শ্যামাসুন্দরী ছেলেকে চেনেন, ওই পীলে-পেটাকে যে আর নড়ানো যাবে না, রসগোল্লা খাইয়ে রাজসমাদরেই রাখতে হবে, তা তিনি নিশ্চিত অবলোকন করছেন। তবু সহজে হার স্বীকার না করে ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, না থাকে আনতে কতক্ষণ। এখুনি তো ছুটতে পারো তুমি! কিন্তু বাড়িতে না-হক একটা পুষ্যি বাড়াতে আমি পারব না জগা, বয়েস বাড়ছে বৈ কমছে না। আমার! পারব না। আর খাটতে-
জগু এবার উদ্দীপ্ত হয়।
বলে, মা তুমি যে দেখছি তোমার ননদের ওপর এককাঠি সরেস হলে! মুখ ফুটে বলতে পারলে এ কথা? ওর জন্য কালিয়া পোলাও রাঁধতে হবে, বলেছি। এ কথা? দুবেলা দুমুঠে পোরের ভাত আর কাচকলা সেদ্ধ, এই তো ব্যাপার। লোকে গরু পোষে কুকুর বিড়াল পোষে, আর একটা মানুষের ছেলেকে দূর দূর করছে? ছি ছি!
তা সে তুই আমার শতেক ছি, দে-শ্যামাসুন্দরী অনমনীয় গলায় বলেন, বুড়ো বয়সে একটা খোকা পুষে তার পোরের ভাত রাঁধতে বসতে পারব না, ব্যস। ভারী হিতৈষী ছেলে আমার! সেই যে বলে না— ভাল করতে পারি না মন্দ করতে পারি, কি দিবি তাই বল, তো হয়েছে তাই।… শ্যামাসুন্দরী সহজে একসঙ্গে এত কথা বলেন না, কিন্তু আজ ছেলের গোয়াতুমি বায়নায় মেজাজ খাপ্পা হয়ে গেছে তাঁর। পাড়ার একটা ছুতোরের ছেলে, তার দিদিমা মরেছে কি ঠাকুমা মরেছে, তার ভাত রাধবার লোক নেই, এই যুক্তি দিয়ে কিনা একটা রুগীকে এনে মার গলায় গেথে দিতে চায়!
বামুনের ছেলে হলেও বা ভবিষ্যতের একটা আশা ছিল। দিনে আদিনে, কিছু না হোক, জগাকেও এক ঘটি জল দিতে পারতো! কিন্তু এ কি!
ছুতোরের ছেলে।
একেবারে জল অচল!
তারপর শক্তিপোক্ত নয় যে চাকরের কাজও করবে।
তবে?
শুধু শুধু কেন শ্যামাসুন্দরী এই নিৰ্ব্বঞাটি সংসারে অত বড় একটা ঝ ঞােট ঢোকাবেন? একটা আট-দশ বছরের ছেলে, সে তো খোকার সামিল। বুড়ো বয়সে একটা খোকা পুষিবেন শ্যামাসুন্দরী?
রেগে বলেন, গরু পুরুষ দুধ আসে, কুকুর বেড়ালেও উপকার আছে, এর থেকে কি উপকার পাওয়া যাবে?
উপকার!
জগু হঠাৎ সত্যিকার রেগে ওঠে।
ফুলে দেড়া হয়ে উঠে বলে, উপকার পাবে কি না ভেবে তুমি দয়া দেখাবে? থাক মা, দরকার নেই, তোমার ওই ওজন-করা দয়ায় দরকার নেই। উঃ, এমন কথা শোনার আগে জগার মরণ হোল না কেন! ঠিক আছে, ভাত তোমায় রাধতে হবে না, জায়গাও দিতে হবে না। চল রে নিতাই-ভুল করে এনেছিলাম তোকে, বাড়িটা যে জগার বাপের নয়, সেটা খেয়াল ছিল না।
ছেলেটার হাত ধরে টান দেয় জগু।
বলে, ভালো বাড়িতে এনেছিলাম তোকে, শিক্ষা পেলি ভালো! এরপর আর কখনো বামুনবাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াসনি। হ্যাঁ, বরং কসাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় চাইবি, তবু বামুনবাড়ির নয়।… কী কথা কানে শুনলাম, ছিছি! কিনা ওকে যে আমি দয়া করবো, ও আমার কি উপকারে আসবে?
