সুখী, সন্তুষ্ট, সব আশা মিটে যাওয়ায় সম্পূর্ণ আর পরিতৃপ্ত সুবৰ্ণলতার জীবনকাহিনীতে তবে এরাবার পূর্ণচ্ছেদ টেনে দেওয়া যায়।
এরপর আর কি?
বাঙালী গোরস্তঘরের একটা মেয়ে এর বেশি আর কি আশা করতে পারে? আর কোন প্ৰাপ্যের স্বপ্ন দেখতে পারে?
চরম সার্থতা আর পরম সুখের মধ্যে বসে একটির পর একটি ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বৌ আনা, আর বাকি মেয়ে দুটোকে পার করা। এই তো!
তা তাতেই বা কোথায় ঠেক খেতে হবে?
তিনটে ছেলে তো মানুষ হয়ে উঠলই, ছোটটাও হবে নিশ্চিত। লেখাপড়ায় রীতিমত ভালো। শেষের দিকের মেয়ে দুটো পারুল আর বকুল, দেখতে-শুনতে তো দিব্বি সুন্দরী, কাজেই ওদের নিয়ে ঝামেলা নেই। যে দেখবে পছন্দ করবে। পণের টাকা দিতেও পিছপা হবে না প্ৰবোধ।
টাকা সে রোজগারও যেমন করে অগাধ, খরচেও তেমনি অকাতর এখনো। হয়তো এ নেশা ধরিয়ে দিয়েছে সুবৰ্ণই। খরচের নেশা!… কিন্তু হয়েছে নেশা!
অতএব?
অতএব সুবৰ্ণলতাকে নিয়ে লেখার আর কিছু নেই।
গৃহপ্রবেশের সময় কিছু হয় নি, তাই তার কাছাকাছি সময়ে এই উপলক্ষটা নিয়ে লোকজন য়েছিল প্ৰবোধ।
কিন্তু এ ঘটনার মধ্যে সে প্রশ্নের উত্তর কোথায়?
এ তো রীতিমত সুখাবহ ঘটনা!
তবে সুবৰ্ণলতার রীতি অনুযায়ী হয়তো দুঃখের। ওর তো সবই বিপরীত। যারা ওকে নিয়ে ঘর করেছে আর জ্বলোপুড়ে মরেছে তারা সবাই বলেছে, বিপরীত! সব বিপরীত! বিপরীত বুদ্ধি, বিপরীত চিন্তা, বিপরীত আচার-আচরণ!
অতএব ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করেই দেখা যাক।
প্রথমে নাকি প্রস্তাবটা তুলেছিল প্ৰবোধই। আর সেই প্ৰথমে নাকি সুবৰ্ণলতা বলেছিল, গুরুমন্ত্রটন্ত্র নিচ্ছি না এখন। যদি কখনো তেমন ইচ্ছা হয়, যদি কাউকে এমন দেখি মাথা। আপনি নত হতে চাইছে, গুরু বলে, তখন দেখা যাবে।
আলাদা হয়ে আসার পর কিছুদিন চক্ষুলজ্জায় ও-বাড়ি যেতে পারে নি প্ৰবোধ, কিন্তু সুবৰ্ণলতার প্ররোচনাতেই যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত। মায়ের হাতখরচ বলে মাসিক পচিশ টাকা করে দিয়ে পাঠিয়েছে সুবর্ণ একরকম জোর করে।
প্ৰবোধ বলেছে, অত ধাষ্টামো করতে আমি পারবো না। ও টাকা মা পা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন!
সুবৰ্ণ বলেছিল, একবার ফেলে দেন, তুমি বার বার পায়ে ধরে নিইয়ে ছাড়বে! মায়ের পায়ে ধরায় তো লজ্জাও নেই, অমান্যিও নেই!
তা শেষ পর্যন্ত যেতে হয়েছিল।
যদিও ছোট ভাইরা বাঁকা হাসি হেসে তুমি যে হঠাৎ বলে উত্তরটা না নিয়েই চলে গিয়েছিল, এবং সুবোধ গম্ভীর-গম্ভীর বিষণ্ণ-বিষাণু মুখে বলে ছিল, ভাল আছ তো? ছেলেপুলে সব ভালো? আর বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো আশপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারছিল, কথা বলে নি, আর মুক্তকেশী দেখেই ড়ুকরে কেঁদে উঠেছিলেন, তথাপি টাকাটার সদগতি হয়েছিল।
পা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন নি মুক্তকেশী। শুধু ভারী মুখে বলেছিলেন, তুমি যখন লজ্জার মাথা খেয়ে আগ্রহ করে দিতে এসেছি, তখন আর তোমার মুখটা ছোট করবো না! দিচ্ছি রাখছি। তবে কেন আর ছেঁড়াচুলে খোঁপা বাঁধার চেষ্টা? তুমি তো সব সম্পর্ক তুলেই দিয়েছ!
