ভানু অগ্রাহ্যের হাসি হেসে বলে, হ্যাঁ, মেয়েরা তোমার ঘরে বসে অরু দত্ত তরু দত্ত হচ্ছে! তাই এখন থেকেই পদ্য!
কথা শেষ করতে পারে না।
সুবৰ্ণলতা তীব্ৰস্বরে বলে ওঠে, চুপ, চুপ। আর একটাও কথার দরকার নেই। মিথ্যেই আশা করে মরেছিলাম, চিনেছি তোদের সবাইকে। বুঝেছি। জীবনের সর্বস্ব সার দিলেও আমড়া গাছে আম ফলানো যায় না।
হ্যাঁ, সুবৰ্ণলতা বুঝেছে আমড়া গাছে আম ফলানো যায় না!
তিল তিল করে বুঝেছে!
বুঝে-বুঝেও চোখ বুজে অস্বীকার করতে চাইছিল এতদিন। যেমন অন্ধকারে ভূতের ভয়কে ঠেকিয়ে রাখতে চায় লোকে খোলা চোখকে বন্ধ করে ফেলে।
কিন্তু ক্রমশই ধরা পড়েছে, আর মনের সঙ্গে মন-ভোলানো খেলা চলবে না। আর ছেলেমানুষের মুখের শেষ বুলি বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
ভানুর বিদ্রুপব্যঞ্জক মুখভঙ্গিমায়, চোখের পেশীর আকুঞ্চিনে, আর ঠোঁটের বঙ্কিম রেখায় স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে সুবৰ্ণলতা, এদের বংশের প্রথম গ্র্যাজুয়েট প্রভাসচন্দ্ৰকে। সুবৰ্ণলতাকে ব্যঙ্গ করাই ছিল যার প্রধানতম আনন্দ।
আর সব ভাজেদের আর বোনেদের এবং জানাশুনো সব মেয়েদেরই সুবৰ্ণলতার সেজ দ্যাওর অবজ্ঞা করে এসেছে বার বার, কিন্তু সুবৰ্ণলতাকে অবজ্ঞা করে যেন সম্যক সুখ হতো না তার।
তাই অবজ্ঞার সঙ্গে মেশাতো বিদ্রূপ।
সেই বিদ্রূপ অহরহ প্ৰকাশ পেতো চোখের আকুঞ্চিনে, ঠোঁটের বঙ্কিম রেখায়, আর ধারালো হাসির ছুরিতে।
ভানুর প্রকৃতি সেই বীজ।
সুবৰ্ণলতার সারাজীবনের সর্বস্ব সার দেওয়া গাছ!
সুবৰ্ণলতার আর বুঝতে বাকি নেই, সে গাছ কোনো মহীরূহ হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি বহন করছে না। সে গাছ বাঁশঝাড় মাত্ৰ।
যে বাঁশঝাড় বংশধারার অতুলন। তুলনা!
আজ আর সন্দেহ নেই।
আজ শুধু নিশ্চিত জানার স্তব্ধ নিশ্চেষ্টতা।
আজ আর নতুন করে আতঙ্কের কিছু নেই।
হঠাৎ আতঙ্কিত হয়েছিল সেই একদিন। অনেকদিন আগে সেই যেদিন বড় হয়ে ওঠা বড় ছেলের কাছে এসে হাসি-হাসি মুখে বলেছিল সুবৰ্ণ, ভানু, তুই তো বড় হয়েছিস, পাস দিলি, কলেজে ঢুকলি, আমায় এক জায়গায় নিয়ে যেতে পারবি? একলা চুপি চুপি—
একলা চুপি চুপি!
ভানু অবাক গলায় বলেছিল, তার মানে?
মানে পরে বোঝাবো, পারবি কি না বল আগে!
ভানু এই রহস্য-আভিযানের আকর্ষণে উৎসাহিত হয় নি। ভানু নিরুত্তাপ গলায় বলেছিল, কোথায় যেতে হবে না জেনে কি করে বলবো?