জগু বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ায়।
শ্যামাসুন্দরী প্রমাদ গনেন।
বোঝেন জগু সত্যিই রেগেছে।
আর সত্যি রাগলে পাঁচ দিন জলস্পর্শ করবে না।
উপায় নেই। ছোঁড়াকে গলায় গাথতেই হবে। তবে নরম হওয়া তো চলবে না, তিনিও জগুর মা? তাই তীব্ৰস্বরে বলেন, দেখ জগা, রাগ বাড়িয়ে দিস নো! যা দিকিনি এক পা, দেখি কেমন যাস!
যাব না? তোমার কথায় নাকি? বলে হঠাৎ পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়ায় জগু, এবং উচ্চ উদাস স্বরে বলে, দেখ নিতাই, দেখে নে, এত বড় একটা বুড়ো মর্দার মান-প্রতিষ্ঠাটা একবার দেখে নে। রাগ করে বেরিয়ে যাবার স্বাধীনতাটুকুও নেই। এই অসহায় অবলা জীবটাকে আবার একটা মনিষ্যি জ্ঞান করে তোর বাবা মুরু কবী ধরেছে। হুঁ!
দাওয়ায় এসে বসে পড়ে নিতাইকে কাছে নিয়ে। যেন সেও ওর মতই বাইরে থেকে প্ৰাৰ্থ হয়ে এসেছে। নিতাই বিস্ময়াহত দৃষ্টি মেলে বসে থাকে।
শ্যামাসুন্দরী আর দ্বিরুক্তি না করে ঘর থেকে একখানা শালপাতায় করে পয়সায় দুগণ্ডা। রসমুণ্ডির গোটাচারেক এনে ধরে দিয়ে জোরালো গলায় বলেন, কলে মুখ দিয়ে জল খাওয়া চলবে, না গেলাসে করে দিতে হবে?
সহসা জগু অন্যমূর্তি ধরে।
যেন সে মানুষই নয়।
চড়া গলায় বলে, গেলাসে করে জল দিতে হবে? কেন, আমার গুরুপুত্ত্বরের ঠাকুর্দা এসেছে? কলে মুখ দিয়ে জল ওর ঘাড় খাবে না? দেখা নিতাই, ওসব রাজকায়দা যদি করতে আসিস, পোষাবে না! বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ-কন্যা তোকে খাবার জল গড়িয়ে দেবে, আর তুই তাই খাবি? ছিঃ ছিঃ! হ্যাঁ, একথা যদি বলিস এই রাসমুণ্ডি কাটা আমার জগরাগ্নির কাছে নাস্যি হল গো দিদিমা, আর গোটা চার-পাঁচ দাও, সে আলাদা কথা! ক্ষিদের কাছে চক্ষুলজ্জা নেই। তা বলে কলে জল খাব না। এ বায়না করতে পাবি না।
শ্যামাসুন্দরী কড়া চোখে একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে আবার একেবারে পুরো এক পয়সার রসমুণ্ডি এনে বসিয়ে দিয়ে বলেন, আর কিন্তু নেই জগা! কাল চার পয়সার এনেছিলি, তার দরুন গোটাকতক ছিল।
জগু হৃষ্টগলায় বলে, ব্যস ব্যস, ওতেই হবে। আর কত চাই? হ্যাঁ রে নিতাই, শরীরে বল পাচ্ছিস? যে হাল হয়েছে, ওটাই প্ৰধান দরকার!… নিজে থেকে মনে করে করে দুধ চেয়ে নিয়ে খাবি, বুঝলি? এই যে ভগবতীকে দেখছিস, এনার কাজের সীমা-সংখ্যা নেই। ইনি যে ইশ করে তোকে ডেকে দুধ খাওয়াতে বসবেন তা মনে করিস না।
মার প্রতি এই কর্তব্যটি সেরে জগু হষ্টচিত্তে বসে পড়ে বলে, যাক বাবা, আমার একটা দায় ঘুচালো। মাতৃহীনকে মায়ের কোলে ফেলে দিলাম।
শ্যামাসুন্দরী ছেলের দিক থেকে এদিকে চোখ ফেলে তীব্র স্বরে বলেন, এই ছেলেটা, তোর নাম কি?
