প্রায় সে ছুটে ছুটে সিঁড়িতে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে গেছে। কী যে মহার্ঘ বস্তু তার শরীরে আছে—যা সুবলের কাছে গেলেই ভীষণ চঞ্চল হয়ে ওঠে। নদীতে স্নানের দৃশ্য মনে হলে সে কেমন লজ্জায় গুটিয়ে আসে। ওর চোখ মুখ তখন বড় সুষমামণ্ডিত মনে হয়। তার কাছে সুবল এক আশ্চর্য মানুষ। সে এতক্ষণ সুবলের ফুলের উপত্যকায় জ্যোৎস্না রাতে চুপচাপ বসেছিল পাশাপাশি। ফুলেরা সব ওর শরীরের চারপাশে বাতাসে দুলেছে। আর সেই বুড়ো মানুষের সুর ধুয়ে পড়ে যাওয়া সব সুরা বাতাসে এক সুন্দর সজীবতা গড়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে সুবল সেই সব সুরার অর্থ করে দিলে—মনে হত আশ্চর্য এই জীবন—সে আছে মানুষের পাশাপাশি—যার শরীরে আছে নানা বর্ণের ফুলের সৌরভ।
সে এভাবে এমন একটা মুগ্ধতার ভিতর আছে যা ভাবা যায় না। ঘরে ঢুকেই সে পিয়ানোর রিডে ঝম ঝম শব্দ তুলে হাত চালাতে থাকল। এবং আশ্চর্য সব সিমফনি গড়ে তুলতে চাইছে সেই সব শব্দের ভিতর। যেমন যেমন সে সারাটা বিকেল, সারাটা সন্ধ্যা এবং রাতের প্রথম দিকে সারা জ্যোৎস্নায় ঘোরাঘুরি করেছে সে ঠিক তেমনি রিডের ওপর হাত চালাতে থাকল।
প্রথমে সে গোটা রিডের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে দু’ হাতের আঙুল চালিয়ে গেল। যেন সে সুবলের কাছে যাবে বলে মোটরে যাচ্ছে ঝড়ের বেগে। তার রাস্তাটা ঠিক জানা নেই। রিডে যে জন্য মাঝে মাঝে টুকুনের হাত কাঁপছে। হাত কাঁপলেই মনে হয় ইতস্তত মোটরটা রাস্তা ভুল করে ফেলেছে। ভুল করেই ফের শুধরে নিচ্ছে—তখন আবার দু’হাতের সমস্ত আঙুল কোমল লতার মতো দুলে দুলে যেন সুতার বাঁধা সরু সরু সব পুতুলের হালকা পা রিডগুলোতে কখনও অল্প, কখনও বেশি নরম এবং কখনও ছোট ছোট অক্ষরে লিখে যাবার মতো তার মনের উদ্বিগ্ন ভাব এবং আকুতি ফুটিয়ে তুলতে চাইছে পিয়ানোতে।
এভাবে একটি মেয়ে এমন সব সুর তুলে ফেলছে এমন সব সুন্দর ঝংকার তুলছে পিয়ানোতে যে সমস্ত বাড়িটা যেন সুরের ঝংকারে ভাসছে। কখনও হালকা মেঘের ওপর—কখনও জলে গলে যাবার মতো, আবার মনে হয় স্থির হয়ে আছে বাড়িটা—সাদা জ্যোৎস্নায় সব কেমন করুণ হয়ে আছে।
ঘরে ঘরে আর কেউ ঘুমোচ্ছে না এখন। সুরের ইন্দ্রজালের ভিতর সবাই ডুবে যাচ্ছে। এমন ঝংকার যে—মনে হয় কোথাও দু’জন পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে, কোথাও ওরা দুজন পাশাপাশি সাঁতার কাটছে নির্মল জলে। আবার মনে হচ্ছে বনের ভিতর দাপাদাপি। একজন আগে ছুটে যাচ্ছে আর একজন পিছনে! পাতা পড়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। বনের মর্মর শোনা যাচ্ছে আবার শোঁ শোঁ ঝড়ের বেগে গাছের ডালপালা ভাঙার শব্দ! আর খুব কান পাতলে বোঝা যায় এখন টুকুন যে ঝংকার তুলছে রিডে, সবই নদীতে নেমে যাবার আগের দৃশ্য। প্রথমে দুজনে ধীর পায়ে জলে নামছে। খস খস শব্দ। শাড়ি হাঁটুর ওপর উঠে আসছে। তারপর ঝুপঝাপ—দু’জনে নেমে