শ্যামাসুন্দরীর চিরদিনের দোষ, শ্যামাসুন্দরী ন্যায়পক্ষ সমর্থন করে বসেন।
অন্তত ওঁর কাছে যেটা ন্যায় মনে হয়। তাই শ্যামাসুন্দরী অসন্তুষ্ট গলায় বলেন, এ তোমার কি কথা ঠাকুরঝি? ছেলে দোষ করলে জেঠি, খুড়ি, ঠাকুমা, পিসিতে শাসন করবে না?
করবে। শাসন, তাই বলে খুন করে নয়! সেজবৌমা ঠিক কথাই বলেছে, ওর হাতে দড়ি পরানোই উচিত।
হ্যাঁ, সেই কথাই বলেছে গিরিবালা।
বলেছে, ওঁর হাতে যদি আমি দড়ি পরাতে না পারি তো আমার নাম নেই। আমিও একটা উঁকিলের পরিবার। কিসে কি হয় জানতে বাকি নেই আমার!
কিন্তু উঁকিলের পরিবারের সেই দম্ভোক্তি কি সত্যিই কার্যকরী হয়েছিল?
সুবৰ্ণলতা নামের বেঁটার হাতে দড়ি পড়েছিল?
তা যদি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই চাপা ও মল্লিকা নামে মেয়ে দুটোর বিয়ে হয়ে ওঠে নি?
সংসারে একটা ভয়াবহ তছনছ কাণ্ড ঘটে গেছে?
তা সেদিনের সেই পরিস্থিতি মনে করলে তাই মনে হয় বটে!
কিন্তু সেসবের কিছুই হয় নি, যথারীতিই সর্ববিধ অনুষ্ঠান সহকারে বিয়ে হয়ে গেছে।
না হবে কেন?
একেই তো জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, তিন বিধাতা নিয়ে।
তাছাড়া বাঙালী মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষগুলোর মত এমন মজবুত জীব অল্পই আছে।
এরা জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না, খাঁড়ায় কাটে না। মনে হয় গোল গেল সব গোল—, আবার দেখা যায়, কই কিছুই হল না।
আবার যথারীতি সংসারে ভাত চড়ে, ডাল চড়ে, খাওয়া-শোওয়া হয়, কচিগুলো বড়ো এবং বড়গুলো বুড়ো হতে থাকে, এবং তিন বিধাতা ঘটিত ওই জীবনলীলা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে।
মুক্তকেশীর সংসারেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি।
বিয়েতে শাক বেজেছে, উলু পড়েছে, লোকজন খেয়েছে, জগু এসে বিরাট হাঁকডাক সহযোগে যজ্ঞি দেখেছে ও পরিবেশন করেছে এবং শ্যামসুন্দরীও অন্তঃপুরের অনেক কাজ সমাধা করেছেন। এবং মুক্তকেশী নাতজামাইদের নিয়ে রঙ্গরস করেছেন।
মোটের মাথায় অনুষ্ঠানের ক্রটি হয় নি।
শুধু বিরাজ তখন আর একবার মৃত সন্তানের জের টেনে আঁতুড়ঘরে বসে থেকেছে, আসতে পারে নি, আর আসা হয় নি। সুবালার।
সুবালার সংসারে তখন দু-দুটো বিপৎপাত।
একে তো ফুলেশ্বরী হঠাৎ মারা গেলেন, তার উপর হঠাৎ ওই অসময়েই ঘাড়ের উপর উঁচোনো খাঁড়াখানা ঘাড়ে পড়লো সুবালাদের।
অম্বিকা ধরা পড়লো।
অম্বিকার জেল হলো।
হবারই কথা।
আশঙ্কার প্রহরই তো গুনছিল। সে যাক–বিয়েতে যে আসা হল না সেটাই হচ্ছে কথা।
তবে সব শূন্যতার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল মুক্তকেশীর সুরাজের আসায়।
বিয়েতে সুরাজ এসেছিল।
অবস্থা আরো ফিরেছে, স্বামীর আরো পদমর্যাদা হয়েছে। দুই ভাইঝিকে দু-দুখানা গহনা দিয়েছে।
আর তারপর?
২.০১ তারপর দিন গড়িয়ে যাচ্ছে
দ্বিতীয় পর্ব
তারপর দিন গড়িয়ে যাচ্ছে।
অনেকগুলো বর্ষা, বসন্ত, শীত, গ্ৰীষ্মের আসা-যাওয়ার সূত্র ধরে
মানুষের চেহারাগুলোর পরিবর্তন ঘটেছে।
চেহারা?
