—কে।
—আমি সারদা বলছি।
সহসা এই ফোন সুরেশবাবুকে বিস্মিত করেছে। কোনও অঘটনের আশঙ্কা করলেন তিনি। তার বুক কাঁপছিল। গলা শুকিয়ে আসছে। নার্স সারদার গলা কাঁপছে বলতে—সে ঠিক স্পষ্ট বলতে পারছে না। দুঃসহ খবরের জন্য বুঝি ওর গলা কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিন্তু একি বলছে! কী বললে! কী বলল!
—টুকুন খাটের উপর বসে দিব্যি সেই সুবল ছোঁড়াটার সঙ্গে কথা বলছিল।
—ঠিক ঠিক বলছ?
—ঠিক। আমি দরজা দিয়ে ঢুকতেই সুবল পালিয়ে গেল।
—ডাক্তারবাবুকে খবর দিয়েছ?
—না।
—আগে তাকে খবর দেওয়া উচিত ছিল।
—এমন আনন্দের খবর আপনাকে আগে না দিয়ে তাকে দিই কী করে?
—শোন আমরা যাচ্ছি এখুনি। বলে ফোন ছেড়ে দিলেন সুরেশবাবু।
তারপর কিছুক্ষণের ভিতরেই ওরা সকলে এসে গেল। ডাক্তারবাবু এলেন। তিনি টুকুনকে দেখে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। টুকুন কিছু কুঁচফল এবং চন্দনের বীচি নিয়ে এখন বিছানার ওপর একা একা আপন মনে খেলা করছে, সে ভিড় প্রায় লক্ষ্যই করল না। রাজার গল্প, হরিণের গল্প, রাজপুত্রের গল্প অথবা এই যে এক পাখিয়ালা সুবল যার আপন প্রাণে নিরন্তর বেঁচে থাকার উদ্যম যে—কোনও এক খরা অঞ্চল থেকে চলে এসে এই শহরে ছুটে বেড়াচ্ছে সেই সুবল, বালক সুবল রাজার মতো ওকে কেবল উৎসবের কথা বলে গেল। বেঁচে থাকার কথা বলে গেল। আপন প্রাণের তেজে উড়ে যাবার কথা বলে গেল। সে চন্দনের বীচি কুঁচফল এবং রঙবেরঙের পাথরগুলো দেখতে দেখতে কেমন নিবিষ্ট হয়ে পড়ল।
—টুকুন তোমার শরীর ভালো হয়ে যাচ্ছে! মা মাথায় হাত রেখে বললেন।
—টুকুন একবার মার দিকে তাকাল। কোনও কথা বলল না।
ডাক্তারবাবু বললেন, আমার হাত ধর টুকুন।
টুকুন ডাক্তারবাবুর হাত ধরল।
—এবারে উঠে দাঁড়াও।
—আমি পারব না ডাক্তারবাবু।
—সুবলের একটা পাখি আছে টুকুন।
—ওর পাখিটা ভারী দুষ্টু। ও রাজার মাথায়—বলে হো হো করে হেসে উঠল।
—তুমি দাঁড়াও। সুবল আজ আবার কখন আসবে।
—কখন আসে বলে না। ওদিকে একটা দেবদারু গাছ আছে, তার পাশে কোথায় যেন থাকে।
—তুমি দাঁড়াও। এইত উঠতে পারছ।
—আমি পারব না ডাক্তারবাবু।
—এইত হচ্ছে। আচ্ছা শোন তুমি সুবল এলে থাকতে বলবে, ওর সঙ্গে আমি কথা বলব। আচ্ছা শোন, ঠিক আছে, কাল আবার আমরা হাঁটার চেষ্টা করব।
ডাক্তারবাবু টুকুনকে বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়ালেন এবং নার্সকে ইশারা করতেই নার্স বারান্দায় বের হয়ে গেল। ডাক্তারবাবু নার্সের পেছনে পেছনে বের হয়ে ফিস ফিস করে বললেন, সুবল কখন আসে।
—ঠিক থাকে না। আমি না থাকলেই চলে আসে। ও যেন কী করে টের পায় কখন আমি থাকি না।
—ঠিক আছে। ও আসবে। ও টুকুনের সঙ্গে কথা বলবে। তবে যেন একনাগাড়ে বেশিক্ষণ ও না থাকে। তোমার প্রতি সুবলের যে ভয়টা আছে সেটা সব সময় রাখবে।
—আমি ওকে বেশি আসতে দিই না।
—খুব বেশি না দিলেও তোমাকে মাঝে মাঝে কাজের অছিলায় বাইরে বেশি সময় থাকতে হবে। সুবল এসে কথা বললে ও প্রাণের ভেতর এক অশেষ আনন্দ পায়। এক ধরনের উত্তেজনার জন্ম হয়। আমরা সকলে যা পারিনি, সামান্য এক পাখিওয়ালা তাই করে দিয়ে গেল।
—তবে ওকে ভিতরে নিয়ে এলে হয় না?
