এভাবে আমরা চললে, ওরা আজ হোক কাল হোক আসবেই। বলে সে সিঁড়ির দরজার কাছে এল। ওর মুখে অদ্ভুত কমনীয়তা। সে ডাক্তার মানুষ। মনীষ শুয়ে আছে। মনোরমা এখানে নেই। রসুল নিচে জেগে আছে। সে সারারাতই জেগে থাকবে। অসিত বলল, ভয় নেই কোনো। কাল এসে সব চেক করে যাব। আমার যা মনে হচ্ছে চিঠি পেয়ে এটা হয়েছে।
অসিত চলে গেলে সোমার মনে হল, এই এক ভয় নিরন্তর এখন কাজ করবে। তবু ওর কেন জানি মনে হল, সে যা চায় তা পায় না। কে সেই মানুষ? ওর বড় ইচ্ছা হচ্ছিল সেই মানুষটাকে দেখবে। সে ভিতরে ঢুকে দেখল মনীষ ঘুমিয়ে পড়েছে। মনীষ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। দামি ইটালিয়ান সিল্ক এবং চোখে কাজল দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল। যেখানে রসুল আছে, সেখানে গেল। সে রসুলকে বলল, চিঠি দিয়ে কোনদিকে গেছে বলতে পারিস?
রসুল সদর খুলে দিল ভালো করে। দিদিমণিকে দেখেই আদাব দিল। বাইরে এসে ঠিক যেখানে অজস্র বোগেনভেলিয়ার গাছ একটা ঝোপের মতো সৃষ্টি করেছে সেখানে দাঁড়াল। ঐ দিকে নেমে গেছে।
ওটা তো মাঠ।
হ্যাঁ, তিনি মাঠের অন্ধকারেই নেমে গেছেন।
ও—মাঠের গাছগুলোর ছায়ায় যারা রাত কাটায় তুই তাদের কাউকে চিনিস?
না দিদিমণি।
আমার সঙ্গে আয়।
এত রাতে!
আয় না।
সদর খোলা থাকবে?
থাকুক।
কিন্তু তিনি যে বলেছেন সারারাত জেগে পাহারা দিতে।
কিচ্ছু হবে না। তুই আয়, আমি বলছি আসতে।
রসুল একটা পাগড়ি বাঁধল মাথায়। সে কোমরে বড় একটা ভোজালি ঝুলিয়ে ওর সঙ্গ নিল।
তিনি যদি রাগ করেন। রসুল কেমন আমতা আমতা করল।
তিনি ঘুমোচ্ছেন।
ওরা সদর খুলে ফের বন্ধ করে দিল। মনীষের অযথা ভয়। যারা আজ চিঠি দিয়ে সাবধান করে যায়, তারা সে রাতে আসে না। শোধরাবার একটা সময় দেয়। সে জানে মনীষ কোনোদিন আর শোধরাবে না। ওর অসুখ করবে। অসুখ নিয়েই সে বড় একটা অসুখের ব্যবসা চালিয়ে যাবে এই দেশে। দেশের মানুষকে সব নেড়ামাথা করে দিয়ে মনীষ নিজে কষ্ট পাবে।
সোমা দেখল গাছের নিচে অন্ধকার, বড় প্রশস্ত পথ। শোরুমে ইতস্তত আলো জ্বলছে। কিছু রাতের পোকা উড়ছিল। দু—একজন মানুষের সাড়া পাচ্ছে সে। সোমা রসুলকে নিয়ে বড় মাঠে ঢুকে গেল। এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বরং ভয়। মাঠে অজস্র গাছ, এবং গাছের নিচে কারা চুপচাপ শীতের রাতে জেগে আছে মনে হল। কাছে গেলে অবাক, দেখলে সব কাতারে কাতারে মানুষ, ওদের পোশাক ময়লা, ছেঁড়া, শুকনো ঘাসের ওপর ছেঁড়া কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। ওরা কী গভীর ঘুম যাচ্ছে! দুঃখ বেদনা আছে মুখে। ফাঁক ফোকরে যে সামান্য আলো বড় রাজপথ থেকে ভেসে আসছে তাতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সকাল হলে এরাই এই বড় শহরে, অথবা রেল—ব্রিজের মাথায়, কখনও সূর্য অস্ত গেলে, বড় লাল বাড়িটার দিকে কেন জানি প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সে রসুলকে বলল, তুই চলে যা। আমি এই মাঠে এক একা ঘুরব। আজ সে আসবে।
