বি নষ্ট করে দিতে বলব। মিনারেল অয়েল আর ব্যবহার করতে বারণ করব। তারপর কপালে যা হয়। মুশকিল কী জিনিস, ঠিক মাপ দিলে দামে পড়তা আসে না। এত লোক কাজ করে, ওদের পয়সা তবে দেব কোত্থেকে!
অসিত বলল, হ্যাঁ ভাববার কথা।
—ভাববার কথা না! কেউ এখন প্রকৃতিস্থ নেই। কেন যে এমন হল!
অসিত বলতে পারত, আমরা নানাভাবে অধার্মিক হয়ে গেছি। তবে এভাবে কী এর সমাধান! এটাও সে ভাবল। সুতরাং মনীষকে সে কিছু বলতে পারল না। কিছু বলতে না পারলে যা হয়, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, ওরা চুপচাপ কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে যখন বুঝল আর কোনো এখন কথা হতে পারে না, তখন অসিত গাড়িতে বসে বলল, যা ওপরে যা।
অসিত চলে গেলে সে কেমন একা হয়ে গেল। রসুল এখন থাকে না, রাম অবতারের বোধহয় গেটে ডিউটি। কিন্তু সে এত সতর্ক থেকেও কেমন অসহায় বোধ করছে। সে এটা কাউকে বুঝতে দেয় না। সে যেমন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে থাকে তেমনি করার চেষ্টা করছে। এবং এটা যে হচ্ছে, ওর ধারণা, রসুল মনোরমা আর অসিত বাদে পৃথিবীর আর কেউ জানে না। সে ভাবল, কোনোরকমে গাড়ি করে অপরিচিত জায়গায় চলে যেতে পারলে এতটা ভয় থাকবে না। কারণ ওর মনে হচ্ছে, এই বাড়ির যেখানে সে থাকুক না, ওরা ঠিক টের পেয়ে যায়। যেন ওরা চারপাশে ওর সতর্ক নজর রেখেছে, সে কী করছে। সে আর মুহূর্ত দেরি করল না। লাফিয়ে কাঠের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে গিয়ে দেখল, সোমা খুব সাধারণ পোশাকে নেমে যাচ্ছে। মনীষকে বলার পর্যন্ত সময় দিল না, যেন কতকটা সে পালিয়ে চলে যাচ্ছে।
মনীষ এবার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ডাকল, সোমা।
নিচ থেকে সোমা বলল, বিনুর কাছে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হলে ভাববে না।
সোমা গ্যারেজের ভিতর ঢুকে গেল। গাড়ি বের করার শব্দ হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো গাড়িটা নিয়ে বের হচ্ছে। বের না হলেই যেন খারাপ হত। সে ব্যালকনিতেই দাঁড়িয়ে থাকল। সকালের কাগজে কী আছে আজ, বাড়িতে সবাই ওকে কাগজ পড়তে দিচ্ছে না। নিশ্চয়ই সোমা কাগজ লুকিয়ে রেখে গেছে। আজকে কী ঘটেছে, অথবা এ—ভাবে অকারণ হত্যা, অথবা কোথাও কি মানুষ রুখে দাঁড়াচ্ছে না, এমন খবর কি কোথাও নেই—সে কেবল তেমন একটা খবরই দেখতে চায়। চারপাশের জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে না, এ—ভাবে একজন সাধারণ পুলিশ, সাধারণ সুদখোরের জীবন নিয়ে কী যে হচ্ছে, অথবা ওর কথাই ধরা যাক না, সে তো সবই নিজে নিয়ে নিচ্ছে না, সবই তো যারা কাজ করে তাদের জন্য, তা বলে একটা লাভের অঙ্ক থাকবে না, ক্যাপিটেল তৈরি হবে কী করে, ক্যাপিটেল তৈরি না হলে নতুন নতুন কারখানা হবে কী করে, বেশি লোক কাজ পাবে কী করে।
