সব সে মনে করতে পারে না। এই শীতের রাতেও সে কেমন শীত অনুভব করছে না। মাথার ওপর বড় আকাশ আর অজস্র নক্ষত্র, সব রাস্তার আলো এসে মাঠে পড়েছে। এখানে পাশাপাশি সব বড় বড় গাছ, পাশেই একটা বড় হাসপাতাল। দুটো একটা অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে। যার কিছু দূর হেঁটে গেলে দুর্গের র্যামপার্ট। সে সেদিকে গেল না। সে গাছের ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে গেল। আগুনের দিকে হেঁটে গেল। ওখানে হয়তো সে আছে। সে কে? সে অঞ্জন! অঞ্জন বলে কে আছে তার! কাল একবার বিনয়ের কাছে যেতে হবে, বিনয় যদি বলতে পারে, কলেজ—জীবনে অঞ্জন বলে কোনো বন্ধু যদি থেকে থাকে। সে এমন একটা নাম শুনে মূর্ছা গেল! ভাবতে পারছে না এমন কেন হল! সহসা কী হল মনের ভিতর অঞ্জন বলে কোনো যুবক অথবা কিশোর অথবা বালকের মুখ আবিষ্কার করে ফেলেছিল, যে ছিল তার কাছে রাজার মতো। ওর মা এবং বাবাকে যা কিছুর বিনিময়ে ছোট হতে হয়েছে, সব কিছুর বদলা নেবার মতো এক মানুষ সে। সে শিশু বয়সে, কিংবা আরও বড় হয়ে বুঝতে পারত, ওর এমন একজন মানুষের দরকার যে মধ্যরাতে নাইটদের মতো পাপ অন্বেষণ করে বেড়াবে, সেই যে লোকটা, দুটো চোখ যার শয়তানের মতো ঘোরাফেরা করত, এবং মাকে দেখলেই চোখ দুটো জ্বলে উঠত, তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অনিবার্যতা ভাবলে সে স্থির থাকতে পারত না। সোমা ভাবত, একদিন—না—একদিন সে আসবেই।
কিন্তু সোমা সেই আগুনের পাশে গেলে দেখল, মাত্র একজন বুড়ো মতো লোক বসে আছে। শীতে হাত পা চোখ সাদা হয়ে গেছে। পাশে নানারকমের পোঁটলা—পুঁটলি, ভাঙা টিনের বাক্স, মগ, পুরনো টিনের কৌটা, সে বেশ এই নিয়ে আগুন পোয়াচ্ছে। এমন একজন দেবীর মতো সহসা মানুষের ছবি দেখে, চোখের পলক ফেলতে পারল না। হয়তো বনদেবী—টেবি হবে, অথবা এই মহানগরীর দেবী, যে রাতে বুড়ো মানুষটার কষ্টের কথা ভেবে না—এসে থাকতে পারেনি। সে বলল, মা—জননী!
সোমা বলল, খুব শীত না!
খুব মা—জননী।
কোথায় থাক?
এই ফুটপাতে মা—জননী।
তোমার কষ্ট হয় না?
কষ্ট! ওর মুখ এত ছোট, আর এত রেখা মুখে এবং এত বেশি শীর্ণ যে বোঝাই যায় না, কষ্টের কথা শুনে হাসছে, কী অবাক হচ্ছে, অথবা কষ্টের কথা শুনে কেঁদে ফেলছে। দাঁত না থাকলে বোধহয় মানুষের মুখ শিশুর মতো হয়ে যায়। সোমা পাশে বসে দুটো একটা পাতা আগুনে ফেলে দিতে থাকল।
তোমার নাম কী?
আমার নাম! ভুলে গেছি!
ভুলে গেছ মানে!