তা শুধু চেহারাই।
স্বভাব নামক বস্তুটার তো মৃত্যু নেই। ও নাকি মৃত্যুর ওপার পর্যন্ত ধাওয়া করে নিজের খাজনা আদায় করে নেয়।
তাই কাঁচা চুলে পাক ধরে, চোখ কান দাঁত আপন আপনি ডিউটি সেরে বিদায় নিতে তৎপর হয়, শুধু স্বভাব তার আপনি চেয়ারে বসে কাজ করে চলে।
দিন আর রাত্রির অজস্র আনাগোনায় অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, কেটে গেছে অনেক বিষণ্ণ প্রহর, অনেক দুঃসহ দণ্ড আর পল। সেদিন যারা জীবন নাটকের খাতাখাতা খুলে মঞ্চে ঘোরাফেরা করছিল, অনেক অঙ্ক, অনেক গর্ভাঙ্ক পার হয়ে গেল তারা।
স্বদেশী নামের যে দুরন্ত ক্ষ্যাপামিটা। তছনছ করে বেড়াচ্ছিল শৃঙ্খলা আর শৃঙ্খল, সেই ক্ষ্যাপামিটা যেন নিজেরাই তছনছ হয়ে গেল গুলির বারুদে, ফাঁসির দড়িতে, অন্তহীন কারাগারের অন্ধকারে। হারিয়ে গেল অন্য শাসনের আশ্রয়ে পালিয়ে গিয়ে, চালান হয়ে গেল কালাপানি পারের পুলি-পোলাও নামের মজাদার দেশে!… শুরু হলো পাকা মাথার পাকামি। আলাপ আর আলোচনা, আবদেন। আর নিবেদন। এই পথে আসবে স্বাধীনতা।
এঁরা বিজ্ঞ, এরা পণ্ডিত, এঁরা বুদ্ধিমান।
এরা ক্ষ্যাপার দলের ক্ষ্যাপা নন।
অনেক ক্ষ্যাপার মধ্যে একটা ক্ষ্যাপা অম্বিকা নামের সেই ছেলেটা নাকি কোথাকার কোন গারদে পচছে, কিন্তু তার জন্যে পৃথিবীর কোথাও কিছুই কি আটকে থাকলো?
নাঃ, আটকে থাকলো না কিছুই!
শুধু অবহেলা আর অসতর্কতার অবসরে হারিয়ে গেল সুবৰ্ণলতার জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়। ছড়ানো ছেঁড়া পৃষ্ঠাগুলো বার বার উল্টোপাল্টেও কোথাও সেই ইতিবৃত্তের সূত্রটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে সুবৰ্ণলতার ঘরভাঙার বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে।
অথচ দেখা যাচ্ছে, সুবৰ্ণলতা ঘর ভেঙে বেরিয়ে এসে আবার ঘর গড়েছে।
কিন্তু অধ্যায়গুলোতে কি নতুনত্ব ছিল কিছু? চাঁপার পর চন্ননের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল; উল্লেখযোগ্য শুধু এইটুকুই। কারণ মানুষের ইতিহাসের বিশেষ তিনটি ঘটনার মধ্যে ওটা নাকি অন্যতম।
তা শুধু ঐ চন্ননের বিয়ে!
তা ছাড়া আর কি?
সুবৰ্ণলতার বাকি ছেলেগুলোর গায়ের জামার মাপ বাড়তে বাড়তে প্ৰমাণ সাইজে গিয়ে ঠেকেছিল, এটাও যদি খবর হয় তো খবর। অথবা মুক্তকেশীর ছেলেদের চুলে পাক ধরেছিল, মুক্তকেশীর কোমরটা ভেঙে ধনুক হয়ে যাচ্ছিল, আর মুক্তকেশীর বৌর আর শাশুড়ীর দরজায় গিয়ে মা আজ কি কুটনো কুটবো? এই গুরুতর প্রশ্নটা করতে মাঝে-মাঝেই ভুলে যাচ্ছিল–এসবকেও খবরের দলে ফেলতে চাইলে ছিল খবর!
কিন্তু সবচেয়ে বড় খবর তো স্বভাব নামক জিনিসটা নাকি মরে গেলেও বদলায় না। তাই বাকি ঘটনাগুলোর ছাঁচ খুব বেশি বদলেছিল বলে মনে হয় না।
