সুবলের পাখিও দ্রুত আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উড়ে যাচ্ছে। দ্রুত যেন পাখি সকলকে হারিয়ে দেবে। দেখো হুই আকাশে উড়েছে। জানালার পাশে আর কেউ নেই এখন। সুবল এবং টুকুন।
ভোরবেলা, নার্স এখনও আসেনি ঘরে। সুবলের কেবল গমনের অপেক্ষা। ওর দেবদারু গাছের নীচে থেকে জানালা দিয়ে ঘর স্পষ্ট, নার্স না থাকলেই টুকুনদিদিমণির সঙ্গে কথা, কত কথা, রাজ্যের কথা, রাজারানিদের কথা, রাজা ঘোড়ায় চড়ে শিকারে যাচ্ছেন তার কথা—টগবগ করে ঘোড়া ছুটছে তার কথা—ঘোড়া ছুটছে, দিদিমণি—সেই ঘোড়া, কালো ঘোড়া ছুটছে। সামনে পাহাড়, পথ উঁচু টগবগ করে উঠে যাচ্ছে, থামছে না, ঘোড়ায় চড়ে যেন রাজা যুদ্ধে যাচ্ছেন। সুবল পায়ে ঠিক ঘোড়ার মতো তাল দিতে থাকল। বলল, দেখো আমার পাখি কালো ঘোড়ার মতো, বাজপক্ষী ঘোড়ার মতো রাজার দেশে চলে যেতে পারে। সে যে কত বড় রাজার দেশ! দেশে কোনও দুঃখ নেই, কত গাছ, কত ফুল ফল পাখি—রাজার দেশে মানুষের মুখে হাসি আর আনন্দ। সামনে সমুদ্র, রাজার দেশে হায় কোনও দুঃখ জাগে না। কোটাল পুত্র, রাজার পুত্র মাণিক্যের আলোতে দুখের জন্য জাগে। দিদিমণি দুঃখ না থাকলে কষ্ট না থাকলে প্রাণে, আপনি বাঁশি বাজে না।
টুকুনকে খুশি রাখার জন্য, সামান্য সুবল আবোল তাবোল যা মনে আসে যা মুখে আসে বলতে থাকে। টুকুনের সামান্য হাসি দেখার জন্য সে তার পাখি নিয়ে এসে জানলায় দাঁড়ায়। জানলায় দাঁড়ালে টুকুনের মনে হয় সুবল এসেছে পাখি নিয়ে। এই পাখির জন্য সে ট্রেনে হাততালি দিতে পারছিল, এই পাখির জন্যে সুবলের জন্য সে হেঁটে গিয়েছিল। ওর মনে হয় ওর আর আলস্য থাকার কথা নয়, আর দূরে থাকার কথা নয়। আকাশে পাখি উড়তে থাকলে—অথবা ঘোড়া ছুটছে টগবগ…তখন ঘোড়ার মতো শক্তি যেন পায়ে খেলা করতে থাকে। রাজার হাতে অসি, অসি খেলা হচ্ছে, সুবল দুহাত দিয়ে ছোট্ট একটা তালপাতার মতো বাঁশের বাঁট দিয়ে অসি বানিয়ে রাজার মতো খেলা দেখাচ্ছে। যেন এক রাজা যুদ্ধে যাবার আগে সেনাপতিদের অসির নিয়মকানুন বোঝাচ্ছে।
অথবা ওর হাতে কোনও কোনও দিন লাঠি থাকত। মেলার দিনে সকলে যেমন লাঠি খেলা দেখায়—দূর থেকে ছুটে এসে লাঠিতে মাথায় বাড়ি মারে অথবা এক দুই তিন, এক পা, দু পা, তিন পা সামনে গিয়ে ফের পিছনে—লাঠি ঠিক কোমরের সামনে রেখে ফের এক পা, দু পা এগিয়ে যাওয়া—দেখলে মনে হবে সুবল যেন পায়ের ওপর পাইকদের মতো নাচানাচি করছে। জানলা থেকে টুকুন ওর সব রকমের নাচন—কোঁদন দেখে হাসত। ওর পায়ে কী শক্তি কী শক্তি! পাখির পাখায় কী রাজ্যের স্বপ্ন। মনে হত টুকুনের সমস্ত শরীরে সহসা বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।