যাচ্ছে। জলে সাঁতার কাটছে। খুব লঘুপক্ষ হয়ে জলে ভেসে যাচ্ছে। এত আস্তে এখন পিয়ানোতে আঙুলগুলো নড়ছে টুকুনের যে মনে হয় আঙুলগুলো অবশ হয়ে গেছে। টুকুন চোখ বুজে বাজাচ্ছে। এবং সেই দৃশ্যের ভিতর জলের নীচে ডুব দেবার শব্দ, অথবা পা দুটো ঠিক মাছের মতো যে খেলছে জলের নীচে তার শব্দ, অথবা লুকোচুরি খেলার জন্য গভীর জলে ক্রমে ডুবে যাওয়া, ডুবতে ডুবতে গভীরে ডুবে যাওয়া আরও তলায় এবং শেষে কিছু জলের ওপর ফুটকুরি তোলার আওয়াজ—সবটাই এখন নিপুণভাবে টুকুন রিডের ওপর বিস্তার করার চেষ্টা করছে।
আর চার পাশে ওপরে নীচে যত কামরা আছে, যত মানুষ আছে এই প্রাসাদের মতো এক অবিশ্বাস্য সিমফনি একের পর এক বাজিয়ে যাচ্ছে। একটা বাজাচ্ছে—শেষ করছে বাজনা, মিনিটের মতো বিরতি, তারপর আবার, ঝমঝম শব্দ। যেন ভীষণ বেগে প্রপাতের জল নেমে আসছে। বাড়িটা জলের নীচে ডুবে যাচ্ছে। আর নিশ্বাস বন্ধ করে একের পর এক সবাই এসে এবার পার্লারে জড়ো হচ্ছে। পার্লারে সব আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। সবাই মুখোমুখি বসে। কেউ ওপরে যেতে পাচ্ছে না। কেমন এক মুগ্ধতায় সবাই বসে রয়েছে মুখোমুখি। ঝাড়—লণ্ঠনে সব আলো জ্বলছে। দেয়ালের পুরানো পেন্টিং পর্যন্ত সজীব দেখাচ্ছে।
এবং মেয়েটা বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই। সে তার ঘরে খুব অল্প আলো জ্বেলে রেখেছে। একটা মোম জ্বাললে যতটা হয় ঠিক ততটা। সে সেই সিল্কের শাড়িটাই পরে আছে। ওঁর কাঁধ থেকে আঁচল খসে পড়েছে। ওর চুল উড়ছিল পাখার হাওয়ায়। আর ও ভীষণ ঘামছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ক্রমে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে এবার বাজিয়ে গেল—একদল পাখি উড়ে যাচ্ছে। মেষপালকেরা ঘরে ফিরছে। গোরু—বাছুরের ডাক ভেসে আসছে। বাতাসে নদীর জলে ঢেউ। কেউ যেন সেই জলে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে তার শব্দ। তারপর চুপচাপ বসে থাকলে যে এক নিরিবিলি ভাব থাকে তেমন এক ভাব। কত অনায়াসে যে মেয়েটা এমনভাবে সামান্য কটা রিডে আশ্চর্য সব সিমফনি গড়ে যাচ্ছে।
এবং সব শেষে ওরা শুনছে ক্রমে বাজনা দ্রুত লয়ে উঠতে উঠতে ঝম—ঝম শব্দ। বুঝি যুবক—যুবতী সাঁতরে নদী পার হচ্ছে। এবং নরম ঘাস মাড়িয়ে ছুটছে। তারপর বনের ভিতর আদম—ইভের মতো ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে জ্ঞানবৃক্ষের ফল থেকে যা হয় এক আশ্চর্য মাদকতা, অথবা মুগ্ধতা এবং অপার বিস্ময়বোধ শরীর সম্পর্কে কী যে ভালো লাগে, ভালো লাগার যেন শেষ থাকে না—অন্তহীন ঈশ্বরের অপার ইচ্ছা শরীরে খেলে বেড়ালে কেমন আবেগে বলার ইচ্ছে—তুমি আমায় দ্যাখো, সবকিছু দ্যাখো, আমাকে তোমার ভিতর নিঃশেষ করে দাও। এই ভাবে সব কিছু নিঃশেষে হরণ করে নিলে মনে আছে টুকুন সুবলের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেনি। কত সহজে সে—সবও বাজিয়ে যাচ্ছে!
