কারণ একবার যখন কথা দিয়েছেন মেজগিনী, আর সে কথার নড়াচড় হবে না। এই বেলা লাগিয়ে দেওয়া যাক!
অতএব–
অতএব গুরুমন্ত্রে দীক্ষা হলো সুবৰ্ণলতার। এ উপলক্ষে সমারোহের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। বিস্তর খরচ করে ফেললো প্ৰবোধ, বিস্তর গুরুদক্ষিণা দিলো। বললো, এতটা কাল ধরে এত রোজগার করছি, সে রোজগারে ভূতভোজন ছাড়া কখনো সৎকাজ হয় নি। এ তবু একটা সৎকাজ, একটা মহৎ কাজে লাগলো।
মুক্তকেশী এসে যজ্ঞের হাল ধরেছিলেন। যজ্ঞশেষে হৃষ্টচিত্তে সকলকে বলে বেড়াতে লাগলেন, জানি আমার পেবো যা করণ-কারণ করবে, মানুষের মতনই করবে। মেজবৌমারও স্বভাবটাই ক্ষ্যাপাটে, নজর উঁচু ! আর চিরকালের ভক্তিমতী! দেখেছি তো বরাবর, গো-ব্ৰাহ্মণ, গুরুপুরুত, কালী-গঙ্গা যখন যাতে খরচ করেছি, সব খরচ মেজবৌমাই যুগিয়েছে। যেচে যেচে সোধে সোধে। তা ভগবানও তেমনি বাড়বাড়ন্ত বাড়াচ্ছে। মনের গুনে ধন।
মেয়েদের বিয়ের সময় যখন ঐ পেবোই একটু খরচপত্তর বেশি করে ফেলেছিল, মুক্তকেশী ন ভূতো ন ভবিষ্যতি করেছিলেন। বলেছিলেন, চালচালিয়াতি দেখানো এসব!
কিন্তু এখন অন্য কথা বললেন।
এখন কি তাঁর সেই একদার ভবিষ্যৎবাণীর পরাজয়ে লজ্জিত হয়েছেন মুক্তকেশী? নাকি ছেলের এই বাড়িঘর, ঐশ্বর্য, বিভূতি সব দেখে অভিভূত হচ্ছেন?
তাই মুক্তকেশীর মুখ দিয়ে বেরোয়, কী খাসা ভাড়ারঘর মেজবৌমার, দেখলে প্ৰাণ জুড়োয়!
পেবো অবশ্য অনেকবার চুপিচুপি অনুরোধ জানিয়েছিল মাকে, এই থাকাতেই থেকে যেতে।
সুবৰ্ণলতাও তার স্বভাবগত উদারতায় বলে ফেলেছিল সে কথা। —তা বেশ তো—এখানেই কেন থাকুন না। এটাও তো আপনারই বাড়ি।
কিন্তু কেন কে জানে, মুক্তকেশী রাজী হন নি।
মুক্তকেশী যজ্ঞি তুলে দিয়েই চলে গিয়েছিলেন।
আর কখনো সেকথা নিয়ে কথা ওঠে নি।
শুধু সুবৰ্ণলতার বড় মেয়ে চাঁপা, যে নাকি এই উপলক্ষে এসেছিল, সে বলেছিল, ঢের ঢের মেয়েমানুষ দেখেছি বাবা, আমার মাটির মতন এমন বেহায়া দুটি দেখি নি! আবার সাহস হলো ঠাকুমাকে এখানে থাকার কথা বলতে?
কিন্তু সেটা একটা ধর্তব্য কথা নাকি?
চাঁপা তো চিরটা কালই তার মায়ের সমালোচনা করে। ওটা কিছু নয়।
তবে? তবে দুঃখটা কোথায়?
তবে কি সেই পারুর স্কুলে ভর্তি করার কথাটাতেই?
তা হতেও বা পারে!
চিরকালই তো তিলকে তাল করা সুবৰ্ণলতার স্বভাব।
২.০২ পারু বকুকে ইস্কুলে ভর্তি
পারু বকুকে ইস্কুলে ভর্তি করার কি হলো? কতদিন ধরে বলছি যে—
ভানুর কাছে এসে আবেদন জানিয়েছিল সুবৰ্ণলতা। বড় ছেলে, তার ওপর আস্থা এনেছিল, বলেছিল, তোদের বাপের দ্বারা হবে না, তোরা বড় হয়েছিস, তোরা নিবি ভার।
ভানু আজ-কাল করে এড়াচ্ছিল। একদিন ভুরু কোঁচকালো। ঠিক ওর সেজকাকা যেমন ভঙ্গীতে ভুরু কোঁচকায়।
ভুরু কুঁচকে বলেছিল, পারুকে এখনো ইস্কুলে ভর্তি করার সাধ তোমার? আশ্চর্য মা! অত বড় ধিঙ্গী মেয়ে ইস্কুলে যাবে?