তারপর সুবল যখন ক্লান্ত হত অথবা নার্স ঘরে ঢুকলে সে ভালোমানুষের বাচ্চার মতো দেবদারুর নীচে গিয়ে বসে বলত, এসে যান বাবু দেখে যান বাবু, জুতো সাফ করে যান—এবং বলত, দু আনা পয়সা দেবেন—সুবল বেশি চায়না, শুধু খেতে পরতে চায়। বলত, আর এই পাখি আছে, পাখির জন্য কিছু সঞ্চয় করে নিচ্ছি। সে মন দিয়ে জুতো সাফ করে। সে পাখিকে টেরিটি বাজার থেকে কিনে আনা কীটপতঙ্গ খাওয়াত। ওর সুখের পাখি শখের পাখির জন্য প্রায় সময় সে স্বপ্ন দেখত। স্বপ্নে টুকুনদিদিমণি খুব সুন্দর এক জরির টুপি মাথায় দিয়ে কনে বউ সেজে বসে আছে। সুবল লাঠি নিয়ে দু’পাশে নাচানাচি করছে। সুবল রাজার পাইক যেন। সুবল লাঠি নিয়ে কনে বউকে খেলা দেখাচ্ছে লাঠির। পরনে জরির কাপড়, মালকোঁচা মেরে সে কাপড় পরেছে। মাথায় পাগড়ি সুবলের। পাগড়িতে পালক আছে। সে রাজার মতো অথবা রাজপুত্রের মতো কোনও কোনও সময়, যেন ঘরে কনে বউ ফেলে হরিণ শিকারে যাচ্ছে আর সেই শিকারের গল্প ভোর হলে অথবা বিকাল হলে বলা চাই।
সে বলত—সে এক হরিণ টুকুনদিদিমণি। হরিণের বনে হরিণ আছে। রাজার সঙ্গে পাইক বরকন্দাজ আছে। বনে ঘন বন আছে। দু’চোখে বনের পথ দেখা যায় না। মাঝে মাঝে সমতল মাঠ আছে, মাঠে ঘাস আছে। রাজার পিঠে তিরধনুক। একটি হরিণ জল খাচ্ছিল। মাঠের ভিতরে এত হরিণ অথচ একটা হরিণ জল খাচ্ছে। ছোট হরিণ—শুধু লাফায়, নাচে আর ঘাস খেতে শখ যায়, কিন্তু নরম ঘাস না হলে, কুয়াশায় ভেজা ঘাস না হলে হরিণ শিশু ঘাস খেতে পারে না।
রাজা ছুটছেন। বুঝলে দিদিমণি বনের ভিতর দিয়ে রাজা ছুটছেন। হরিণ ছুটছে। শিকার ধরার জন্য রাজা ছুটছে। কী বেগে ছুটছে! চারিদিকে পাহাড়, ওপরে মধ্যিখানে হ্রদের পারে হরিণী ছুটছে। কী বেগে কী তালে তালে পায়ের খুরে আগুন জ্বলছে। পাথরে ঘসা লেগে পায়ের খুর জ্বলছে। হরিণীর বাচ্চা একা একা পথে তখন মাঠের ওপাশে হ্রদের জলে মুখ দিয়ে বসে রয়েছে। মা বুঝি আসছেন।
—বুঝলে দিদিমণি বিপদ বুঝতে পেরেছিল হরিণের বাচ্চারা।
—সে মাকে দৌড়তে দেখে সেও দৌড়তে থাকল।
—রাজা ধরতে পারল সুবল?
—না! কী করে পারবে। হ্রদের পারে আসতেই রাজা দেখল পাথরের ঘসা খেয়ে ঘোড়ার পায়ে ফোসকা পড়েছে।
—ঘোড়ার পায়ে ফোসকা।
—বাপরে, আগুন জ্বলছিল পাথরে। হরিণের খুরে আগুন লেগেছিল।
—অঃ। টুকুন যেন আবার যথার্থই সবটা বুঝে ফেলেছে।
আর সঙ্গে সঙ্গে দেখল টুকুন, সুবল চলে যাচ্ছে। বড় জ্বালাচ্ছে। নার্স চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু অবাক টুকুন খাটের উপর বসে রয়েছে। মুখে কোনও অবসাদের চিহ্ন নেই। সব কিছু কেমন অলৌকিক মনে হচ্ছে। তাড়াতাড়ি সে ডায়াল করে বলল, সুরেশবাবু, সুরেশবাবু আছেন?
