হঠাৎ সোমার কেমন ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল শিয়রে কেউ বসে রয়েছে। তাকে ডাকছে। ওর প্রথম মনে হয়েছিল সেই মানুষটা তার শিয়রে বসে রয়েছে। তাকে ডাকছে। বলছে, ওঠ, চল, আমরা নতুন ফসল তুলতে যাই। এসো দ্যাখো, চারপাশে মানুষের ভিতর কী উল্লাস! স্বাধীন মানুষের কী আনন্দ! কিন্তু চোখ মেলে তাকালে দেখল, মনীষ হাঁটু গেড়ে বসে আছে পাশে। ওকে ভয়ার্ত কণ্ঠে ডাকছে—সোমা ওঠ।
সে উঠে বসল।
দ্যাখো একটা চিঠি। উড়োচিঠি।
কৈ দেখি।
এই দ্যাখো। বলে সে একটা চিঠি দেখালে।
কে দিল তোমাকে?
কে দিল জানি না। রসুল বলল, একটা লোক ওর দরজায় কড়া নেড়ে দিয়ে গেল।
সদর খোলা ছিল?
না। সদর খোলা ছিল না।
সোমা অবাক হয়ে গেল। দেখতে কেমন? রসুল ওর মুখ দেখেছে?
রসুলকে ডাকব?
না না। এখন থাক। চিঠিটা পড়।
মনীষ ভয়ে চিঠি পড়তে পারল না। তুমি পড়। আমার গলা শুকিয়ে উঠছে।
সোমা আলোর নিচে চিঠি রেখে পড়তে গিয়ে কেমন ভীত হয়ে পড়ল। সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা। এমন যার হস্তাক্ষর, সে নিজে না কত সুন্দর। সে পড়ল, পড়তে পড়তে গলা শুকিয়ে গেল তার। সব খুঁটিনাটি তথ্য দেওয়া। এত খবর ওরা কী করে রাখে! শেষে লেখা, গণ—আদালতে আপনার বিচার হওয়া দরকার। আপনিই বলুন, যেভাবে আপনার ব্যবসা হাজার মানুষকে জাহান্নমে ঠেলে দিচ্ছে তার কী শাস্তি?
সোমা বলল, আমি জানি সে আসবে।
সোমা! মনীষ আর্তনাদ করে বলল, তুমি কী বলছ!
কী বলব বল? এমনই তো হবার কথা। আমাদের আইন তোমার এই ভেজাল ব্যবসা রুখতে পারছে?
তার জন্য জুলুম? ভয় দেখাবে?
আর কী করা। সোমা হাসতে থাকল। আমি তোমাকে ভালোবাসি মনীষ। আমার বাবা লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করল! কী সামান্য ছাপোষা মানুষ ছিলেন তিনি। রসুলকে তাড়াতাড়ি ডাকো। অনেক কথা জিজ্ঞাসা করার আছে।
রসুল এলে বলল, মানুষটা দেখতে কেমন রে?
রসুল বলল, বড় ভালোমানুষ। সে এসে ডাকল আমাকে, বলল, রসুল ভালো আছ?
তুই কী বললি?
বললাম, ভালো আছি কর্তা।
কর্তা বলছ কেন? আমার নাম অঞ্জন। তুমি আমাকে অঞ্জন বলেই ডাকবে।
নাম অঞ্জন বলল। অঞ্জন নাম তার! বলতে বলতে সোমা কেমন মূর্ছা গেল।
আমাকে তার নাম বলতে বারণ করেছে দিদিমণি। এই, এই, কী হল! দাদাবাবু কী হল?
কিছু না।
ডাক্তার ডাকি?
