কারো কোনো মন্তব্য প্রকাশের সাহস হবে না, সুবর্ণ বড় গলায় বলবে, আমার ছেলের সঙ্গে যাচ্ছি। আমি, বলুক দিকি কেউ কিছু! উপর্যুক্ত ছেলের মা আমি, আর তোমাদের কচি খুকী বৌ নই!
এবং তার সেই উপর্যুক্ত ছেলেও বলে উঠবে, সত্যিই তো, আমি বড় হয়েছি আর আমার মাকে তোমরা আমন জাতার তলায় রাখতে পারবে না।
কিন্তু স্বপ্ন ভেস্তে গেল।
সুবৰ্ণলতার ছেলে বললো, মেয়েমানুষকে নিয়ে রাস্তায় যাওয়া আমার দ্বারা হবে না।
মেয়েমানুষ!
মেয়েমানুষ!
প্রতিটি অক্ষরে যেন মুঠো মুঠো অবজ্ঞা ঝরে পড়েছে।
এই অবজ্ঞার উৎস কোথায়?
অশোধ্য ঋণের কুণ্ঠাময় অনুভূতি?
ধ্বনিটির প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে,
ধ্বনির কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে।
একদা যে এই মেয়েমানুষের দেহদুর্গে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিতান্ত অসহায় অবস্থায় তার সহায় ছাড়া গতি ছিল না, সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাই অবজ্ঞা দিয়ে ঢাকা দিতে হবে সেই ঋণ।
অথবা আর এক উপায় আছে, অতিভক্তির জাকজমক। যেটা মুক্তকেশীর ছেলেদের, আরো আমন অনেক ছেলেদের।
সুবৰ্ণর ছেলে দ্বিতীয় পথে যায় নি।
সুবৰ্ণর ছেলে সহজ পথটা ধরেছে।
রক্ত-মাংসের এই ঋণটা অশোধ্য একথা স্বীকার না করে সবটাই অবজ্ঞা দিয়ে ওড়াবে।
আর তারপর?
যখন বড় হবে?
যখন ওর নিজের রক্ত-মাংস ওর শত্রুতা করবে?
যখন সেই শত্রুর কাছে অসহায় হবে? দুর্বল হবে? চির অবজ্ঞেয় ওই জাতটার কাছে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া গতি থাকবে না?
তখন আরো আক্ৰোশে মরীয়া হবে, অন্ধকারের অসহায়তায় সাক্ষীকে দিনের আলোয় পায়ে
বেথুন ইস্কুলের বাড়িখানা আর একবার দেখবার বাসনাটা মেটে নি সেদিন সুবৰ্ণলতার, তবু সে তখনো একেবারে হতাশ হয় নি। তখনো খেয়াল করে নি, বংশধারার মূল উৎস থাকে অস্থিমজ্জার গভীরে, পরিবেশ বড় জোর পালিশ দিতে পারে, যেটা হয়তো আরো মারাত্মক। কখন কোন মুহূর্তে যে সেই পালিশের অন্তরাল থেকে বর্বরতার রূঢ় দাঁত উঁকি মারবে ধারণা থাকবে না, দাতের তীক্ষ্ণতায় দিশেহারা হতে হবে।
সুবৰ্ণলতা তার ছেলেকে পরিবেশ-মুক্ত করে নিয়ে এসেছিল, তাই তার ছেলের গায়ে পালিশ পড়েছে, নিষ্প্রভ করে দিয়েছে সে তার এ বাড়ির প্রথম গ্র্যাজুয়েট কাকাকে।
তবে কি কানু, মানু আর সুবলও এই এক রকমই হবে? দরজিপাড়ার সেই গলিটা এসে বাসা বাঁধিবে সুবৰ্ণলতার এই হালকা ছিমছাম ছবির মত গোলাপী রঙ বাড়িটার মধ্যে?
২.০৩ সুবৰ্ণলতাই বা এমন অনমনীয় কেন
কিন্তু সুবৰ্ণলতাই বা এমন অনমনীয় কেন?
কিছুতেই ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে না কেন? ভেঙে পড়তে পড়তে। আবার খাঁড়া হয়ে ওঠে। কেন? এত প্ৰতিবন্ধকতাতেও ধাড়ি মেয়ে পারুলকে সে স্কুলে ভর্তি করতে বদ্ধপরিকর কেন?
