তারপর এক সময় টুকুন পাশের টুলটাতে বসে পড়ল। এবং পিয়ানোর রিডে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকল। তার এখন আর উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না। দরজায় বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন। ডাকছেন, টুকুন। এটা কী হচ্ছে! এত রাতে তুমি এমনভাবে বাজালে আমাদের ভয় লাগে। তুমি দরজা খোল।
ইন্দ্রও বলছে, টুকুন দরজা খোল।
টুকুনের মা বলল, এক অসুখ সেরে অন্য অসুখে মেয়েটা ভুগছে। আমার কী যে হবে!
—কী হবে আবার! টুকুনের বাবা ধমক দিতে গিয়েও ইন্দ্রকে দেখে কিছু বলতে পারলেন না।
—কিছু হবে না বলছ! মানুষ এভাবে কখনও পিয়ানো বাজাতে পারে?
—পারে না?
—টুকুন কতটুকু বাজনা শিখেছে! যে এতেই সে এমন একটা আশ্চর্য লয় তান শিখে ফেলবে।
—এটা তো মনের ব্যাপার। তুমি সব তাতেই এত ভয় পাও কেন বুঝি না।
—না, ভয় পাব না, একটা ডাইন এসে আমার মেয়েটাকে কী করে ফেলল। বলে, দরজায় নিজের কপাল ঠুকতে থাকল।
টুকুন আর বসে থাকতে পারল না; দরজা খুলে বলল, তোমরা এখানে কেন? মার দিকে তাকিয়ে বলল, এটা তুমি কী করছ!
—না এখানে থাকব না। এটা কী বাড়ি না ভূতের বাসা!
—পিয়ানো বাজালে ভূতের বাসা হয়।
মজুমদার সাহেব বাধা দিলেন কথায়। টুকুন মা লক্ষ্মী। তুমি এবার খেয়ে শুয়ে পড়। বাজাতে ইচ্ছা হয় সকালে উঠে বাজিয়ো।
গীতামাসি বলল, আমি সব গরম করে রেখেছি।
টুকুন আর কথা বাড়াল না। বাথরুমে ঢুকে সে সব খুলে ফেলল। শরীর কেন যে এত পবিত্র লাগছে। কেন যে এত হালকা লাগছে। শরীরে যা কিছু মুক্তাবিন্দু সব সে ধীরে ধীরে সাবানের ফেনায় তুলে ফেলল। সুবল এভাবে একটা ফুলের উপত্যকায় কিংবদন্তির মানুষ হয়ে যাবে কখনও যেন টুকুন জানত না। ওর ফুলের গাড়িগুলোর টংলিং টংলিং শব্দ টুকুন এখনও যেন শুনতে পাচ্ছে। এবং ওর চুপচাপ থাকা, বড় লম্বা শরীর, কালো গভীর চোখ, ঢোলা পাঞ্জাবি সব কিছু আর সে ফুলের জগতে আছে বলেই ওর ভিতর এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যেন জেগে উঠেছে। সুবল বলেছে—যা কিছু এখানে দেখছ—আমার বলতে কিছু নেই। যারা কাজ করে তাদের। যা কিছু লাভ অলাভ তাদের। ওরা না থাকলে—এভাবে একটা ফুলের উপত্যকা গড়া যায় না।
টুকুন ভেবেছিল, এটা খুব সত্যি। এবং টুকুনের কাছে এটাই খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে সে এভাবে সবকিছু কবে বিশ্বাস করতে শিখল।
সুবল বলেছিল—এটা একটা আমার অহঙ্কার টুকুনদিদিমণি—মানুষের ভালোর জন্য কতটা দূরে যাওয়া যায় দেখা।
এ—কথাটাও টুকুনের খুব ভালো লেগেছিল। এবং মনে হয়েছিল—একটা বিরাট অসুখের শিকার তার মা—বাবা। কখনও সে মা—বাবাকে শান্তিতে বসবাস করতে দ্যাখেনি। ওর ইচ্ছা হয়েছিল বলতে, আমাদের বাড়িতে এমন একটা সুন্দর ফুলের উপত্যকা গড়তে পারো না। কিন্তু বলতে গিয়ে ও থেমে গেল। কারণ সে তার মায়ের ভয়ঙ্কর দুটো চোখ তখন সামনে ভাসতে দেখেছিল।
আর তখন টুকুনের মা এবং বাবা ইন্দ্রকে গাড়িবারান্দায় ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসছিল। মনে হল ঝি চাকর পাশে কেউ নেই। দু—পাশে ঘরগুলো ফাঁকা। ফরাসে যারা কাজ করে তারা বারান্দায়—মেমসাব ঢুকে গেলেই ওরা সব এদিককার আলো নিভিয়ে দেবে। কেবল বড় একটা আলো জ্বলবে গাড়িবারান্দায়। এবং নিয়নের আলো জ্বালিয়ে রাখা হবে লম্বা করিডোরে।
একটু ফাঁকা পেয়ে আর সবুর সইছে না, টুকুনের মা কঠিন গলায় ডাকল। —শোন।
মজুমদার সাব দাঁড়ালেন।
—কাল আমি ইন্দ্রের বাবাকে কথা দেব।
—কী কথা!