বিশ—বছরের ওপর মা জননী, আমার কী নাম কেউ জিজ্ঞেস করে না। কেউ ডাকে না আমার নামে। আমি যে কী এখন জানি না।
সোমা ওর কথা সব বুঝতে পারছে না, কথা বললে থুথু ছড়াচ্ছে।
সোমা সামান্য সরে বসল। আগুন জ্বলছে, এবং এমন একটা নিরিবিলি মাঠে, কেউ শেষ রাতে ঘুমোতে না পেরে আগুন জ্বেলে জ্বেলে বসে থাকবে ভাবা যায় না। এবং এ—ভাবে দূরে দূরে সে দেখল পর পর গাছের নীচে আগুন, অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, সব মশালের আগুন, ধীরে ধীরে এত বড় শহরের ধার্মিক নাগরিকদের অজ্ঞাতে এটা জ্বলে উঠছে। সকাল হলে, ট্রাম বাস চললে কেউ টেরই পায় না, গাছের নীচে, অথবা ওদের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে ওরা শীত থেকে বাঁচবার জন্য আগুন জ্বালায়।
সোমা বলল, এখানে আগুন পোহাতে কেউ আসে নি?
বুড়ো লোকটা কি দেখল সোমার চোখে। বলল, দুটি ছোড়া আসত। চোখে—মুখে বদজাতি, ওরা আমার পাতাগুলো একসঙ্গে আগুনে ফেলে দিত। দাউদাউ করে জ্বলেই নিভে যেত আগুন। আবার শীত। আমি এখন লাঠি নিয়ে বসে থাকি। ওরা আসতে সাহস পায় না।
সোমা বলল, তাহলে কেউ আসে না আগুন পোহাতে?
আসে। সে আসে।
সে আসে!
সে আসে। কি নাম জানি না। সন্ধ্যার পর সে আমাকে, কিছু খড়কুটো দিয়ে যায়। কখনও খাবার।
কখন আসে?
ঠিক থাকে না। দুদিন তিনদিনের খড়কুটো দেয়। খাবার পাঠিয়ে দেয় কখনও। সে নিজেও আমার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়।
দেখতে কেমন?
খুব ভাল। চোখ বড় বড়। লম্বা মানুষ, কালো রঙের প্যান্ট পরতে ভালবাসে। সাদা হাফশার্ট।
চোখে কেমন একটা মায়া আছে তার, তাই না?
খুব। সে এলেই আমার আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়!
আজ সে এসেছিল?
এই কিছুক্ষণ আগে সে এসেছিল। সে ডেকে আমাকে উঠতে বলে দিল। শরীরে হাত দিয়ে বুঝেছিল, ঠাণ্ডায় মরে যাব, সে আগুন জ্বেলে বসে থাকতে বলল, শীতে আমার মরে যাবার কথা। আগুন জ্বেলে রাখলে শীতে আমি মরে যাব না। সে এমন বলল।
তুমি ওর নাম জান না?
না।
নাম বলে না?
না।
সোমা কেমন আশ্চর্য হয়ে যায়। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে। সে এক হাতে গায়ের চাদরটা কাঁধে তুলে নিল। এখন মনে হচ্ছে সত্যি ভীষণ হিম ঠাণ্ডা। সে গলায় চাদর জড়িয়ে দিল। হাত পা ওরও যেন ক্রমে অবশ হয়ে যাবে, শীতে খোলা আকাশের নীচে বসে থাকলে এমন হবারই কথা। সাদা জ্যোৎস্না ক্রমে মরে আসছে। বোধহয় নদীতে একটা জাহাজ নোঙর তুলে তখন সমুদ্রে যাবে বলে সিটি দিচ্ছে। এবং দূরে দূরে, এই যেমন নদীর ওপারে সব চটকলের চিমনি থেকেও সাইরেন বাজছে। চারটা বেজেছে। সে ঘড়ি দেখে বুঝল, ঠিক তাই। রসুল কোথায়? সে পিছন ফিরে দেখল, একটু দূরে মাঠের ভিতর রসুল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে আর বসবে না ভাবল, যেন কী একটি সূত্র পেয়ে গেছে, তাকে সে ঠিক খুঁজে পাবে না। না পেলে শান্তি পাবে না, এই সেই লোক হবে, যে কফি—হাউসে অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়েছিল। ওর নাম কি অঞ্জন!
