হয়তো সুবৰ্ণলতা তেমনিই অবিশ্বাস্য-অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক সব ঘটনা ঘটাচ্ছিল, হয়তো মুক্তকেশীর মেজ ছেলে তেমনিই সর্বসমক্ষে একবার করে তেড়ে উঠে বৌকে শাসন করছিল, আর একবার করে আড়ালে গিয়ে নাক-কান মলছিল। আর পায়ে ধরছিল।.
হয়তো সুবৰ্ণলতা সেই ঘৃণায় আর ধিক্কারে আবারও ভাবতে বসেছিল কোনটা সহজ? কোনটা বেশি কার্যকরী? বিষ না দড়ি? আগুন না জল? আর শেষ পর্যন্ত কোনোটাই সহজ নয় দেখে রান্নাঘরে নেমে গিয়ে বলেছিল, বামুনদি, আমায় আগে চারটি দিয়ে দাও তো! শুয়ে পড়ি গিয়ে!
আর কি হবে?
দরজিপাড়ার ঐ গালিটার মধ্যে আর কোন স্বাদের বাতাস এসে ঢুকবে? আর কোন বৈচিত্র্যের বাণী উচ্চারিত হবে?
তবে বৈচিত্র্যের কথা যদি বলতে হয় তো বলা যায়— মুক্তকেশীর বড়জামাই কেদারনাথ মুক্তকেশীর মুখরক্ষার চিন্তা না করেই দেহরক্ষা করেছেন, আর পেটরোগা সুশীলা হঠাৎ আলোচাল মটরডাল বাটার খপ্পরে পড়ে গিয়ে রক্ত অতিসারে ভুগছেন। আর বৈচিত্র্য— উনিশ বছরের মল্লিকা বিধবা হয়ে এসে ঠাকুরমার হেঁসেলে ভর্তি হয়ে ইস্তক শুদ্ধাচারের বহর বাড়াতে বাড়াতে হাতেপায়ে হাজা ধরিয়ে বসেছে।
মুক্তকেশী আক্ষেপ করে বলেন, মনে করেছিলাম পোড়াকপালী সর্বখাকী এসে তবু আমার একটু সুসার হলো, আমার হাত-নুড়িকুৎ হবে, আমাকে এক ঘটি জল দেবে! তা নয়, আমি এই তিন ঠেঙে বুড়ী ঐ দস্যির ভাত রোধে মরছি!
বড় দুঃখেই বলেন। অবশ্য।
বৌদের পিত্যেশ জীবনে কখনো করেন নি, এখনও চান যে অহঙ্কারের মাথায় নিজের ভাত নিজে ফুটিয়ে খেতে খেতে চলে যাবেন, কিন্তু কোমরটা বড়ই বাদ সাধছে।
এখন টের পাচ্ছেন কেন বলে, কোমরের বল আসিল বল!
মল্লিকাটার কপাল পোড়ায় নিজের কপাল ছেচেছিলেন সত্যি, তবু ভেবেছিলেন, এ তো পরের মেয়ে নয়, ঘরের মেয়ে, এর কাছে একটু পিত্যেশ করলে অহঙ্কার খর্ব হবে না। তা উল্টো বিপরীত। তার ভাত নিয়েই ডেকে ডেকে মরতে হয়, স্নান আর শেষ হয় না তার।
তা ছাড়া বৌরাই বা কে কোথায়?
সেই বাধানো সংসার আর নেই এখন। বড়বৌয়ের শরীর ভেঙেছে, মন ভেঙেছে, মেজবৌ বরের পয়সার দেমাকে এ বাড়ির ভাগ ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র বাড়ি হাঁকড়েছেন। সেজ, ছোট, দুই বৌ একই রান্নাঘরে ভিন্ন হাঁড়ি।… মুক্তকেশী এখন ভাগের মা!