—আগামী আষাঢ়েই বিয়ে। আমি আর একদণ্ড নষ্ট করতে চাইছি না।
—সে তো ভালো কথা।
—কাল থেকে টুকুনের বাইরে বের হওয়া বারণ।
—আবার যদি পুরানো অসুখটা দেখা দেয়।
—সে অনেক ভালো।
—মন খারাপ থাকলে যা হয়, পুরনো দুঃখ ফের ফিরে আসতে পারে।
—এটা হলে আমি বেঁচে যাই।
—মা হয়ে তুমি এমন কথা বলছ!
—আমি আমার মান—সম্মানটা বুঝি। তুমি তোমার কারখানা কারখানা করে সেটা পর্যন্ত হারিয়েছ।
—আর কারখানা থাকছে না।
টুকুনের মার মুখে কেমন ব্যাজার হয়ে গেল।
—সত্যি আর থাকছে না। আমি লক—আউট করব ভাবছি। ওরা স্টে—ইন—স্ট্রাইক করছে। আমি লক—আউটের কথা ভাবছি। দরকার হলে ক্লোজার।
—কিন্তু এসব করলে তুমি খাবে কী, আমরা খাব কী!
—সে দেখা যাবে।
ওরা এভাবে কথা বলতে বলতে ওদের শোবার ঘরের দরজায় চলে এসেছে। দুটো ঘর আলাদা। ওরা এক ঘরে শোয় না। ভিতরের দিকে একটা দরজা আছে—যা ইচ্ছা করলে দুজনেই দুদিক থেকে খুলে ফেলতে পারে। মজুমদার সাব স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, খুব ভাবনা হচ্ছে!
টুকুনের মা এখনও যুবতী—লম্বা, চুল কোমর পর্যন্ত এবং চোখে ভীষণ মায়া। আবার এই চোখ কখনও কখনও খুব খারাপ দেখায়। মনেই হয় না টুকুনের মার স্নেহ মমতা বলে পৃথিবীতে কিছু আছে। এবং যা হয়ে থাকে, দুঃখী মুখ করে রাখলে মায়াবী এক ছবি চারপাশে দেখা যায়। তিনি তাঁর স্ত্রীকে দরজাতেই বুকের কাছে টেনে নিলেন। তারপর যা হয় দরজা খোলার তর সয় না। ওরা পরস্পর সংলগ্ন হয়ে যায়। মজুমদার সাব নানাভাবে অভয় দেন—আমি তো আছি, আমার লাইসেন্স আছে। উদ্যম বিহনে পূরে কিবা মনোরথ। মাঝে মাঝে যেমন কবিতাটা আবৃত্তি করতে ভালোবাসেন, তেমনি এটা আবৃত্তি করে স্ত্রীকে নরম বিছানায় কিছুক্ষণের জন্য উদাসীন করে রাখলেন।
এবং এই উদাসীনতার ফাঁকে শরীরের সব কিছুর ভিতর আছে এক অহমিকা, ঠিক ঠিক জায়গায় হাত দিলে তিনি তা ধরতে পারেন। এবং এভাবে তিনি বেশ কিছু সময় স্ত্রীর শরীরে পার্থিব সুখ—দুঃখ খুঁজে যখন ক্লান্ত, তখন মনে হল চারপাশে কেমন একটা দমবন্ধ ভাব। রামনাথ ওপাশের দরজায় বসে ঝিমোচ্ছে। তাকে ছেড়ে দিতে হবে। ছেড়ে দেবার আগে বললেন, আমার ঘরের সব জানলাগুলো খুলে দে তো।
