হঠাৎ তোমার এমন কেন হল?
মনীষ উপুড় হয়ে আছে। ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেবল ঘামছে। সোমা যে কী করবে বুঝতে পারছে না। সে চোখ মেলে দেখেছিল মনীষ অপলক ওকে দেখছে। ওর গলার কাছে হাত। যেন সোমার গলা টিপে মেরে ফেলবে। সোমারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। মরে যাবে এই ভেবে কষ্ট না। মনীষ তাকে অবিশ্বাস করে অযথা কষ্ট পাচ্ছে এই ভেবে। সে বলল, মনীষ, আমি তোমাকে কিছু লুকাচ্ছি না। অঞ্জন বলে আমি কাউকে চিনি না।
নয়
অসিত এসে দেখল, মনীষ শুয়ে আছে। সোমা পাশে চিন্তিত মুখে বসে রয়েছে। এবং অসিতকে দেখেই সোমা প্রাণ পেল যেন। বলল, আসুন। কী বিপদ দেখুন।
অসিত কথা না বলে মনীষের শিয়রে গিয়ে বসল। কী, কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
মনীষ চিত হয়ে শুয়ে আছে। সে মাথা ঘোরাল না। কেমন চুপচাপ ছাদ দেখছে। হলুদ রঙের ছাদ এবং এটা বেডরুম নয়। এখানে সবাই আসতে পারে। এখানেও দুটো খাট আছে দুজনের। এখানে অসিত কেমন একটা নিরীহ গোছের ছবি দেখতে পাচ্ছে। গোটা বাড়িটা ভয়ে কেমন চুপচাপ।
সে বলল, কোথায়? এখানে? সে বুকে হাত রাখল।
বুকটা কেমন করছে অসিত।
এখানে লাগছে?
না।
সে চিন্তিত মুখে বলল, ওকে কাল একবার ভালো করে দেখতে হবে। এখন ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেলাম।
সোমা ভাবল সেই চিঠিটা ওকে দেখাবে কিনা। চিঠিটা পাবার পরই ওর এমন হয়েছে। অসিতবাবু ঘরের লোক। ওর ছেলেবেলার বন্ধু। সুতরাং সে মনীষকে না বলেই চিঠিটা দেখাবে ভাবল। বলল, কী যে করি। ওকে কে একজন থ্রেটনিং চিঠি দিয়ে গেছে। ওটা পাবার পর থেকেই ওর এমন হয়েছে।
অসিত বলল, আপনাদের আপত্তি না থাকলে চিঠিটা দেখাতে পারেন।
আপত্তি থাকলে বলব কেন?
চিঠিটা লকার খুলে আনার সময় অসিত বলল, পুলিশে খবর দিয়েছেন?
পুলিশে খবর দেব কিনা ভাবছি।
কেন? অসুবিধা কী?
ওর ভয়—এতে ঝামেলা আরও বাড়ে। কাজের কাজ কিছু হয় না।
অসিত চিঠিটা পড়ে কেমন নিজেও বিব্রত বোধ করল। যা চিঠি এতে কার যে অপরাধ সে যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। এগুলো যদি সত্যি হয়, তবে মনীষের স্বপক্ষে বলার কিছু নেই।
সে সোমাকে চিঠিটা ফিরিয়ে দেবার সময় একবার মনীষের খাটের দিকে তাকাল। মনীষকে কেমন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সে সোমাকে বলল, চিঠিটা পড়ে মনে হয় কোনো মধ্যযুগীয় নাইট রাতের আঁধারে পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে।
সোমা বলল, কেন যে হচ্ছে এমন!
মনীষ বলল, আর কাজ করা যাবে না। দেশের বেকারি বাড়বে।
ওর দিকে তাকিয়ে অসিত হাসল। তুই এখন ঘুমো।
আর কী ঘুম আসে! বলে সে পাশ ফিরে শুল। সে ভাবছিল সোমার কথা বলবে কিনা। কিন্তু পারিবারিক প্রেস্টিজ, সে কিছু বলল না। সোমা অঞ্জন অঞ্জন বলে মূর্ছা গিয়েছিল, সে কথা বললে যেন মনে হবে সব ব্যাপারটার সঙ্গে সোমা জড়িত।
অসিতই বলল, ওকে খুঁজে পেলেন?
