সে তার টুকিটাকি মালপত্র সব মাথায় করে এক সময় শেফালী বউদির ঘরের দিকে রওনা হল। সে যাবার সময় একটা সুন্দর সাজানো পান কিনে নিল। নিজে সে পান—টান কিছু খায় না। অজিতদা ওকে একদিন একটা বিড়ি দিয়েছিল খেতে। সে খেতে গিয়ে খক খক করে কেশেছে ভীষণ। সেই থেকে বিড়ি ব্যাপারটাকে ভীষণ ভয় পায় সে।
সে হাঁটছিল। তাকে খুব একটা দূরে হেঁটে যেতে হয় না। বড় রাস্তা থেকে কিছুদূর হেঁটে গেলেই গোলবাগান বস্তি। দুপাশে ছোট ছোট সব খুপড়ি ঘর, টিনের চাল। একটা হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের ডিসপেন্সারি। তারপর একটা লোক দুটো লেদ মেসিনের দোকান নিয়ে সারাদিন কাজ চালিয়ে যায় এবং রোয়াকে চায়ের দোকান। একটা ছোট মুদি—দোকান, কলের জল পড়ছে এবং কলের পাড়ে ভীষণ ভিড়। সে এখানে এলেই সবাই ঝুঁকে পড়ে। সুবল তোর পাখিটা দেখি। দেখা না রে পাখিটা। কেউ কেউ একটা মাকড় ধরে এনে বলে, নে, এটা খাওয়া। সে জানে কোথায় কী বলতে হয়। সে মানুষকে আঘাত করতে জানে না। সে মিথ্যা কথাও বলতে জানে না, সে ইচ্ছা করলে বলতে পারে না, পাখিটা এখন আমার জেবে নেই। বললেই ওরা সরে যায়। কিন্তু বললে মিথ্যা কথা বলা হবে। সে কোনোরকমে তাড়াতাড়ি রাস্তাটা পার হয়ে যায় তখন। চৌকাঠে ঢুকে গেলে কেউ তখন আর বিরক্ত করতে আসে না।
শেফালী অসময়ে সুবলকে দেখে বলল, সুবল, এ—সব নিয়ে অসময়ে?
—একটু কাজ আছে বউদি।
শেফালী ওর মাথা থেকে এক এক করে টুকিটাকি জিনিস নামাতে নামাতে বলল, কোথায় যে রাখি!
—আজ রাখো, কাল সকালে নিয়ে যাব। তোমার জন্য একটা পান নিয়ে এসেছি।
—সুবল, তুমি আমাকে ভালোবাসো?
সুবল অবাক। বউদি তাকে ঠাট্টা করে কথাটা বলেছে। তবু কেমন যেন গা—টা শির শির করে উঠল। এই শহরে এলে মানুষ বুঝি সব কিছু একটু তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে। সে বলল, তুমি পান খেতে ভালোবাসো। অজিতদা কোথায়?
শেফালী ঠোঁট উলটে বলল, জানি না।
—আজ আসেনি?
—না।
—কেন আসে না?
—একবার জিজ্ঞাসা কর না!
—না, খুব খারাপ বউদি। আমি ঠিক জিজ্ঞাসা করব। বলেই সুবল হেসে দিল।—তুমি ঠাট্টা করছ বউদি। দাদা ঠিক এসেছে।
—না রে! তোর সঙ্গে আমি মিথ্যা বলি না।
সুবলের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সে বলল, কোনও খবর নিয়েছ?
—ঠিক চলে আসবে। কোথায় খোঁজ করব বল? কোথায় যায় আমাকে বলে যায় না।
সুবল বুঝতে পারল, বউদি সত্যি কিছু জানে না। সে নিজেই একটা জলঢৌকি টেনে দিল। বসতে বসতে বলল একটু জল খাব।
শেফালী জল এনে দিলে বলল, কাল ক’টায় বের হয়েছে?
—রাতে।
—রাতে ক’টায়?
—বেশ রাত। যেন শেফালী ইচ্ছা করেই আর বেশি বলতে চাইছে না,—শেফালী সুবলকে মাঝে মাঝে রাজা বলে ডাকে। যদিও জানে রাজা খুব ভালো ছেলে। রাজার নতুন গোঁফ উঠছে বলে, খুব ভালো লাগে দেখতে। এই নতুন গোঁফ—ওঠা ছেলেদের খুব ভালো লাগে। রাজা আগে খুব নোংরা জামাকাপড় পরে থাকত। শেফালী ওকে কিছু কিছু ট্রেনিং দিয়ে বেশ এখন সাফসোফ রাখার ব্যবস্থা করেছে। আগে চুল ছিল বড় বড়। চুল কাটত না। ইদানীং চুল কাটছে। এবং বড় একটা শিখা ছিল মাথায়, সেটাও ছোট করে ফেলেছে। খুব খেয়াল না করলে বোঝা যায় না শিখাটা আছে মাথায়।
শেফালী বলল, সব ফেলে কোথায় যাচ্ছ?