না। মনীষ, সোমাকে শুইয়ে দিল। আর শোয়ানোর সময়ই মনে হল তার সেই ছিন্ন—ভিন্ন নাইটি ওর গায়ে। রসুল এমন পোশাকে দিদিমণিকে কখনও দেখেনি। কিন্তু মানুষটার কথাবার্তায় কী জাদু আছে! সে একেবারে তার কথায় মুগ্ধ হয়ে গেল! এবং সেটুকু না বলাতেই রসুলকে ডেকে এনেছে ওরা যে ঘরে বসে, সে ঘরে। সে কী করে জানবে, দুজনেরই তখন মূর্ছা যাবার মতো চেহারা। সে বলতে বলতে সব দেখছিল আর অবাক হয়ে যাচ্ছিল। মনীষ তাড়াতাড়ি বলল তুই বাইরে দাঁড়া। ওর চোখে—মুখে জল দিচ্ছি।
মনীষ এখন অঝোরে ঘামছে। এটা যে শীতের রাত মনেই হচ্ছে না। সে পর্দা তুলে বাইরে এসে বলল, রিভলবারটা ঠিক আছে তো?
সব ঠিক আছে দাদাবাবু। কিন্তু ও তো রিভলবারের মানুষ নয়। ওর চোখ—মুখ দেখলে আপনারও মায়া হবে।
রাখ তোর মায়া। বলে সে এক ধমক লাগাল। তারপর ঘরে ঢুকে দ্রুত পালটে ফেলল সোমার পোশাক। ওর চোখে—মুখে জল দিল সামান্য এবং চোখ খুললে বলল, তুমি ওকে চিনতে পারনি।
সোমা বলল, না।
আট
সোমা ডায়াল ঘোরাল। বলল, এটা কী থ্রি ফাইভ ফোর এইট টু ফোর?
ইয়েস। আপনার কাকে চাই?
অসিতবাবু আছেন? ওকে একটু ডেকে দিন না।
অসিতকে? অসিতের বাবার গলা সোমা বুঝতে পারল। আপনি কোত্থেকে বলছেন?
আমি সোমা, মেসোমশাই।
অ সোমা, তোমার কী খবর? কতদিন তোমাকে দেখি না।
আমার খবর ভালো মেসোমশাই! একদিন আপনাকে দেখতে যাব। তাড়াতাড়ি অসিতবাবুকে একটু ডেকে দিন না। ওর শরীরটা ভালো না। একবার এক্ষুনি আসতে হবে।
সোমা বুঝল অসিতবাবুর বাবা এবার ফোন ছেড়ে অসিতবাবুকে ডাকতে গেছে। সোমা এবার পাশের খাটের দিকে তাকাল। দেখল মনীষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। নিশ্বাস ফেলতে ওর কষ্ট হচ্ছে কেন জানি।
আমি সোমা বলছি অসিতবাবু। তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আপনার বন্ধুর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকে ভয়ংকর ব্যথা।
যাচ্ছি।
সোমা রসুলকে বলল, সদর খুলে বসে থাক। অসিতবাবু আসছে।
মনীষ বলল, ওর বলতে কষ্ট হচ্ছে তবু বলল, না সদর খুলবে না। দরজায় এসে গাড়ি থামলে দেখে খুলবি। অন্য যে—কোনো লোক এসে ঢুকতে চাইলে গুলি করবি।
সোমাকে মনীষ অবিশ্বাস করছে। কারণ সোমা অঞ্জন, অঞ্জন এসেছিল বলতে বলতে মূর্ছা গেছে। বস্তুত সে একজনকে হয়তো চিনে ফেলেছে। ওর নাম অঞ্জন কিনা সে জানে না। অঞ্জন এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে একটা মুখ মনে পড়েছিল, সে মুখটার সঙ্গেই যেন বেশি মিল আছে কফি হাউসে সে যাকে দেখেছিল তার। কারণ সোমার নাম ছিল একসময় অঞ্জলি। সোমা ওর পোশাকি নাম। অঞ্জলি এবং অঞ্জু এই নামে কেউ তাকে ডাকত। একজন তাকে ডেকেছিল অঞ্জনা বলে। সেই মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি সুন্দর মুখ ভেসে উঠল। দাড়ি—গোঁফ ওঠেনি তখনও, অথচ কী দুর্ধর্ষ সে, তার ভিতরটা, মনে হল এখনও কেঁপে ওঠে।
সোমা এবার মনীষের পাশে গিয়ে বসল।—একটু জল গরম করে সেঁক দিচ্ছি।
আরে ধুত্তোর তোমার সেঁক। আমি কথা বলতে পারছি না।
এতটুকু কম মনে হচ্ছে না?
মনীষ কথা বলতে পর্যন্ত পারছে না।
