সে—সব কথা তখন টুকুনের মা বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ সে তো কিছু দ্যাখেনি। পাশের বাংকে সে ঘুমাচ্ছিল। ফার্স্ট ক্লাস কামরা, রিজার্ভ।
জেবের ভিতর ছিল তখন পাখিটা। সুবল একটু আলগা হয়ে শুয়ে ছিল নীচে। পাছে পাখিটা চাপা পড়ে মরে না যায়। পাখিটা তখন জড়পদার্থের মতো, যেন শীতে ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছে, অথবা পাখিটার ঘুম পাচ্ছিল বোধহয়—খুব জড়সড়ো হয়ে জেবের একটা দিকে বসে আছে। তারপর মনে হয়েছিল সুবলের, ঘুম এসে গেলে পাখিটা জেবের ভিতর চেপটে যেতে পারে, সেজন্য সে শিয়রে রেখে বেশ নিশ্চিন্তে ঘুম যাবার চেষ্টা করেছিল। পাখিটা শিয়রে জড়সড়ো হয়ে বসে আছে। নড়ছে না। যেন পাখিটারও ভয়, পুলিশ পাখিটাকে ধরে নিয়ে যাবে। তুমি এদের দলে, সুতরাং নিস্তার নেই।
টুকুন রগণ এবং দুর্বল। টুকুন কোনোরকমে উঠে বসেছিল এবং চাদরটা ঠিক মেঝের সঙ্গে মিলে আছে কিনা দেখার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিল। টুকুন ক্ষীণকায়, লম্বা। সিল্কের দামি ফ্রক গায়ে ঢল ঢল করছিল। শুধু সামান্য মুখে সতেজ সুন্দর চোখ কালো জলের মতো গভীর মনে হচ্ছিল। দরজায় তখন ঠক ঠক শব্দ। টুকুন কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। মা এবং বাবা শেষরাতে ঠান্ডা বাতাসটুকু পেয়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছেন। সুতরাং টুকুন নিজে ধীরে ধীরে উঠে গিয়েছিল এবং দরজা খুলে দিয়েছিল—লম্বা একটা পুলিশের মুখ গোটা দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টুকুন খুব আস্তে আস্তে বলল, আমাদের কামরায় কেউ জল খেতে আসেনি।
—কেউ ভিতরে পালিয়ে নেই তো?
—না না, কেউ নেই। কেউ আসেনি। ট্রেন ওরা থামিয়ে দিলেই আমরা দরজা লক করে দিয়েছিলাম।
দশ
সিস্টারের ভয়ে সুবল ক’দিন হল নার্সিংহোমের দিকে পা বাড়ায়নি। এই শহরে একমাত্র টুকুন দিদিমণিই ওর জন্য প্রতীক্ষায় বসে থাকে। তাকে দেখালে খুব খুশি হয়। এবং কেন জানি এ—ভাবে সুবলের কাছে টুকুন খুব আপনজন হয়ে গেল।
অথচ ভয়, সিস্টার তাকে নানাভাবে ভর্ৎসনা করেছে। সেদিন সিস্টারের চোখে কী এক কঠিন বিরক্তি দেখে সে আর যেতে সাহস পায়নি। তা ছাড়া অজিতদা ওকে অন্য একটা সুন্দর ব্যবসার কথা শিখিয়ে দিয়েছে। সে বড়বাজার থেকে চিনাবাদাম কিনে আনছে। এবং ফুটপাথে সে উনুন জ্বালিয়ে বেশ ভাজাভুজি রেখে বিক্রি করছে। সে এখানে এসে একটা ব্যাপার দেখে খুশি। দেশে থাকতে কী না ওরা অসহায় ছিল। এমন একটা সুন্দর দেশ পর পর ছ’বছর খরাতে শস্যবিহীন দেশ হয়ে গেল। তবু অন্যান্য বছর সামান্য বৃষ্টিপাতের দরুন কিছু ফসল হয়েছিল—এবার যে কী হল! দেশ ছেড়ে মানুষ পালাল। সে আর থাকে কী করে! ওর ইচ্ছা ছিল টুকুনদিদিমণিদের সঙ্গেই চলে যাবে। দিদিমণির মা—টা যেন কেমন। ঠিক সিস্টার যেমন মুখ করে রেখেছিল, দিদিমণির মা—টার তেমনি রাগী রাগী ভাব। সে ভয়ে ব্যান্ডেলে নেমে গেল। তারপর এক আশ্চর্য বিকালে এতবড় জানালায় দিদিমণিকে আবিষ্কার করে অবাক।
