সোমা বলল, একটা কথা তুমি আমার হয়ে ওকে বলবে?
কি কথা মা—জননী?
ওর নাম অঞ্জন কিনা জানবে তো!
আমি তো কারো নাম জিজ্ঞাসা করি না মা—জননী।
কেন কর না?
নাম মানুষের একটাই থাকে।
সে আবার কেমন?
নাম মানুষের দুটো হয় না।
সে কেমন?
না মানে সে মানুষ, আর কিছু নয়।
তাকে তুমি নাম জিজ্ঞাসা করেছিলে কোনোদিন?
না।
তবে একবার বলতে আপত্তি কী?
আপনি মা—জননী, ওর নাম বললেই কী চিনবেন?
চিনব না কেন? অঞ্জন বলে কেউ আছে কিনা জানতে চাই।
কেন আপনার এমন জানতে ইচ্ছা হয় মা—জননী?
সে যে আমাকে খুঁজছে।
সে না আপনি?
সে একই কথা।
আচ্ছা এবার দেখা হলে বলব।
বলবে কিন্তু। সোমা উঠে দাঁড়াল।
আপনি আবার কবে আসবেন?
আসব।
আসার সময় কিছু খড়কুটো নিয়ে আসবেন। ওর অনেক কাজ। কিছু কাজ আপনি করে দিলে, সে বেশি আমাদের জন্য সময় পাবে।
বুড়ো লোকটার কথা খুব স্পষ্ট নয়। সোমা সব না বুঝলেও মোটামুটি কথাবার্তা বলে বুঝেছে, এখানে কেউ আসে। বুড়ো লোকটা নিজের সম্পর্কে কিছু বলেনি। সে বুড়োমানুষ এই পর্যন্ত বলেছে। না বললেও কোনো ক্ষতি ছিল না, বুড়ো মানুষের রকমফের আছে, তার যেন তাও নেই। সে একেবারেই বুড়ো। বুড়ো হলে যা হয়। শীত করে, মানুষের অবহেলা তখন বাড়ে। বুড়ো হলেই নদীর পাড়ে বসে থাকতে হয়। কেউ আসবে কথা থাকে।
বুড়ো মানুষটা তাকে এসব বলতে পারত। কিন্তু সে তা না বলে, কিছু খড়কুটো আনতে বলছে! খড়কুটো আনলে লোকটা আরও বেশি কাজ করার সময় পাবে।
সোমা কেমন ঝোঁকের মাথায় হাঁটছে। এই বড় শহরের মাঠে, রাত শেষ হতে থাকলে একটা আশ্চর্য নিঃসঙ্গতা দেখা দেয়। সোমা দেখতে পাচ্ছে, ঘাসের জলে ওর চটি ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। এবং ওপরের নক্ষত্রেরা একে একে আকাশ থেকে কেমন ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল। ওরা ক্রমে সেই অবলুপ্তির পথে, সোমা বোধহয় টের পাচ্ছে অজস্র শিশিরকণা হয়ে এইসব ঘাসে ঘাসে অথবা কোনো কুটিরের মাথায় ঝরে পড়ছে। কুটিরে কী অঞ্জন থাকে!
