সোমা নানাভাবে ভাবছিল, সে কেন গেল, অথবা সেই মাঠে কে আসে, গাড়ি বারান্দায় কে দাঁড়িয়েছিল, যে কেউ আসতে পারে—যা সময়, কোনো নাইট কী আবার অলক্ষ্যে এমন একটা বাড়ির ভিতর পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। সে এমন ভেবেই নিজের মনে হেসে দিল। কীসব আজেবাজে চিন্তা। আসলে মনীষই দাঁড়িয়েছিল। হয়তো মনোরমার মুখে শুনেছে, রসুলকে নিয়ে দিদিমণি কোথায় বের হয়ে গেল, গাড়ি নেয়নি। পাশাপাশি ওর কোনো বান্ধবীর কাছে, বিপদের কথা জানাতে যেতে পারে, অথবা ওর মায়ের কাছে, সে ঘুমিয়েছিল বলে সোমা ডাকেনি। এবং এ—সব ভাবতে ভাবতে সে একসময় মনোরমাকে বলল, দাদাবাবু কখন জেগেছে রে!
উনি তো জাগেননি। সেই থেকে ঘুমোচ্ছে।
মানে!
ঘুমোচ্ছে। আমার ঘুম এল না। আপনার জন্য ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
তুই জানিস না?
কি জানি না?
ও উঠেছে। গাড়ি বারান্দায় ছাদে দাঁড়িয়েছিল!
কখন!
এক্ষুনি। ভিতরে ঢোকাবার সময় দেখলাম।
কী বলছেন দিদিমণি!
সোমা ভিতরে ঢুকে অবাক। মনীষ শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে। ঘুমের ওষুধ ভীষণ কাজ দিয়েছে। সে, কী দেখল তবে! ওর মনে হল, মনীষই দাঁড়িয়েছিল, ওকে ঢুকতে দেখে ফের এসে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান করছে। সে এবার পাশে বসল। মাথায় ওর হাত রাখল। ওর চুল ঘন। এবং নুয়ে যখন দেখল, না এটা অভিনয়ের মুখ নয়, সত্যি সত্যি ঘুমোচ্ছে, তখন কেমন সে গুম হয়ে গেল।
মনোরমা বলল, লোকটা কেমন দেখতে?
মনোরমার এত উৎসাহ সোমার ভালো লাগছিল না। সেতো মনোরমাকে জানে। সে বলেই ভুল করেছে। এখন মনোরমা কথায় কথায় এটা কতদূর যে নিয়ে যাবে!
সোমা ধমকের সুরে বলল, চুপ করতো! কিছু ভালো লাগছে না।
তাতো ভালো না লাগবারই কথা দিদিমণি! কী যে হবে! ঐ তো শুনলাম, মাঠের ধারে দুজন ছেলেকে কারা মেরে ফেলে গেছে!
কবে?
কবে আবার, দু তিনদিন আগে।
সোমা বলল, তাতে তোমার কী?
বা আমাদের কিছু নয়। যখন তখন যাকে তাকে মেরে ফেলবে! বিচার নেই!
সোমা আর কথা বাড়াল না। সে ভাবল বলে দেবে, তুমি বাপু আমাদের কথা দু কান করবে না। তোমার যা স্বভাব। তুমি এ—সব কথা দু কান করলেই দাদাবাবুর কানে উঠবে। মানুষটা ভয়ে এমনিতে ঘুমোতে পারছে না, আর এ—সব শুনলে একটা ফ্যাসাদ হয়ে যাবে। সোমা এবার খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, কী দেখতে কী দেখেছি!
তা বলে কী একটা ভালো মানুষ খুন হয়!
হয় না?
কী করে হয়। আঁধারেও যে দিদিমণি বেড়ালকে বেড়ালই মনে হয়।
তুই চালাক বলে মনে হয়। তোর মতো সবাই অত চালাক নাও হতে পারে।
মনে হল না, মনোরমা খুব একটা বিশ্বাস করছে। ওর ধারণা, যা দিনকাল, যেভাবে চিঠি দিয়ে গেছে, ঠিক একটা কিছু হবে। এবং কারও ক্ষমতা নেই দাদাবাবুকে রক্ষা করতে পারে। এই যে চারপাশে এখন এত নিরাপত্তা, দাদাবাবুর বালিশের নিচে কী একটা থাকে, কিন্তু দাদাবাবু জানে না, ওরা এমন লোক যে, কী করে কখন মনোরমাকেই ফুসলে ফাসলে হাত করে ফেলবে, এবং দাদাবাবু তখন দেখবে, ওর সামনে মনোরমা বীরাঙ্গনা হয়ে গেছে। ওরা কীভাবে কী করবে কেউ বলতে পারে না, আর তখন কী না দিদিমণি সব উড়িয়ে দিচ্ছে!