যাবে।
স্থির স্বরে বলেছিল সুবৰ্ণলতা।
ভানু তথাপি কথা কেটেছিল, গিয়ে তো ভর্তি হবে সেই ক্ষুদে ক্ষুদে মেয়েদের সঙ্গে! লজ্জা করবে না।
সুবৰ্ণলতা একবার ছেলের ঐ বিরক্তি-কুঞ্চিত মুখের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টি হেনে বলেছিল, লজ্জা তো। ওর করবার কথা, লজ্জা করবার কথা ওর বাপ-ভাইয়ের নয়। বাবা। কিন্তু একের অপরাধের লজ্জা অপরকে বইতে হয়, এই হচ্ছে আমাদের দেশের রীতি। তাই হয়তো করবে লজ্জা। কিন্তু উপায় কি? একেবারে ঘরে বসে থাকলে তো লজ্জা আরো বেড়েই চলবে।
ভানু যে মাকে ভয় করে না তা নয়!
ভিতরে ভিতরে যথেষ্ট করে।
কিন্তু অতটা ভয় করে বলেই হয়তো বাইরে নির্ভয়-এর ভাব ফোঁটাবার চেষ্টা করে। তাই অগ্রাহ্যাভরে বলে, লজ্জার কি আছে? দিদি, চন্নন, ও বাড়ির সব মেয়েরা, সবাই লজ্জায় একেবারে মরে আছে। আর এই বুড়োবয়সে তোমার পারুলের ইস্কুলে ভর্তি হয়ে হবেটা কি? রাতদিন তো নাটক-নভেল গেলা হচ্ছে মেয়ের, আবার শুনি পদ্য লেখেন, আর দরকার?
সুবৰ্ণলতা আজকাল অনেক আত্মস্থ হয়েছে বৈকি। অনেক নিরুত্তাপ। তাই ফেটে না পড়ে সেই নিরুত্তাপ গলায় বলে, মনের অন্য কোনো খোরাক নেই বলেই নাটক-নভেল পড়ে। লেখাপড়ার চাপ থাকলে করবে না। যাক, তুমি পারবে কিনা সেটাই বল!
পারা না-পারার কথা হচ্ছে না, ভানু বিরক্ত গলায় বলে, এরকম বিশ্ৰী কাজ করতে যে কী মুশকিল লাগে সে ধারণা নেই তোমাদের। তোমরা স্রেফ হুকুম করেই খালাস। তালগাছের মত এক মেয়ে নিয়ে ভর্তি করাতে যেতে হবে প্রাইমারী স্কুলে! মাথা কাটা যাবে না?
সুবৰ্ণলতার বড় সাধ ছিল যে তার ছেলেরা বাড়ির ঐ অকালবৃদ্ধ কর্তাদের ভাষা থেকে অন্য কোনো পৃথক ভাষায় কথা বলবে। যে কথার ভাষা হবে মার্জিত, সভ্য, সুন্দর। যাতে থাকবে তারুণ্যের ঔজ্জ্বল্য, কৈশোরের মাধুর্য, শৈশবের লাবণ্য।
সুবৰ্ণর সে সাধ মেটে নি।
পাগলের সব সাধ মেটাও শক্ত বৈকি।
তা ছাড়া কথা শেখার সমস্ত বয়েসটা পার করে ফেলে তবে তো ঐ অকালবৃদ্ধদের আবেষ্টন ছেড়ে আসতে পেরেছে সুবৰ্ণলতার ছেলেরা!
তা ছাড়া একখানি বড় রকমের আদর্শ তো চোখের সামনেই আছে!
তাই ভানু কৰ্তাদের ভাষাতেই কথা বলে।
বলে, মাথাটা কাটা যাবে না?
সুবৰ্ণলতা ঐ মাথা কাটার কথাটা নিয়ে আর কথা-কাটাকাটি করে না। সুবৰ্ণলতা শুধু ঠোঁটটা কামড়ে বলে, প্রাইমারী ইস্কুলে ভর্তি করতে হবে কেন? বলেছি তো অনেকবার, পারু নিজের চেষ্টায় যতটা শিখেছে, তাতে চার-পাঁচটা ক্লাসের পড়া হয়ে গেছে। সেই বুঝে উঁচু ইস্কুলেই দেবে।