আহা, আমি কি বাপু তোকে বিলেতে নিয়ে যেতে বলছি! সুবর্ণর চোখ ভুরু নাক ঠোঁট সব যেন একটা কৌতুক-রহস্যে নেচে উঠেছিল, এখান থেকে এমন কিছুই দূর নয়, বলতে গেলে তোর কলেজেরই পাড়া-
ভানুর বোধ করি হঠাৎ একটা সন্দেহ জেগেছিল, তাই ভানু ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করেছিল, কি, তোমার সেই বাপের বাড়ি বুঝি? সে আমার দ্বারা হবে-টবে না।
সুবৰ্ণর মুখের আলোটা দপ করে নিভে গিয়েছিল, সুবর্ণর চোখে জল এসে গিয়েছিল, সুবর্ণর ইচ্ছে হয়েছিল বলে, থাক, দরকার নেই, কোথাও যেতে চাই না তোর সঙ্গে।
কিন্তু সে কথা বললে পাছে ভানুর সন্দেহটাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাই জোর করে গলায় সহজ সুর এনে বলেছিল, বাপের বাড়ির কথা তোকে বলতে আসি নি। আমি। তোদের মা হচ্ছে ভূইফোঁড়, বাপের বাড়ি-টাড়ি কিছু নেই তার। বলছিলাম ছেলেবেলার সেই ইস্কুলটাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে। সেই যে গরমের ছুটিতে চলে এলাম, ইহজীবন আর চক্ষে দেখলাম না-
হঠাৎ চুপ করে গিয়েছিল সুবর্ণ, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েছিল।
কিন্তু ভানু মায়ের এই ভাব-বৈলক্ষণ্য বুঝতে পারে নি, অথবা বুঝতে চেষ্টাও করে নি। ভানু যেন ব্যঙ্গের গলায় বলে উঠেছিল, তা আবার গিয়ে ভর্তি হবে!
সুবৰ্ণ তখনো আতঙ্কিত হয় নি, সুবৰ্ণ মনে করেছিল সবটাই ছেলেমানুষের ছেলেমানুষি কৌতুক।
ষোলো বছরের ছেলেকে ছেলেমানুষই ভেবেছিল সুবর্ণ।
তাই বলে উঠেছিল, হ্যাঁ, হবো ভর্তি! তুই জ্যাঠামশাই হয়ে আমাকে ঘাগরা পরিয়ে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিবি! আরে বাবা, রাস্তা থেকে একবার চোখের দেখাটা দেখবো।
রাস্তা থেকে!
ভানু যেন পাগলের প্রলাপ শুনেছে।
তা তবুও সুবর্ণ প্ৰলাপ বকেছে, হ্যাঁ, রাস্তা থেকে। হাঁ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ভয় নেই বাবা, গাড়ি থেকে নামতে চাইব না, শুধু গাড়িটা একবার সামনে দাঁড় করাবি, জানিলা দিয়ে একটু দেখবো।
বলেছিল। আর ঠিক সেই সময় সেই হাসির আভাস ফুটে উঠেছিল ভানুর মুখে, যে হাসি এ বাড়ির প্রথম গ্র্যাজুয়েট প্রভাসচন্দ্রের একচেটে। আর তখনই ধরা পড়েছিল ওর মুখের গড়নটা ওর সেজ কাকার মত।
সুবৰ্ণ সহসা শিউরে উঠেছিল।
তথাপি সুবৰ্ণ যেন মনে মনে চোখ বুজেছিল। সুবৰ্ণ ভেবেছিল, কক্ষনো না, আমি ভুল দেখেছি।
তাই সুবর্ণ আবার তাড়াতাড়ি কথা বলে উঠেছিল, যেমন ভাবে ছোট ছেলেকে বকে মায়েরা, বলে, এত বড় হলি, এটুকু আর পারবি না? তবে আর তুই বড় হয়ে আমার লাভটা কি হলো?
ভানু নিরুত্তাপ গলায় বলেছিল, কারুর লাভের জন্যে কি আর কেউ বড় হয়! বয়েস বাড়লে বড় হওয়া নিয়ম তাই হয়। ও তুমি বাবার সঙ্গে যেও, আমি বাবা মেয়েমানুষকে নিয়ে কোথাও যেতেটেতে পারবো না। সাধে তোমায় পাগল বলে লোকে! যত সব কিন্তুতকিমাকার ইচ্ছে!
সেই দিন।
সেই দিন ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কে হাত-পা হিম হয়ে গিয়েছিল সুবর্ণর। সুবর্ণ তার ছেলের মুখে তার সেজ দ্যাওরের ছায়া দেখতে পেয়েছিল।
সুবৰ্ণ যে মনে মনে কল্পনা করে আসছে এযাবৎ, ভানু বড় হয়ে উঠলেই সে একটু স্বাধীন হবে, সে পৃথিবীর মুখ দেখতে পাবে, আর সেই দেখার পরিধি বাড়াতে বাড়াতে একদিন ট্রেনে চেপে বসবে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া একখানি মুখ দেখতে!