সোমা দেখল, মনোরমা নিচে নেমে গেল। ঠিক নেমে গেল, না, এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে কিছু খুঁজছে বোঝা গেল না।
আর সোমা নিজেও অবাক, কেমন নিশ্চিন্তে, বসে রয়েছে। ঘুরে ফিরে দেখা দরকার। ওটা মানুষ, না তার ছায়া, না কোনো মরীচিকা, অথবা চোখের ভুল, সে যে কী করবে এখন বুঝতে পারছে না। কেবল নিচে নেমে রসুলকে ডেকে পাঠাল। রসুল এলে বলল, কেউ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে?
নাতো।
খুঁজে দ্যাখ তো। মনে হয় কেউ দাঁড়িয়েছিল। ওর কানে যেন কথাটা না ওঠে।
কখন দেখলেন?
যখন ঢুকলাম।
কোথায়?
গাড়ি বারান্দার ছাদে। রসুল আর সোমা যেতে যেতে কথা বলছিল। সকাল হয়ে গেছে। এখন ঘরের দরজা জানালা খুলে দেওয়া যায়। রোদ আসবে। অথবা শীতের বাতাস বয়ে গেলে ফুল ফুটে থাকার কথা, কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। সব ফাঁকা।
আমি তো কিছু দেখলাম না।
হয়তো লক্ষ্য করনি।
দাদাবাবুর ঘর থেকে আলো এসে পড়ছিল।
তা আলো আর মানুষ কখনও এক হয় রসুল!
তা অবশ্য হয় না।
ওরা এ—ভাবে বাগানের ভিতর ঢুকে গেল। বাগানটা খুব বড় নয়। ছোট। জ্যোৎস্নারাতে বড় ইউকালিপটাস গাছের নিচে মাঝরাতে দুজনে ওরা কত যে চুপচাপ বসে থেকেছে! চারপাশে উঁচু পাঁচিল। মাধবীলতার ছায়া কোথাও ঘন। লালবর্ণের গোলাপ কোথাও ফুটে আছে। শীতে গোলাপের পাপড়ি ভারী হয়। কুয়াশার জলে পাপড়িগুলো কেমন কুমারী মেয়ের মতো পবিত্র থাকে। সে দেখল, না, কোথাও সে নেই। সেই গাড়ি বারান্দার কাছে যে মানুষটা দাঁড়িয়েছিল, কেমন ভোজবাজির মতো বাড়ি থেকে উধাও। সোমার ভীষণ শীত করছে। ভিতরে ওর ভয় আদৌ ছিল না। অথচ সে নিজেই কেমন তখন শীতকাতুরে ভীতু মুখ করে ওপরে উঠে গেল। জানালায় রোদ এলে দাঁড়িয়ে থাকল। একটু পরেই কাগজ আসবে। রেডিয়ো ভয়ে খোলা হয় না। কাগজটাও আজ থেকে লুকিয়ে রাখতে হবে। সে কাগজটা না খুলেই ভাবল, ক উইকেট ডাউন?
সে জবাব দিল, একটাও না। ঈশ্বর, যেন একটিও না হয়।
কিন্তু খুলে দেখল, বহরমপুরে তিন, ডেবরাতে চার, কলকাতা এবং তার চারপাশে চোদ্দ। সে কাগজটা বন্ধ করতে গিয়েও পারল না। একটা ছবি ছাপা হয়েছে। ওকে পুলিশ খুঁজছে। ছবিটায় চোখ দুটো, কফি—হাউসের চোখ দুটো আরও কী যেন…সে বোধহয় ফের সংজ্ঞা হারাত। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি জানালা ধরে ফেলল।
দশ
বাড়িটা কেমন নিঝুম লাগছে। মনীষ ঘুম ভেঙে গেলে দেখল, জানালায় চুপচাপ সোমা দাঁড়িয়ে আছে। কী দেখছে যেন। অপলক। ঘুম ভাঙলে শরীরে ভীষণ জড়তা থাকে। এবং চিঠি পাবার পর থেকে জড়তা কেমন ভীষণ বেড়ে গেছে, উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না। সবকিছু ফাঁকা, নিরিবিলি, এ—ভাবে বেঁচে থাকার মানে হয় না, এবং কেমন সবকিছুর ওপর বিদ্রোহ করতে ইচ্ছা হয়, দেশের মানুষ, পুলিশ, সরকার সবকিছুর ওপর। সাংঘাতিক সাংঘাতিক ঘটনা, এবং সে নিজের গলায় হাত দিল। আর এ—ভাবেই বোধহয় মনে পড়ে যায়, কী কী ঘটেছে, কীভাবে সব হত্যা, অর্থাৎ কীভাবে সব মানুষের গলা কেটে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কিছু করতে পারছে না। দিনদুপুরে হাজার মানুষ যাচ্ছে, তার ভিতর তিনজন ওরা অথবা চারজন, সবাইকে বলছে সরে যান, আমরা এর গলা কেটে দেব। আর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের জানালা দরজা বন্ধ, রাস্তা ফাঁকা। যে যার মতো পড়িমরি ছুটছে। ভাবলেই চোখমুখ ঘোলা ঘোলা হয়ে যায়। চিঠির কথা মনে হয়। কথা আছে ওরা আসবে। ওরা আসবে কথা থাকলে আসেই।