কাকে?
ঐ যে বলেছিলেন খুব পরিচিত কাকে একবার দেখে মনে করতে পারছিলেন না কোথায় তাকে দেখেছেন?
তাঁকে খুঁজে পেয়েছি। সে ঠাট্টার সুরে বলল।
তাহলে আপনার অসুখ সেরে গেল বলতে হবে।
কীসের অসুখ?
এই যে মানুষের মাঝে মাঝে অসুখ হয়। সে চিনতে পারে না, বুঝতে পারে না কী করছে। তবু করে যায়, খুঁজে যায়।
মনীষ আর পারল না। সে উঠে এল। তুই একটু বুঝিয়ে যা সোমাকে। সোমা বড় ছেলেমানুষ। চারপাশে এত যে দরিদ্র আর অন্নহীন মানুষ আছে তাতে আমরা কী করতে পারি?
কিছু পারি বইকি।
আপনি বলুন—আমরা পারি না? ইচ্ছা করলে পারি না?
অসিত! কী বলছিস আজে—বাজে! তুই যদি টাকা কুড়িয়ে না নিস, তবে অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে। টাকা পড়ে থাকবে না।
অসিত বলল, আমি জানি না, বুঝিও না এসব। তবে এ—ভাবে বেশিদিন চলে না। কলকাতার চারপাশে নজর দিলে যা চোখে পড়ে, সাধারণ মানুষের মাথা ঠিক থাকার কথা না। যদি কেউ এখন মনে করে থাকে, আর যখন কিছু করণীয় নেই, সব হাতের বাইরে, তখন মধ্যযুগীয় নাইট হয়ে যাওয়াই ভালো, যেখানেই পাপ সেখানেই ওদের তরবারি ঝলসে উঠবে।
তুই কী মনে করিস, ভয় দেখিয়ে আমাদের কাজ গুটিয়ে দিতে পারবে?
অসিত আবার হাসল। তুই উঠে এসেছিস কেন? শুয়ে থাক। উত্তেজনা এ—সময় খারাপ।
আমার ঘুম আসবে না অসিত।
সোমা বলল, লক্ষ্মী মনীষ, তুমি যা বলবে শুয়ে শুয়ে বল, আমরা শুনছি।
মনীষ বলল, আমরা যে—ভাবেই টাকা কামাই, ওতে করে তো দশটা লোকও কাজ পাচ্ছে। ওটা না করলে ওরাও কাজ পাবে না, খেতে পাবে না।
ঠিক আছে, তোর সঙ্গে এ—ব্যাপারে পরে আমি আলোচনা করব। এখন আর কোনো কথা নয়।
কথা বললে সে আরও উত্তেজিত হবে। এবং এতে খারাপ হবে। ওর যা মনে হচ্ছে—হার্ট ওর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। চিঠি পাওয়ার পরই হার্ট কারও দুর্বল হয়ে যায়। এবং ভয়ে সে মরে যায়। মনীষ ভয়ে মরে যাবে, স্বভাব ওর যাবে না। এ—সব তর্ক বৃথা। সোমাকে স্বপক্ষে সে টেনে নিতে পারত, কিন্তু কথায় কথা বাড়ে, সে ডাক্তার মানুষ, সে সমাজ—সংস্কারক নয়। সে রুগির যাতে ভালো হয় তাই করবে। এবং সেইমতো উপদেশ দিয়ে গেল সোমাকে।
অসিত যাবার সময় সোমাকে বলল, আপনার সেই ভয়টা গেছে তো?
কোন ভয়? ভয় কোথায় আবার!
এই যে রাস্তায় গরিব দুঃখী মানুষ অথবা ভিখারি মানুষ দেখলে আপনার ভয় হত। মনে হত ওরা হাজার লক্ষ হলেই ছুটে আসবে। যা কিছু সুন্দর, যাকে আপনারা এখন শিল্প বলছেন, একে একে ভেঙে তছনছ করে নতুন সমাজ তৈরি করবে।