প্ৰবোধচন্দ্র বাইরে থেকে ঘুরে এসে রাগে গানগন করতে করতে বললো, এসব কি শুনছি! পাশের বাড়ির পরিমলবাবুর ছেলেকে দিয়ে নাকি
পারুকে ইস্কুলে ভর্তি করতে পাঠিয়েছিলে!
পাঠিয়েছিলাম তো –সুবৰ্ণ সহজ গলায় বলে, পারু বকু দুজনকেই।
চুলোয় যাক বকুল! পারুকে পাঠিয়েছিলে কী বলে?
এ পর্যন্ত ওটা ওর হয়ে ওঠে নি বলে।
হয়ে ওঠে নি বলে! প্ৰবোধ সহসা একটা কুৎসিত মুখভঙ্গী করে ওঠে, সেই ভয়ঙ্কর দরকারী কাজটা হয়ে ওঠে নি বলে রাজ্য রসাতলে গেছে? পৃথিবী উল্টে গেছে? চন্দ্ৰ-সূৰ্য খসে পড়েছে? তাই তুমি একটা ছোঁড়ার সঙ্গে ওই ধাড়ি ধিঙ্গী সোমত্ত মেয়েকে-
থামো! অসভ্যতা করো না।
ওঃ, বটে? অসভ্যতাটা হল আমার? আর তোমার কাজটা হয়েছে খুব সুসভ্য? পরের কাছে মুখাপেক্ষী হতেই বা গেলে কোন মুখে? এদিকে তো মানের জ্ঞান টনটনে!
অভাবে স্বভাব নষ্ট চিরকেলে কথা—, সুবর্ণ বলে, যার নিজের তিন কুলে করবার কেউ না। থাকে, পরের দরজায় হাত পাতবে এটাই স্বাভাবিক!
ওঃ! তোমার কেউ কিছু করে না? আচ্ছা নেমকহারাম মেয়েমানুষ বটে! বলে সারাটা জীবন এই ভেড়াটাকে একতিল স্বস্তি দিলে না, শান্তি দিলে না, বিশ্রাম দিলে না, নাকে দড়ি দিয়ে ছুটিয়ে মারলে, তবুও বলতে বাধছে না কেউ কিছু করে না?
সুবৰ্ণ স্থির স্বরে বলে, যা কিছু করেছ সব আমার জন্যে?
তা না তো কি? আমার জন্যে? আমার কী এত দরকার ছিল? মায়ের ছেলে মায়ের কাছে পড়ে থাকতাম—
সুবৰ্ণ ওই অপরিসীম ধৃষ্টতার দিকে তাকিয়ে বলে, শুধু মায়ের ছেলে? আর তোমার নিজের জঞ্জালের স্তূপ? তারা? তাদের কথা কে ভাবতো?
তারা তাদের বংশের ধারায় মানুষ হতো! এক-একটি সাহেব বিবি করে তোলার দরকার ছিল না কিছু। বলে দিচ্ছি, বকুল যায় যাক, পারুর কিছুতেই বিনুনি দুলিয়ে ইস্কুলে যাওয়া চলবে না, ব্যস!
পারু-যাবে।
কী বললে? আমি বারণ করছি। তবু পারু যাবে?
তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। আমি যা করেছি। বুঝেই করেছি। আর সেটা হবে। এই হচ্ছে আমার শেষ কথা!
শেষ কথা!
এই শেষ কথার উত্তরে আর কোন কথা বলতে পারতো সুবৰ্ণর স্বামী কে জানে, কিন্তু সুবর্ণর ছেলে কথা কয়ে উঠল। পাশের ঘর থেকে।
পাশের ঘরে কানু বসে খবরের কাগজ পড়ছিল এবং দু ঘরের মাঝখানের দরজা খোলা থাকার দরুন মা-বাপের প্ৰেমালাপ শুনছিল, হঠাৎ অসহিষ্ণু গলায় বলে উঠলো, মার মুখে চিরদিনই র সমালোচনা শুনে এসেছি, আর স্বভাবতই ভেবে এসেছি দোষ তাদেরই। এখন বুঝতে পারছি গলদটা কোথায়!
বললো।
এই কথা বললো সুবর্ণর মেজ ছেলে।
অসহিষ্ণু হয়ে বলে উঠলো।