তবু মেজটারই চোখের চামড়া আছে, দূরে থেকেও মুক্তকেশীর ব্যয়ভার বহন করে সে, সময় অসময়ে দেখে, মুক্তকেশীর ইচ্ছেপূরণের খাতে যা খরচাপত্র হয় দায় পোহায়।
সুবোধের সামান্য কটি টাকা পেনসন, করবেই বা কি? আর দুটো তো কঞ্জুসের একশেষ।
…নিজের সেই জমজমাট সংসার আর দাপটের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে নিঃশ্বাস পড়ে মুক্তকেশীর…নিতান্ত রাগের সময় ঘরে বসে আঙুল মটকানো আর গাল দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। এমন কি গলাটা সুদ্ধ বাদ সোধেছে, চেঁচিয়ে কাউকে বিকতে গেলেই কাশতে কাশতে দম আটকে আসে।… অতএব আঙুল মটকান, আর ভাঙাগলায় থেমে থেমে বলেন, মরছেন সব চক্ষুছরদের অহঙ্কার মরছেন! আমিও মুক্তকেশী বামনী, এই বাসিমুখে বলে যাচ্ছি, যে দুগ্ৰগতি আমার হচ্ছে, সে দুগ্ৰগতি তোদেরও হোক।
কিন্তু সেই ওরা কারা?
শুধু কি মুক্তকেশীর বৌ কটা?
তা বললে অবিচার করা হবে। মুক্তকেশী অত একচোখা নন। মুক্তকেশী তার নিজের মেয়েকেও বলেন। বিরাজ যখন বেড়াতে এসে ভাই-ভাজদের কাছে সারাক্ষণ কাটিয়ে চলে যাবার সময় একবার এ-ঘরে এসে ঢোকে, বলে মা কেমন আছ গো? তখন মুক্তকেশী ভারীমুখে বলেন, খুব হয়েছে! আর মার সোহাগে কাজ নেই বাছা। যাদের চক্ষুছরদ আছে, তাদের কাছেই বোসো গে।
আর চলে গেলে বিড় বিড় করেন।
কিন্তু সে তো শেষের দিকে।
সুবৰ্ণ যখন ঘর ভাঙলো তখন কি মুক্তকেশীর কোমর ভেঙেছিল?
নাঃ, তখনও মুক্তকেশীর কোমর ভাঙে নি!
তখনও মুক্তকেশী কিছুটা শক্ত ছিলেন।
তখন মুক্তকেশীর শাপ-শাপান্তের গলা আকাশে উঠেছে। তখন মুক্তকেশী বৌ ভেন্ন হয়ে যাওয়ায় বুক চাপড়েছেন, নেচে বেড়িয়েছেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আবার মাথা হেট করে ফিরে আসতে হবে। থোতামুখ ভোঁতা হবে!
হবেই।
কারণ ভেন্ন হয়ে বুঝবে কত ধানে কত চাল। এখন পাঁচজনের ওপর দিয়ে সংসারের দায় উদ্ধার হচ্ছে।
কিন্তু মুক্তকেশীর সে বাণী সফল হয়নি।
সুবৰ্ণ ফিরে আসেনি।
সুবৰ্ণ সেই ভাড়াটে বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে উঠে গিয়েছিল।
এজমালি এই বাড়িটার নিজের অংশের ঘরখানা চাবিবন্ধ করে রেখে যায় নি। সুবর্ণ, তার জন্যে টাকাও চায় নি। এমন কি ধীরে ধীরে যে দু। চারটি আসবাবপত্র জমে উঠেছিল কাঁচা-পয়সাওলা প্ৰবোধের, সে-সবেরও কিছু নিয়ে যায় নি।
নিয়ে যায় নি নিজের বাসনপত্ৰ।
শুধু পরবার কাপড়-চোপড় আর শোয়ার বিছানা—এই সম্বল করে বেরিয়ে পড়েছিল এই গলি থেকে। একদা যে গলিতে ঢুকে মর্মান্তিক রকমের ঠিকেছিল সুবর্ণ। নতুন চুনের আর নতুন রঙের কাঁচা গন্ধে ভরা একখানা বাড়ির গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়িয়েছিল দক্ষিণের বারান্দা খুঁজতে।
অবশেষে দক্ষিণের বারান্দা হলো সুবৰ্ণলতার। বড় রাস্তার ধারে।
সবুজ রেলিং ঘেরা, লাল পালিশ-করা মেঝে, চওড়া বারান্দা।
সেই বারান্দার কোলে টানা লম্বা, বড় ঘর।
পূবে জানালা, দক্ষিণে দরজা।
ঐ পুবটাকে আচ্ছন্ন করে কোনো বাড়ি ওঠে নি। খোলা একখানা মাঠ পড়ে আছে। ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে ভোরবেলায় সূর্য-ওঠা দেখতে পাওয়া যায়।
আর কি তবে চাইবার রইল সুবৰ্ণলতার?
আর কি রইল অসন্তোষ করবার? অভিযোগ করবার? উত্তাল হবার? বিষণ্ণ হবার?