—টুকুনদিদিমণির কাছে।
—তুমি যে বলেছিলে আর যাবে না? সিস্টার পছন্দ করে না।
সুবল বলল, আমার বউদি, আপনজন বলতে টুকুনদিদিমণি। ভেবেছিলাম যাব না। কিন্তু কাল থেকে মনটা টুকুনদিদিমণির জন্য কেমন করছে।
—কবে যেন গেছিলে?
—গত বুধবার।
—আর মাঝে যাওনি?
—না।
—টুকুন ঠিক জানলায় রোজ দাঁড়িয়ে থাকবে?
—জানি না বউদি। ওর মা আমাকে দেখতে পারে না। ওদের অসুবিধা হবে বলে একটা বড় স্টেশনে আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল।
—ভীষণ খারাপ। বড়লোক হলে মানুষ ভালো হয় না। বড়লোকেরা খুব স্বার্থপর।
সুবল সে—সব কথায় গেল না। সে বলল, আসতে আসতে দেখলাম, একটা বড় গির্জার সামনে দুটো ছেলে ফুল বিক্রি করছে। বেশ ভালো কাজ।
—কেন, তুমি ফুল বিক্রি করবে নাকি?
—দাদা এলে জিজ্ঞাসা করব, কোথায় ফুল কিনতে পাওয়া যায়।
—এ কাজটা খুব ভালো হবে। তোমার খুব সুন্দর মুখ রাজা। তুমি যদি ফুল বিক্রি করো তবে লোকে অনেক ফুল কিনবে।
—সত্যি কিনবে?
—সত্যি। প্রথম দিনের একজন খদ্দের তুমি আমাকে পাবে।
—আমি তোমাকে এমনি দেব।
—তবে তোমার ব্যবসা হবে কী করে রাজা?
—একটা ফুল দিলে ব্যবসা নষ্ট হয় না। যখন চিনাবাদাম ভেজে বিক্রি করি, কেউ কেউ দুটো একটা এমনি খায়। খেয়ে পছন্দ হলে নেয়। তুমিও আমার তেমন।
—আমার একটা ফুলে কিছু হবে না রাজা। একটা ফুল দিয়ে মালা গাঁথা হয় না।
—কত ফুল লাগবে?
—একগুচ্ছ।
—তাই নেবে!
—না রাজা, এমনি নেব না।
—তাহলে কী করতে হবে?
—সে পরে বলব। বলেই শেফালী বলল, যাও, আপনজনের কাছে যাও।
সুবল এতক্ষণে মনে করতে পারল সে টুকুনদিদিমণিকে একমাত্র আপনজন বলেছে। সে বউদির ঠাট্টাটা ধরতে পেরে বলল, তোমার নিজের লোক। অজিতদা কত ভালো লোক।
—ভালো লোক না ছাই!
—তুমি কেবল বউদি অজিতদার নিন্দা কর। দাদা এলে বলে দেব।
—বলে দ্যাখ না যদি একটু রাগ করে। লোকটার রাগ অভিমান বলতেও কিছু নেই। যা খুশি করবে। মান—সম্মান বুঝবে না। অপমান বলতে কিছু নেই।
সুবল দেখল কথা অন্যদিকে যাচ্ছে। সে উঠে পড়ল। সে একটা বল নিয়েছে হাতে। শেফালীর ইচ্ছা সুবল আর একটু বসুক। এখন এই বিকেলটা শেফালীকে বড় একা একা কাটাতে হবে। এখানে এ ঘরের কেউ দেখতে পাচ্ছে না সুবলকে সামনে নিয়ে বসে রয়েছে। সুবল এলেই মনের ভিতর একটা অদ্ভুত রহস্য খেলা করে বেড়ায়। ওর নরম চুল এবং চোখ দেখলে যেন কোনও আর দুঃখ থাকে না। বেশ জড়িয়ে ধরে ছেলেটাকে চুমু খেতে ইচ্ছা হয়। এবং সুন্দর করে সাজানো পুতুলের মতো অথবা সে যে—সব সিনেমায় নানারকমের কল্প—কাহিনী দেখে তেমনি সব কল্প—কাহিনীর বাসিন্দা হতে ইচ্ছা হয়। সুবলকে না দেখলে তার এমন বুঝি হত না।