রসুল জানে মাথা খারাপ আছে দিদিমণির। সে কাছে থাকলে চিৎকার করতে পারে। বাড়ি গেলে বলতে পারে, রসুল তুমি বিদায় হও। কর্তাসাহেব যতই হামবড়া ভাব দেখান—এই দিদিমণির কাছে একেবারে বাচ্চা শিশুটি। কী যে করে রেখেছে! সে বলল, আচ্ছা যাচ্ছি।
বস্তুত সে গেল না। সে দূরে অস্পষ্ট আলোর ভিতর দাঁড়িয়ে দেখল দিদিমণি একা একা মাঠে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সোমা দেখল বেশ জ্যোৎস্না উঠেছে। শেষ রাত এখন। এখন রাতে এ ভাবে একটা মাঠে পায়চারি করা ঠিক না। কিন্তু সোমা জানে, রসুল পাশে ঠিক কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তাকে পাহারা দিচ্ছে। এবং সে রসুলকে যে—ভাবে জানে, তাতে রসুল সোমার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে যে—কোনো ভাবে। সে বেশ নিশ্চিন্তে হেঁটে যাচ্ছে। কী যে সে খুঁজছে, মাঝে মাঝে ভুলে যায়। আসলে সে তাকেই খুঁজতে এসেছে। যদি সে এই মাঠে নেমে এসে থাকে, তবে ঠিক কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং সোমার জন্য অপেক্ষা করবে। এটা কেন হয়, সে বোঝে না। সেই চোখ দুটো কী যে মায়াবী। হয়তো ওরা সেদিন বাড়ি ফিরে গেলে, সব খোঁজখবর নিয়েছে গোপনে। এবং সে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেখেছে, সদরে রসুল, হয়তো তাকে টপকে যাবার ক্ষমতা মানুষটার নেই। চিঠি দিয়ে চলে গেছে।
মানুষটার সঙ্গে তার খুব দেখা হওয়া দরকার। যেমন সে দেখা হলে বলতে পারত, এটা একটা মানুষের কঠিন অসুখ। সেই প্রথমদিন থেকে, যেদিন থেকে মানুষ দলবদ্ধভাবে বাস করতে শিখল, সেদিন থেকে মানুষের লোভ এ—ভাবে মানুষকে তাড়না করছে। যেটা হাজার হাজার বছরের অসুখ তাকে তুমি কী করে দু দণ্ডের ভিতর আরোগ্য করবে।
আর তখনই দলে দলে মাঠের ভিতর কারা আগুন জ্বেলে দিয়েছে। শেষ রাতে এ—সব মাঠে যারা গাছের নিচে শুয়ে থাকে, শীতে তাদের ঘুম আসে না। ওরা বিকেলে ঘাসপাতা সংগ্রহ করে রাখে। শেষ রাতে যখন হাত পা বরফ হয়ে যায়, শীত নিদারুণভাবে কষ্ট দেয়, এবং মনে হয় মরে যাবে, তখন এরা আগুন জ্বেলে সকালের রোদের জন্য অপেক্ষা করে। সোমার কিন্তু মনে হল, মানুষটা চিঠি দিয়ে বেশিদূর যেতে পারেনি। কারণ মানুষটা তো জানে, এ—বাড়িতে সোমা দত্ত আছে, সে ছিল সোমা গাঙ্গুলি, উদ্বাস্তু মেয়ে সোমা গাঙ্গুলি কী করে যে সোমা দত্ত হয়ে গেল, এবং কিছু ছবি সে মনে করতে পারে, স্মৃতির মতো খেলা করে বেড়ায়, সেই কবে যেন তাকে তার মা কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, বোধহয় এটা বাবার মৃত্যুর পর। সেই লোকটা—কেমন চুপচাপ ভালোমানুষের মুখ করে ওর বড় বৈঠকখানায় বসেছিল, কী সদাশয় মানুষ, বাবার বিনিময়ে লোকটা লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়েছে, সোমার এটা তখন মনে হয়নি, পরে সে সবটা জেনেছে মার কাছ থেকে, এবং মা যখন লোকটার রক্ষিতা হয়ে গেল, বাবা তখন আত্মহত্যা না করে বোধহয় পারেননি।