উঁচোনো খাঁড়া ঘাড়ে পড়ে নি। ঐ পর্যন্তই হয়েছে।
তা সেদিনের সেই নিশ্চিন্ততার পর থেকে প্ৰবোধ নিত্য ওপাড়ায় যাত্রী। ওপাড়ার তাসের আড্ডাও প্ৰবোধহীন হচ্ছে না।
আর মজা এই—বাড়িতে থাকাকালে দিনান্তে মায়ের সঙ্গে যতটুকু গল্প হতো, মায়ের কাছে যতটুকু বসা হতো, তার চতুগুণ হচ্ছে এখন। আর সেই অবসরেই মুক্তকেশী তার অন্য ছেলেবৌদের সমালোচনা করে করে মনের ভার মুক্ত হয়ে একদিন ঐ গুরুমন্ত্রের কথা তুলেছিলেন।
ওটা না হলে তোর আর হাতের জল শুদ্ধ হবে না! এতখানি বয়েস হলো, অদীক্ষিত শরীর নিয়ে থাকা! ছিঃ!
তা ছাড়া মরণের তো ধরন ঠিক করা নেই। কাজেই হঠাৎ একদিন যদি দেহই রক্ষা করে বসে সুবৰ্ণলতা তো সেই অদীক্ষিত দেহের গতি হবে?
সুবৰ্ণলতা বরের মুখে শুনে হেসে উঠেছিল। বলেছিল, গতিটা কি দেহের? না আত্মার? তোমাদের ঐ কুলগুরুর বংশধর বলেই যে ঐ গাঁজাখের শুটকো ছেলেটাকে গুরু বলে পা-পূজো করতে বসবো, সে আমার দ্বারা হবে না।
এ কথা শুনলে, ঘরে-পরে কে না ছি-ছিক্কার করবে। সুবৰ্ণলতাকে? করেছিল। তাই!
বলেছিল, এসব হচ্ছে টাকার গরম!
এমন কি যার টাকার উত্তাপে এত গরম সুবৰ্ণলতার, সেই প্ৰবোধই বলেছিল, দুটো টাকা হয়েছে বলেই তার গরমে ধারাকে সারা দেখো না মেজবৌ! সেই যে মা বলে, ভগবান বলে—দেব ধন, দেখবো মন, কেড়ে নিতে কতক্ষণ? সেটাই হচ্ছে সার কথা! ভগবান মানুষকে দেন, দিয়ে পরীক্ষা করেন।
সুবৰ্ণলতা হেসে ফেলেছিল।
তোমার মুখে ভগবানের বাণী! এ যেন ভূতের মুখে রামনামের মত। কিন্তু কি করবো বল? যাকে গুরু বলে মন সায় না। মানে–
প্ৰবোধ রেগে উঠে বলেছিল, তা তোমার গুরু হতে হলে তো মাইকেল, নবীন সেন, বঙ্কিমচন্দ্ৰ, কি রবিঠাকুরকে ধরতে হয়! তাঁরা আসবেন তোমার দেহশুদ্ধির ভার নিতে? দীক্ষাহীন দেহের হাতের জল শুদ্ধ হয় না তা জানো?
এই কথা!
যেন কে না জানে, এই কথা! বলে সুবৰ্ণ যেন একটু মাত্র-ছাড়া হাসি হেসেছিল। তারপর হাসির চোখমুখ সামলে বলেছিল, শুধু দেহ? তার জন্যে এত দুশ্চিন্তা? তা নেব তাহলে মন্তর! ঐ তোমাদের গেঁজেল গুরুপুত্ত্বরের কাছেই নেবা! দেহটার মালিক যখন তুমি, তখন তোমার মনের মতন কোজই হোক।
প্ৰবোধ অবশ্য ঐ হাসি আর কথার মানেটা খুব একটা হৃদয়ঙ্গম করে নি, তবে চেষ্টাও করে নি। হৃদয়ঙ্গম করতে বোঝা যাচ্ছে রাজী হয়ে গেছে, আর ভয় নেই।