—না। তা হয় না সারদা। ওর যদি মনে হয় সুবল এখানেই থাকবে, সুবলের আর যাবার জায়গা কোথাও নেই, তবে ওর প্রতি আকর্ষণ কমে যাবে। কারণ এখন সুবল ওর কাছে জাদুকরের মতো। স্রেফ অলৌকিক জাদুকর। আসে যায়, কখনও হারিয়ে যায়। আবার আসে। প্রত্যাশা ওকে বড় এবং ভালো করে তুলবে। বলে ডাক্তারবাবু অন্যমনস্কভাবে কেবল তুড়ি মারতে থাকলেন।
সুরেশবাবু বাইরে এসে বললেন কেমন বিস্ময়ের ব্যাপার লাগছে সব!
সুরেশবাবুর স্ত্রী বললেন, ডাক্তারবাবু টুকুন সত্যি হাঁটতে পারবে?
—সব এখন পাখিয়ালা সুবলের উপর নির্ভর করছে।
—কেন কেন।
সুরেশবাবুর স্ত্রীর মুখ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।
—টুকুনের কাছে সুবল এখন আশ্চর্য এক জাদুকর। ওর পাখি, ওর কুঁচ ফল, চন্দনের বীচি, রঙবেরঙের পাথর আর সারদা যা বলল, কীসব আজগুবি গল্প বলে সে নাচতে থাকে কেবল। তার অর্ধেকটা বোঝা যায়, অধের্কটা বোঝা যায় না। রাজার গল্প, হরিণের গল্প, বন পাহাড়ের গল্প, এবং পাখির গল্প বলে সে কেবল ছোটার অভিনয় করে। তখন টুকুনের সুবলের পা দেখতে দেখতে বুঝি মনে হয়—হরিণের মতো সেও ছুটছে, মনে হয় ঘোড়ার মতো সেও ছুটছে, গল্পের সঙ্গে এই যে ছোটা, ছোটা আর ছোটা—প্রাণের ভিতর এই ছোটা, কেবল আবেগের জন্ম দেয়। রক্তে উত্তেজনা আসে। হাতে পায়ে সেই উত্তেজনায় রক্ত বইতে থাকে। টুকুনকে তখন খুব স্বাভাবিক দেখায়। এই ছোটার ভিতর সেই উদ্যমের কথাই বলা হচ্ছে সুরেশবাবু। আমরা এই উদ্যম হারিয়ে কেমন ক্রমশ টুকুনের মতো স্থবির হয়ে যাচ্ছি। বলে ডাক্তারবাবু কেমন হাঁসফাঁস করতে থাকলেন!—আমাদের জীবনে এখন সুবলের মতো এক পাখিয়ালা চাই। যে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়ে আমাদের এই কঠিন রোগ সারিয়ে তুলবে। বলে তিনি ফের অন্যমনস্কভাবে হাতে তুড়ি মারতে থাকলেন।
হাতে তুড়ি মারতে থাকলেন ডাক্তারবাবু, জনার্দন ছুটতে থাকল মাঠ দিয়ে। বুকে পলা। হরিণ শিশু পলা জনার্দনের বুকের ভিতর চুপটি করে আছে। কোনও ভয়ডর নেই। কান খাড়া করে দেখছে পেছনে ওর মা অপলা, বোন অচলা আসছে। ছুটে ছুটে আসছে না। কারণ জনার্দন ভাবছিল সে খুব দ্রুত ছুটছে, কিন্তু জনার্দনের মনে নেই বোধ হয়—ওর শরীর বড় ক্লিষ্ট, শরীরে কোনও শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। চোখ মাঝে মাঝে দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। মনে হয় সব কিছু ঝাপসা। আবার কেমন সামান্য জল খেলে চোখের দৃষ্টি ফিরে আসে।