এই যে এক কথা, অঞ্জন, অঞ্জন, কে সে? কেন সে মনে করতে পারছে না, কে আসে এই মাঠে, সেই মানুষটা কী আসে, অথবা সে কী জানে, কাছাকাছি জায়গায় সোমা থাকে, সে কী কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সোমাকে দেখতে ভালোবাসে।
আবার মনে হয় অকারণ খোঁজা। এত রাতে ও—ভাবে ওর বের হয়ে আসা উচিত হয়নি। মাথা ঠিকঠাক আছে তো! কেমন সে নিজের কাছেই বোকা হয়ে গেল, সে এটা কী করছে! গোপনে এ—ভাবে চলে আসা ঠিক হয়নি! ছিঃ মনীষ জেগে গেলে কী ভাববে। মাঝে মাঝে এ—জন্য মনে হয় মাথার ভিতরটা কেমন করছে। কেন যে সে কফি—হাউসে মরতে গিয়েছিল।
একটু পা চালিয়ে হেঁটে গেল। সে এখন দেখতে পাচ্ছে, দুটো একটা শেষ রাতের ট্রাম বড় শহরের ওপর দিয়ে কেমন মায়াবী হরিণের মতো চলে যাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে অজস্র ঠান্ডায়, এক শীতকাতুরে বুড়ো তখনও একটু একটু করে আগুন জ্বেলে যাচ্ছে বাঁচবে বলে। আর সেই সব মহামহিম নাইটগণ পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে।
ওরা টের পেয়েছে, এরা থাকলে, পৃথিবীতে পাপ বেড়ে যায়। মধ্য রাতে ওরা চলে আসে। অথবা দুপুরে, কোনো শিমুল গাছে ফুল ফুটলে বোঝা যায় সকালে সেই মহামহিম নাইটগণ, গাছের নিচে আগুন জ্বেলেছিল, এবং এ—পথেই তারা পাপ অন্বেষণে চলে গেছে।
এ—সব যে কেন মনে হয় সোমার। সে দেখল, একটু দূরে রসুল। সে পরেছিল খাকি শার্ট। ওর পায়ে বুট জুতো, এবং সে প্রায় সিপাইর মতো মুখে একটা হামবড়া ভাব নিয়ে হাঁটছে। সে আছে, ভয় নেই, কার এমন হিম্মত আছে, কী যে বিশ্বাসী মুখ রসুলের। ওর বয়স খুব বেশি নয়, চল্লিশও বোধ হয় হয়নি, ওর কী মনে হয় না সোমার শরীরে তাপ আছে, ওর কী বিশ্বাস হয় না, সোমার অনেক কিছু ইচ্ছা হয়। এমন একা মাঠে মানুষ এত বিশ্বাসী থাকে কী করে! এবং এসব মনে হলেই সে বুঝতে পারে পৃথিবীতে কিছু—না—কিছু সবাই ভালো কাজ করতে চায়। সবার লোভ একরকমের না। মনীষ কেন যে এমন হয় না, অথবা অঞ্জন কে! সে যে কেন মূর্ছা গেল!
সদরে এসে মনে হল, গাড়ি বারান্দার ওপরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এখন কাক জ্যোৎস্না। চারপাশের আলো নেভানো। কেবল সদরে আলো জ্বালা থাকে, মনে হল তার মনীষ হয়তো জেগে গেছে। জেগে গিয়ে বিছানায় দেখতে না পেলে ভেবে থাকে, বাথরুমে গেছে। অবশ্য সে খুব কুঁড়ে লোক, বিছানা থেকে উঠে দেখার ইচ্ছা হয় না ভিতর থেকে দরজা বন্ধ আছে কিনা, এটা ওর স্বভাব, শুয়ে শুয়ে সব ভেবে ফেলবে, এবং আবার ঘুমোবার চেষ্টা করবে।
কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় সে দেখল মনোরমা দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় উঠে এলেই মনোরমা আলো জ্বেলে দিল। আলো না জ্বাললেও হয়তো হত। সে ঠিক উঠে যেতে পারত। চারপাশে সকাল হবার আগে যেমন রোজ পাখিরা ডাকে, কীটপতঙ্গের আওয়াজ পাওয়া যায়, এবং যা শুনলে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবা যায় সকাল হয়ে যাচ্ছে, তেমনি সব শব্দ, বাগানে, আতাফল গাছটার পাশে এবং মনে হয় সকাল হবে বলেই মনীষ হয়তো গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আর তারপরই যা মনে হল, এটা শীতকাল, শীতকালের এমন ঠান্ডায় মনীষ কিছুতেই গাড়ি বারান্দায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ওর ভিতরটা এমন মনে হতেই কেমন কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল, তারপর আর যা সে ভাবতে পারে, হয়তো সে লক্ষ্য রাখছে, কোথায় যায় সোমা, কখন আসে, এবং অলক্ষ্যে এসব হলেই চেপে যাবার কথা।