কিন্তু এখন সে এমন একটা কাজ নিয়ে ফেলেছে যে সে যেতে পারছে না। ওর জুতো—পালিসের সব কিছু অজিতদার বাড়িতে আছে। অজিতদার বউয়ের খুব সিনেমা দেখার স্বভাব। সে সুবলকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তার এসব ভালো লাগে না। সে সময় পেলে বরং টুকুনদিদিমণির কাছে চলে যাবে।
টুকুনদিদিমণির কাছে গেলেই তাকে নানারকম গল্প বলতে হয়। সে আজ যাবে ঠিক করেছে। চার—পাঁচদিন হয়ে গেল দিদিমণিকে না দেখে কেমন সে কিছুটা দুঃখী সুবল বনে গেছে। সকাল সকাল কলের জল থেকে স্নান করেই মনে হয়েছে, দিদিমণির সঙ্গে দেখা না হলে কাজে উৎসাহ পাবে না। সে তাড়াতাড়ি কিছুটা ভাজাভুজি বিক্রি করে নেবে, তারপর বিকেলে হাতে সে কোনো কাজ রাখবে না। আগে ওর খুব একটা ঝামেলা ছিল না। যখন খুশি চলে যেতে পারত। এখন পারে না। সে আগে হাতে তার জুতোর বাক্সটা রেখে দিত। এখন তার সম্বল একটা উনুন, একটা চট, একটা চালুনি, একটা কাঠের ট্রে, একটা ভাঙা কড়াই, কিছু বালি, এতগুলো দিয়ে যে যখন তখন যেখানে সেখানে যেতে পারে না।
সে আজ ভাবল, সব রেখে দেবে শেফালী বউদির কাছে। শেফালী বউদির রং কালো। কেবল গুন গুন করে হিন্দি গান গায়। সব সিনেমার গল্প এসে কাউকে না কাউকে বলা চাই। রাতের বেলায় সুবল গেলে তাকে বসিয়ে গল্প। এক কাপ চা খেতে দেয় তখন। কালো রংয়ের শেফালী বউদির খুব তাজা চোখ মুখ। এবং সবসময় পান খাবার স্বভাব। ছোট দুটো ঘর। তাই যতটা সম্ভব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখে। কাগজের ফুল তৈরি করে নানা রংয়ে সাজিয়ে রাখার স্বভাব। এবং কারুকার্য করা ডিমের খোলা—কোনটা লাল রংয়ের, কোনটা হলুদ রংয়ের। পাশে একটা বড় পুকুর। জানালা খুললে পুকুরের জলে অনেককে নাইতে দেখা যায়। অজিতদা না থাকলে জানলা খুলে শেফালী বউদি কার জন্য মনে হয় জানলায় অপেক্ষা করে। সুবলের এটা কেন জানি ভালো লাগে না।
সুতরাং সুবল সব টুকিটাকি কাজ সেরে ফেলার সময় শেফালী বউদির কথা ভেবে কেমন সামান্য কষ্ট পেল। এই শহরে বড় একটা কষ্ট আছে সবার। যেমন অজিতদার, বউদির। ওদের কাছে যেন কিছু জিনিস খুব দুর্লভ। সেই দুর্লভ কিছু পাবার জন্য ওরা এমন করছে। ওর কাছে দুর্লভ বলতে টুকুনদিদিমণি। দিদিমণিকে দেখলেই ভিতরে সুবল প্রাণ পায়। সুবল দিদিমণির জন্য কী যে সুন্দর একটা খেলা শিখে ফেলেছে, আজ গেলে সেই খেলাটা দেখাতে পারলে খুব আনন্দ পাবে।
